দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের এক বছর

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ৮ মার্চ ২০২১, ১:৩৪ অপরাহ্ণ

ঠিক এক বছর আগে ২০২০ সালের ৮ মার্চ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রথমবারের মতো জানায়, বাংলাদেশে দুজন পুরুষ ও একজন নারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।

এরপর গত এক বছরে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে করোনা ও এর পারিপার্শ্বিক থাবায়। প্রথম দিকে মানুষের ছিল উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ, ভাইরাস সম্পর্কে তথ্য না থাকা, গুজব, কোন ওষুধ বা টিকা না থাকা সব মিলিয়ে দিশেহারা অবস্থা।

অন্যান্য দেশের মতো জাতিসংঘের নির্দেশে মানুষের শুধু করণীয় ছিল বারবার হাত ধোয়া, মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এখন বছর পূর্তিতে ৩১ লাখের বেশি মানুষ নিয়েছে টিকা। কাজে ফিরেছে দেশের বেশির ভাগ মানুষই।

এই এক বছরে সরকারি হিসেবে আক্রান্ত হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার ৩৩০ জন। মারা গেছেন ৮ হাজার ৪৬২ জন। সেরে উঠেছেন ৫ লাখ ৩ হাজার ৩ জন।

করোনা শনাক্তের পরপরই সরকারি নানা ব্যবস্থা সামনে আসে। সরকার প্রথম দিকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয় মার্চ মাসের ১৭ তারিখে। এখন এই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন সরকার দাবি করছে অন্যান্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এই এক বছরে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সফলতা দেখিয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে দফায় দফায় প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়, দেওয়া হয় সাহায্য।

গত বছরের মার্চের পরের দুই মাস দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা তিন অঙ্কের মধ্যে থাকলেও সেটা বাড়তে বাড়তে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ২ জুলাই সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১৯ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। ধারণা করা হচ্ছিল শীতকালে ভাইরাসের প্রকোপ আরও বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় উল্টো। নভেম্বরে সংক্রমণের গ্রাফ কিছুটা ওপরে উঠলেও ডিসেম্বর থেকে সেটা দ্রুত পড়তে থাকে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সংক্রমণের হার তিন শতাংশের নিচে নেমে আসে, দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ছিল তিনশ জনেরও কম।

সরকার বলছে চীনের উহানে এই রোগটি শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই তারা প্রস্তুতি নিতে থাকে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের আলমগীর হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে বিবেচনায় ধরলে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ভালো।”

করোনা মোকাবিলা সরকারের প্রস্তুতি ছিল তৃণমূল পর্যন্ত। রাজধানী ঢাকা থেকে একেবারে উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা, হাসপাতাল প্রস্তুত করা, প্রচার প্রচারণা চালানো এ ধরনের নানা কাজের জন্য পরিকল্পনা করা হয়।

আলমগীর হোসেন বলেন, “ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ এ সময়টাতে ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই শক্তিশালী। তবে মাঝখানে সেটা কিছুটা ঢিমেতালে হয়েছে।”

তবে এও বলেন, শক্তভাবে এ ব্যবস্থাপনাটা না করতে পারলে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারতো।

মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সরকারের যে হিসেব, সেটা নিয়ে যে বিতর্ক আছে সেটাকে তিনি নাকচ করে দিয়ে বলেন প্রত্যেকটি মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে হাসপাতালগুলোতে। তাই এখানে বিতর্ক তৈরি হওয়ার অবকাশ নেই।

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের সরকারের এই দাবিকে ঢালাওভাবে মানতে রাজি নন। তাদের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা বলছে, কয়েকটি বিষয় এখানে কাজ করেছে যাতে করে মানুষের মৃত্যু এবং আক্রান্তের সংখ্যা কম হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশের আবহাওয়া। অন্যান্য শীত প্রধান দেশে করোনা যতোটা বিস্তার লাভ করেছে বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হওয়াতে বড় সুবিধা পেয়েছে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্তের দিক থেকে বেশি আক্রান্ত হয়েছে বয়স্ক ব্যক্তিরা। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে মানুষের গড় আয়ু বেশি। সেখানে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি। তাই আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু কম। তাই যে জনগোষ্ঠীর মানুষ আক্রান্ত হওয়ার কথা সেই জনগোষ্ঠীর মানুষ তুলনামূলক কম। আক্রান্তের সংখ্যাও কম।

সরকার করোনাভাইরাসের আক্রান্ত এবং মৃত্যুর যে সংখ্যা দিচ্ছে সেটা নিয়ে মতভেদ রয়েছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। তারা মনে করছেন না সরকারের ব্যবস্থাপনার কারণে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এসেছে। একাধিক বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন সরকার সব সময় চেষ্টা করেছে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে দেখাতে।

তারা দাবি করছেন এই সংখ্যাটা ৮ থেকে ১২ গুন বেশি। এই সংখ্যা কম দেখানোর পেছনে সরকারের বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তির বিষয় রয়েছে আর রয়েছে তাদের ব্যর্থতা ঢাকার। এখানে তারা দুইটা বিষয়কে উল্লেখ করেছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে নজির আহমেদ বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে এটা একটা সফলতা হিসেবে দেখা হলেও এই করোনাভাইরাস বাংলাদেশে কীভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে সেটা নানা দিক থেকে দেখার সুযোগ রয়েছে।

করোনা মোকাবিলা নিয়ে এমন বিতর্ক থাকলেও কিছু স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়া শীর্ষ তিন সফল নারী নেতার তালিকায় স্থান পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২১’ উপলক্ষে দেওয়া বিশেষ ঘোষণায় মহামারি চলাকালীন সফলভাবে নেতৃত্ব দেওয়া শীর্ষ তিন নারী নেতার নাম ঘোষণা করেন কমনওয়েলথের মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড কিউসি। সেখানে বলেন, আমি কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তিনজন বিস্ময়কর নারী নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করতে চাই, যারা কভিড-১৯ মহামারি চলাকালে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন, বার্বাডোজের প্রধানমন্ত্রী মিয়া আমোর মোটলি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

এই সম্পর্কিত আরও খবর...