গোলাপগঞ্জের প্রথম লিখিত ইতিহাসগ্রন্থ এবং একজন আনোয়ার শাহজাহান

হাসনাইন সাজ্জাদী

  • প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০৭ অপরাহ্ণ


বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জাতি প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাস অনুসন্ধানের কথা বলেছিলেন। ১২৮১ বঙ্গাব্দে লিখেছিলেন, ‘সাহেবরা যদি পাখি মারিতে যান, তাহারও ইতিহাস লিখিত হয়, কিন্তু বাঙ্গালার ইতিহাস নাই।’ (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা)। তার ছ’বছর পরে, ১২৮৭ তে আবার লিখলেন, ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস চাই। নহিলে বাঙ্গালী কখন মানুষ হইবে না। বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে।’ (বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা, দ্বিতীয়খন্ড)। বঙ্কিমের এই ভাবনা আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার মধ্যে দিয়েই একমাত্র সার্থক হতে পারে।

আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় বিভিন্ন গ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন লেখকের আবির্ভাবও ঘটে থাকে। আবার অনেক সময় আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষকদের মধ্যে অনেকে এসব গ্রন্থের মধ্যে প্রাণ-সঞ্চার ঘটান। আবার কেউ কেউ লেখকগণকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত কিংবা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা বা প্রেরণা দিয়ে থাকেন।

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ক্ষেত্রে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে সাংবাদিক গবেষক আনেয়ার শাহজাহানের হাত ধরে রচিত তেমনি একটি অসামান্য গ্রন্থ রচিত হয় । এ কারণে তাঁকে গোলাপগঞ্জ অঞ্চলের ইতিহাস সংরক্ষণের প্রথম প্রাণপুরুষও বলা চলে। গোলাপগঞ্জ অঞ্চল নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে তারই হাত দিয়ে রচিত হয় সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার প্রথম লিখিত ইতিহাসগ্রন্থ “গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য” (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৬ এবং প্রথম সংস্করণ ২০১৫)।

আনোয়ার শাহজাহানের “গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য” গ্রন্থটি মূলত গোলাপগঞ্জের প্রাচীন ইতিহাস ধারণ করেছে। তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন গোলাপগঞ্জের সাহিত্য-সংষ্কৃতিক ঐতিহ্য, নামকরণ, রাজনৈতিক ইতিহাস, ক্রীড়াঙ্গন, গোলাপগঞ্জে ধর্ম প্রচার ও প্রচারক, প্রবাসে গোলাপগঞ্জবাসীদের অবদান, শিক্ষা ব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ইত্যাদি। অত্যন্ত নিপুণভাবে গোলাপগঞ্জের ইতিহাসকে তুলে এনেছেন গভীর থেকে। সংশোধিত সংস্করণে ৩৮৪ পৃষ্ঠায় অসংখ্য অজানা তথ্যের সমাহার ঘঠিয়েছেন।

গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থটি
১ম প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে। প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারী মাসে। প্রথম সংস্করণটি প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করে সুনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা বইপত্র প্রকাশন।

১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশে বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন সিলেটের অন্যতম ইতিহাস গবেষক মুহাম্মদ আসাদ্দর আলী এবং ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সংস্করণে ভূমিকা লিখেছেন বাংলা পিডিয়া’র প্রধান সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম।

লেখক ও সাংবাদিক আনোয়ার শাহজাহান ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস সিলেট জেলার অন্তর্গত গোলাপগঞ্জ উপজেলার রায়গড় গ্রামে। তিনি অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেছেন। বিশেষ করে আঞ্চলিক ইতিহাস এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে।

আনোয়ার শাহজাহানের উল্লেখযোগ্য ৮টি গ্রন্থের মধ্যে স্বাধীনতাযুদ্ধে রাষ্ট্রীয় খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনবৃত্তান্ত ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের বীরত্বগাঁথা নিয়ে ৭৫৬ পৃষ্ঠায় দুটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে -“স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা”। বইটির প্রথম খন্ডে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর-উত্তম ও বীরবিক্রম এবং দ্বিতীয়খণ্ডে বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে একুশে বইমেলায় প্রথম খন্ডটি প্রকাশের পর ব্যাপক জনপ্রিয়তার অর্জন করে। দ্বিতীয়খন্ড প্রকাশিত হয় ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে। ভবিষ্যতে খেতাবপ্রাপ্তদের নিয়ে যাঁরা গবেষণা করবেন তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের এই মহামূল্যবান গ্রন্থটি রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হবে। বইটির প্রথম ও দ্বিতীয়খণ্ডে ভূমিকা লিখে বইটির গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি করে দিয়েছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ, ৪নং সেক্টর কমান্ডারের মেজর জেনারেল (অব.) চিত্ত রঞ্জন দত্ত বীর-উত্তম এবং সাব-সেক্টর কমান্ডার মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বীর-উত্তম।

আনোয়ার শাহজাহানের মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি উল্লেখযোগ্যগ্রন্থ হচ্ছে ‘সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সৌধ’। গ্রন্থটিকে চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত করে পর্যায়ক্রমে সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার- এ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সৌধ নির্মাণকর্ম নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায়গুলোতে যেমন মুক্তিযুদ্ধের বড় স্থাপনা স্থান পেয়েছে, তেমনি নতুন অনেক স্থাপত্যও যোগ হয়েছে। একই সাথে গবেষক আনেয়ার শাহজাহান পরিচিত স্থানের পাশাপাশি অনেক অপরিচিত বা অজানা স্থান যেখানে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনাও তুলে ধরেছেন।

সিলেটের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার নিয়ে লেখা প্রথম ইংরেজি বই: ‘দ্যা গ্যালানট্রি্ এ্যাওয়ার্ড রেসিপিয়েন্ট ফ্রিডম ফাইটার অব সিলেট’ গ্রন্থটিও আনোয়ার শাহজাহানের উল্লেখযোগ্য আরেকটি গ্রন্থ। (Gallantry Award Recipient Freedom Fighters of Sylhet, published 2020)।

গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থটি পরিশিষ্ট ও নির্ঘণ্টসহ ত্রয়োদশ ভাগে সাজানো হয়েছে। গ্রন্থের প্রথম ভাগে ভূমিকা ছাড়াও গোলাপগঞ্জের পরিচিতি ও নামকরণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। (প্রথম অধ্যায় পৃষ্ঠা নম্বর ১৯-৩২)। এতে তিনি গোলাপগঞ্জ এলাকার নামকরণ বিষয়ে ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তি গুলো তুলে ধরেছেন। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর জন উইলিসের শাসন কার্যের সুবিধার্থে যখন বড় বড় শহর বাজার ও গঞ্জকে থানায় রুপান্তর করার প্রস্তাব করা হয় তখন প্রস্তাবিত ৩০টি থানার সাথে গোলাবগঞ্জ ও হেতিমগঞ্জের কথা উল্লেখ ছিল বলে তিনি তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশিত করেছেন।। তিনি আরো জানিয়েছেন, ১৯১২ এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে গোলাবগঞ্জ থানার উল্লেখ ছিল (পৃষ্ঠা ২০)। অন্যদিকে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত সিলেট ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারের তথ্যানুসারে ১০ জানুয়ারি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে গোলাপগঞ্জ থানা প্রতিষ্ঠা লাভ করে । গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থে তিনি আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার, স্ট্যাটিসটিকাল ইয়ার বুক অব বাংলাদেশ থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করে তারিখ সহ তথ্য তুলে ধরেছেন। যেটি একজন ইতিহাস গবেষকের প্রধান কাজ। আনোয়ার শাহজাহান সেটি যথাযথভাবে করেছেন বলেই বইটি পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

গোলাপগঞ্জে ধর্ম প্রচার ও প্রচারক অধ্যায়ে হজরত শাহজালালের অনেক সঙ্গী সাথী এসে গোলাপগঞ্জে বসতি স্থাপন করেছেন- এরকম বেশ কিছু বিখ্যাত ওলি আউলিয়ার কাহিনি গবেষক আনোয়ার শাহজাহান অত্যন্ত মুন্সিয়ানা এবং সততা-দক্ষতার সাথে তুলেছেন। আঞ্চলিক ইতিহাস রচনায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। (পঞ্চম অধ্যায়, পৃষ্ঠা নম্বর ১১২-১৩৭)।

ষষ্ঠ অধ্যায়ের (পৃষ্ঠা নম্বর ১৩৮-১৭৯)-এ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হয়েছে । এতে মুক্তিযুদ্ধে গোলাপগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান, গোলাপগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত খন্ড যুদ্ধ এবং গণহত্যার বর্ণনা, গোলাপগঞ্জের শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সহ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়কর্তৃক গেজেটপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় খেতাবপ্রাপ্ত ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধাদের (বীর-উত্তম, বীরবিক্রম এবং বীর প্রতীক) মুক্তিযুদ্ধে অবদান এবং যুদ্ধের বর্ণনা তুলে ধরেছেন তিনি। গ্রন্থে প্রথমবারের মত সুন্দিশাইল গণহত্যা, নালিউরি যুদ্ধ, ফুলবাড়ি যুদ্ধ নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন যা পড়লে পাঠক শিহরিত হবেন । মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জেনে দেশপ্রেমিকরা অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হবেন। এভাবে নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠবে ।

সিলেটের শেকড়সন্ধানী গবেষক আনোয়ার শাহজাহান গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থের সপ্তম অধ্যায়ে (পৃষ্ঠা নম্বর ১৮০- ২১৫) গোলাপগঞ্জের আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি সিপাহী বিপ্লব, খেলাফত, অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে আসাম ব্যবস্থাপনা পরিষদে গোলাপগঞ্জের কৃতিসন্তান আব্দুল হামিদ চৌধুরী সোনা মিয়া কর্তৃক বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লড়াই, অধিকার আদায়ের অন্যতম আন্দোলন নানকার বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, গোলাপগঞ্জের তেল গ্যাস আন্দোলন সহ সবকটি আন্দোলন নিয়েই আলোচনা করেছেন। বাদ পড়েনি কোন আন্দোলন সংগ্রাম। তিনি তথ্য-উপাত্ত সহ অত্যন্ত যত্ন সহকারে প্রতিটি আন্দোলনে গোলাপগঞ্জের সংগ্রামীদের কথা তুলে ধরেছেন।

গোলাপগঞ্জের সাহিত্যাঙ্গন (অষ্টম অধ্যায়, পৃষ্ঠা নম্বর ২১৬- ২২৫) অধ্যায়ে বাংলাসাহিত্যে গোলাপগঞ্জের অবস্থান এবং গোলাপগঞ্জের অঞ্চলগত অবদান নিয়ে বিশদভাবে বর্ণনা রয়েছে। গোলাপগঞ্জের অঞ্চলগত অবদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে সাহিত্যিকগণের পরিচিতি এবং তাদের সাহিত্য কর্মের বর্ণনা তুলে ধরেছেন। আরবী, ফরাসী, উর্দু ও সংস্কৃত সাহিত্য, সিলেটি নাগরী সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য, আধুনিক সাহিত্যে গোলাপগঞ্জের লেখক সাহিত্যিকদের অবদান তুলে ধরেছেন। সংস্কৃতভাষার পণ্ডিত, শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য দয়াবলীর গ্রন্থের লেখক প্রদুম্ম মিশ্র, আরবী ও ফারসী সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক আজির উদ্দিন চৌধুরী, প্রথম মুসলিম সামাজিক উপন্যাসিক আর্জ্জুমন্দ আলী, বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ কবি অশোক বিজয় রাহা প্রমুখের সাহিত্যের ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীল কর্ম নিয়ে আলোকপাত করেছেন। পাশাপাশি আরবী, ফারসী, সংস্কৃত, নাগরী এবং বৈষ্ণব সাহিত্য নিয়ে তথ্যবহুল গবেষণা স্থান পেয়েছে। গোলাপগঞ্জের সাহিত্যাঙ্গন অধ্যায়ে গোলাপগঞ্জের অঞ্চলের মধ্যযুগীয় বাংলাসাহিত্যের দিকপাল কিংবা আধুনিক সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্ণধারগণের কথা বাদ যায় নি। লেখকের সাহিত্য-প্রীতি, বিচক্ষণতা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ গ্রন্থটি হয়ে উঠেছে গোলাপগঞ্জের সাহিত্য জগতে কালের মহাসাক্ষী। এ গ্রন্থে গোলাপগঞ্জের প্রাচীন, মধ্যযুগ কিংবা আধুনিক কালে লেখক-সাহিত্যিকগণের কর্ম-দর্শন স্ব-মহিমায় ফুটে উঠেছে।

আনোয়ার শাহজাহানের “গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য” গ্রন্থটি সাহিত্যের ক্ষেত্রে আধুনিক কালে এক অভাবনীয় সফলতা এনে দিয়েছে। গোলাপগঞ্জের সাহিত্য ও সাহিত্যের ইতিহাসকে একীভূত করে বিশালাকারে এর পূর্বে আর কোন গ্রন্থে আলোচনা হয় নি। এ গ্রন্থে যেমন প্রাচীন ও মধ্যযুগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে ঠিক তেমনি আধুনিক কালেরও সমন্বয় ঘঠেছে। শ্রেণি বিন্যাসের মাধ্যমে লেখক-সাহিত্যিকের বিশাল একটি আলোচনা এবং তালিকাও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি কিন্তু খুব একটা সহজ সাধ্য কাজ ছিল না। এটি এক তথ্যভিত্তিক দীর্ঘ গবেষণার ফলশ্রুতিতে সম্পন্ন হয়েছে নিঃসন্দেহে। লেখক নিজের গবেষণাকে পরবর্তী গবেষকের ভাবার কথাও এড়িয়ে যান নি। আবার অন্যদিকে লেখার আকার ও মান বিষয়ে সকল অভিযোগ লেখক স্বীয় শিরোধার্য হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। তবে এটাও ঠিক যে, গোলাপগঞ্জের একটা বিশাল অবদান ছিল এবং আছে সেটাই তিনি প্রমাণ করেছেন এ গ্রন্থে।
গোলাপগঞ্জের সাংবাদিকতার অতীত ও বর্তমান অধ্যায়ে (নবম অধ্যায়, পৃষ্ঠা নম্বর ২২৬-২৪২) প্রথিতযশা সাংবাদিক আব্দুল মতিন চৌধুরী, মাওলানা সখাওয়াতুল আম্বিয়া, শেখ আব্দুর রহিম, আমিন আহমদ চৌধুরী এবং তাছাদ্দুক আহমদের সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করেছেন। খ্যাতিমান সাংবাদিকদের পাশাপাশি পাশাপাশি নবীন সাংবাদিকতদের নাম এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। অন্তত নামটি তুলেছেন এবং তাতে লেখক কার্পণ্য করেননি। সাংবাদিক, লেখক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট অথবা সাহিত্য জগতে যদি বিচরণ থাকে তবে এমন কেউ এ গ্রন্থ থেকে বাদ পড়েছেন বলে মনে হয় না। কিন্তু গ্রন্থের লেখক স্বীয় অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে অনুল্লেখিত থেকে যাওয়ার সন্দেহকে উড়িয়ে দেন নি। এ কারণে তিনি গ্রন্থের ভূমিকায় দুঃখবোধের কথাও উল্লেখ করেছেন। সাংবাদিকতার ইতিহাসে গোলাপগঞ্জ শুধুমাত্র ঘটনাবহুলই নয়, বরং বিভিন্ন দিক থেকে তা তাৎপর্যময় এবং বৈচিত্রপূর্ণ। এ বিষয়টি তুলে ধরার ক্ষেত্রে লেখক স্বীয় ঐকান্তিক প্রচেষ্টার তেমন ত্রুটি করেছেন বলে পরিলক্ষিত হয়নি। আনোয়ার শাহজাহান যেহেতু আধুনিক কালের একজন গবেষক, লেখক এবং সাংবাদিক, সেহেতু তিনি সাহিত্যের এ গ্রন্থে মেধা, মনন, অভিজ্ঞতা কিংবা সৃষ্টিশীলতা পুরোপুরিই বজায় রেখেছেন এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। গোলাপগঞ্জের সাংবাদিকতার অতীত ও বর্তমান নিয়ে লেখকের এ বিশাল গবেষণায় ফুটে উঠেছে ঐতিহ্যের অনবদ্য স্বাক্ষর। বিশাল এক তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছেন নিঃসন্দেহে। লেখকের গবেষণার সমসাময়িককালে অথবা এর পূর্বে যদি আপনি সাহিত্য-সংষ্কৃতির যে কোনো ক্ষেত্রে ন্যূনতম ভূমিকা রেখে থাকেন তবে গ্রন্থে সন্বিবেশিত যে কোন একটি তালিকায় হয়তো আপনিও আছেন।

গোলাপগঞ্জের ব্যক্তিত্ব অধ্যায়ে (ত্রয়োদশ অধ্যায়, পৃষ্ঠা নম্বর ২৬৭-৩৬৫) গোলাপগঞ্জের গুণী ব্যক্তিদের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও গোলাপগঞ্জে বহু গুণীর জন্ম হয়েছে । যারা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। বিভিন্ন পেশাজীবি গোলাপগঞ্জের এসব ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এ অধ্যায়ে। অনেক বিখ্যাত এবং বিশ্ববরেণ্য মণীষী রয়েছেন গোলাপগঞ্জে। গোলাপগঞ্জের ব্যক্তিত্ব অধ্যায়ে শ্রী চৈতন্য দেব, শাহ আব্দুল ওহাব, আব্দুল মতিন চৌধুরী মিনিস্টার, আব্দুল হামিদ চৌধুরী, মিনিস্টার নুরুল রহমান চৌধুরী, রবীন্দ্র গবেষক অশোক বিজয় রাহা, প্রবাস পিতা তাছাদ্দুক আহমেদ সহ অনেকেরই জীবনী এবং কৃতিত্বের বিবরণী প্রদান করেছেন, যার ফলে এঁদের অবদান সম্পর্কে আমরা সম্যক অবহিত হই। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধান্বিত হই। এক দশকেরও অধিক সময় ব্যয় করে লেখক ইতিহাসের যে-পিলার নির্মাণ করেছেন, এই একটিমাত্র বইয়ের মধ্য দিয়েই তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

গ্রন্থ রচনার পেছনে যে ঐকান্তিক নিষ্ঠা আর গভীর অনুসন্ধানী মানসতা সক্রিয় ছিল , তাতে লেখককে অসংখ্য সাধুবাদ জানাতে হয়। আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে এমন ঋদ্ধ, বিধিবদ্ধ, তথ্যনির্ভর, বিস্ত‍ৃত আর বিদগ্ধ আলোকপাত তুলনারহিত। ইতিহাস গবেষক এবং সাংবাদিক আনোয়ার শাহজাহানের গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থটি আঞ্চলিক ঐতিহাসিক গবেষণায় মাইলফলক হয়ে থাকবে। থাকবে কালের সাক্ষী হিসেবে। লেখক গবেষক আনোয়ার শাহজাহানও আগামী প্রজন্মের কাছে স্বরণীয় বরণীয় হয়ে থাকবেন নিঃসন্দেহে। ত্যাগ এবং সংগ্রামের মাধ্যমে অতিবাহিত হওয়া জীবনকে আদর্শ হিসেবে যদি ধরা যায়, তাহলে জীবনে সফলতা আসবেই। আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক আনোয়ার শাহজাহান এমনই একটি জীবনই অতিবাহিত করছেন।

লেখক: বিজ্ঞান কবি ও সমাজচিন্তক।

  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    25
    Shares

এই সম্পর্কিত আরও খবর...