জাতীয় উন্নয়নে কৃষিবিদদের অবদান

মো. বশিরুল ইসলাম

  • প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১:১৯ অপরাহ্ণ

আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি, কৃষিবিদ দিবস। ১৯৭৩ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষিবিদদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় প্রথম শ্র্রেণির পদমর্যাদায় উন্নীত করেন। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কৃষিশিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নসহ দেশের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হন। জাতির জনকের দেওয়া কৃষিবিদদের ঐতিহাসিক এ সম্মানকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারিকে ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। একজন কৃষিবিদ হিসেবে আজকের এই দিনে কৃষিবিদরা বঙ্গবন্ধুর এ স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ উন্নয়নে কতটুকু পূরণ করতে পারছেন, তা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের ষষ্ঠ জাতীয় কনভেনশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটা কথা দিয়ে শুরু করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, আমার ডানে কৃষিবিদ, বাঁয়ে কৃষিবিদ, সামনেও কৃষিবিদ। আসলে কথাটা খুবই সত্য। কৃষিবিদরা আজ শুধু যে কৃষি বা তার সাব-সেক্টরসমূহে কাজ করে সফলতা অর্জন করতে সামর্থ্য হচ্ছেন তাই নয়। দক্ষ কৃষিবিদরা ছড়িয়ে পড়েছেন বহুমুখী কমর্কান্ডে। প্রতিটি কাজে তারা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। কী ফসল উৎপাদনে, কী মৎস্য উৎপাদনে, কী পশুসম্পদ উন্নয়নে, কী কৃষি যান্ত্রিকীকরণে, এমনকি কৃষি অর্থনীতিতে পলিসি ও পরিকল্পনায় অবদান রেখে চলেছেন। অবদান রাখছেন প্রশাসনে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, কূটনীতিতে, শিক্ষকতা পেশাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সেক্টরে। সুনামসহকারে কাজ করছেন আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন সংস্থায়। কৃষি ব্যাংকগুলোতে অগ্রাধিকারসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকে চাকরি করছেন তারা। এ ছাড়া স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতিতেও রেখে চলেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুবাদে কৃষিবিদরা এ দেশে আজ এক মর্যাদাবান পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃত।

করোনা মহামারিতে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি যেখানে বিপর্যস্ত; সেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই স্থিতিশীল রয়েছে। এ কারণ হিসেবে আমি মনে করি, সরকারের যুগোপযোগী পরিকল্পনা, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিশ্রমী কৃষক এবং মেধাবী কৃষিবিজ্ঞানী যৌথ প্রয়াস কৃষি খাতই অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। এর মূলে রয়েছে কৃষিবিদদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিবিষ্ট গবেষণায় উচ্চফলনশীল, কম সময়ে ঘরে তোলা যায় এমন জাত ও পরিবেশসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন। নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে ধান, পাটের পাশাপাশি খাদ্যশস্য, শাকসবজি, রকমারি ফলের উৎপাদন বেড়ে চলেছে। সেসঙ্গে সমুদ্র ও মিঠাপানির মাছ, গবাদিপশু, পোলট্রি মাংস ও ডিম, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি, দুগ্ধ উৎপাদনও অনেক বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব উৎপাদন তালিকায় শীর্ষত্বের লড়াই করছে বাংলাদেশের কৃষি। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুবাদে কৃষিবিদরা এ দেশে আজ এক মর্যাদাবান পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃত। আসলে এ দেশের মানুষকে সত্যিকার অর্থে কোনো পেশার লোক যদি বেশি কিছু দিতে পারেন, তা হলেন কৃষিবিদরা। ৭ কোটি মানুষের দেশে খাদ্যের অভাব ছিল, আজ ১৭ কোটি মানুষ ভালোমতোই খেতে পারছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ৯৮টি উচ্চফলনশীল এবং ৭টি হাইব্রিড ধানের জাতসহ মোট ১০৫টি ধানের জাত ও ধান চাষের দুই শতাধিক আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীল ও পুষ্টিগুণ বিচারে ব্রি উদ্ভাবিত ৯৮টি ইনব্রিড জাতের মধ্যে ১২টি লবণ সহনশীল, ৩টি জলমগ্নতা সহিষ্ণু, দুটি ঠান্ডাসহিষ্ণু, সাতটি খরা সহনশীল, একটি খরা প্রতিরোধকারী, পাঁচটি জিংক-সমৃদ্ধ এবং সুগন্ধি ও রপ্তানি উপযোগী ৯টি ধানের জাত রয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এ পর্যন্ত ১৮টি ফসলের উচ্চফলনশীল ও উন্নত বৈশিষ্ট্যের ১১২টি জাত এবং নাইট্রোজেন সারের বিকল্প হিসেবে লিগিউম জাতীয় ফসলের জন্য ৯টি জীবাণু সার উদ্ভাবন করেছে এবং দেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলছে। দেশের জলবায়ু ও কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ফসলের ৪৫টি উচ্চফলনশীল জাত এবং ৫০৫টি ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তিসহ মোট ১০৫০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। দেশে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও প্রচুর উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি ও পরিবেশসহিষ্ণু নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে চলছে।

আমরা যদি অন্যান্য পেশার সঙ্গে কৃষি পেশাকে তুলনা করি, তাহলে দেখব কৃষিবিদদের গবেষণা সরাসরি দেশ উন্নয়নে কাজ করছে বলে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। চলতি বছরে দেশে ৩৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন হয়েছে। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৩৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে এ বছর ২ মিলিয়ন টন বেশি উৎপাদন হয়েছে। শুধু ধান নয়, অন্যান্য খাদ্যশস্য, সবজি ও ফল ইত্যাদিতে বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে চতুর্থ। স্বাধীনতার পর দেশে যে চাল উৎপাদন হতো এখন তার চেয়ে তিন গুণ বেশি উৎপাদন হয়। ওই সময় যেখানে প্রতি হেক্টরে চালের উৎপাদন ছিল দেড় টন, তা এখন চার টনেরও বেশি। একইভাবে গমে উৎপাদন দ্বিগুণ আর ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুণ। ২০২০ সালে গম উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ ৫০ হাজার টন, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে পরিমাণে অর্ধেক ছিল। ভুট্টায় সর্বোচ্চ সফলতা এসেছে শেষ দশকে। ২০০৯ সালে ভুট্টার উৎপাদন ছিল সাড়ে সাত লাখ টন, যা ২০২০ সালে ৫৪ লাখ টন। সব মিলিয়ে এই করোনাকালে দেশে কৃষিতে আশাতীত সাফল্য এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডি-এর মতে, চাল উৎপাদনে কয়েক বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ তিনের মধ্যে উঠে আসছে দেশ। অন্যদিকে বৈশ্বিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য বলছে, চলতি বছর বাংলাদেশে পালনকৃত গরুর সংখ্যা ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি। শুধু তা-ই নয়, গবাদিপশু পালনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বাদশ অবস্থানে রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, সবজি ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। পাট উৎপাদনে বিশ্বে ভারতের অবস্থান শীর্ষে এবং বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম। ধান ও আলু উৎপাদনে যথাক্রমে চতুর্থ ও সপ্তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ছাগল উৎপাদনেও বিশ্বে আয়তনের দিক থেকে অনেক পেছনে থাকা বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ, আমে সপ্তম এবং ফলে দশম। আর ছাগলের মাংস উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, বিশ্বে যে পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয়, তার ৮৬ শতাংশই হয় আমাদের দেশে। লন্ডনভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল টি কমিটি’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, চা উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান একধাপ এগিয়ে গত বছর নবম স্থানে উন্নীত হয়েছে।

বাংলার কৃষক আর কৃষিবিদরা এখানেই থেমে যাননি। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও এখন বিশ্বের জন্য উদাহরণ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম। আরো কত নিত্যনতুন সফলতার হাতছানি আমাদের ডাকছে শুভ সুন্দর আগামীতে। এসব সম্ভব হয়েছে আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণার মাধ্যমে।

কালের পরিক্রমায় কৃষিবিদরা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মোতাবেক দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কৃষি শিক্ষায় মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের প্রবেশ বাড়তে থাকে; যদিও ১৯৭৭ সালের বেতন কাঠামোয় কৃষিবিদদের সেই মর্যাদা আবারও একধাপ নামিয়ে দেওয়া হয়। কৃষিবিদদের তীব্র আন্দোলনের মুখে তদানীন্তন সরকার কৃষিবিদদের সেই হারানো সম্মান আবার ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন। এরপর বিভিন্ন ধারার রাজনীতির ডামাডোলে এই বিশেষ দিনটিকে মনে করার কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি। অবশেষে ‘কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ’-এর তৎকালীন মহাসচিব ও বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের একান্ত চেষ্টায় এই দিনটিকে ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেসঙ্গে ২০১১ সাল থেকে যথাযোগ্য মর্যাদায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটিকে কৃষিবিদ দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ফলে বঙ্গবন্ধুর কারণে আজকে আমরা কৃষিবিদরা গর্ব করে বলতে পারি, ‘বঙ্গবন্ধুর অবদান, কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান’।

আমাদের দেশের অনেক যোগ্য ও প্রথিতযশা গবেষকরা কৃষিকাজে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ভালো ফলও পাচ্ছেন, কিন্তু দেখা যায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে গবেষণার ফলাফল জার্নাল বা পাবলিকেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। আমাদের গবেষকদের এই অর্জনগুলো তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যাক, সেসঙ্গে নিরাপদ খাদ্যের জোগান নিশ্চিতের মাধ্যমে কৃষিবিদরা সুস্থ-সবল ও মেধাবী জাতি গঠনে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন, এতে উপকৃত ও উন্নত হবে দেশ। আর কৃষিবিদরা হয়ে থাকবেন জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

লেখক : উপপরিচালক
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১২০৭
mbashirpro1986@gmail.com

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

এই সম্পর্কিত আরও খবর...