সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর সমাধান

মো. সালাহউদ্দিন

  • প্রকাশিত: ১৬ মার্চ ২০২১, ১:২৩ অপরাহ্ণ

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। এতে যেভাবে তাজা মানুষ মৃত্যুর শিকার হচ্ছে, এ নিয়ে সচেতন মহলের মধ্যে ক্রমেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই যেন সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। রাস্তায় বের হলেই একটা আতঙ্ক কাজ করে কখন কোন দুর্ঘটনায় কবলিত হই। যতক্ষণ পর্যন্ত স্বজনরা বাসায় না ফিরে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই আতঙ্ক চলতে থাকে। প্রশ্ন হলো এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণ রয়েছে। এ কারণগুলো সম্পর্কে আমরা প্রায় সবাই অবগত আছি। তবে দুর্ঘটনার জন্য মূল ভূমিকা পালন করে চালক নিজে। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির কারণে দুর্ঘটনা ঘটলেও সেটাও আমি চালককে দায়ী করব। কারণ গাড়ি সড়কে বের করার আগে অবশ্যই সব কিছু চেক করার দায়িত্ব চালকের। তাই দুর্ঘটনা রোধ করতে আমি চালককেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।

আমাদের সড়কগুলো অনেক ত্রুটিপূর্ণ। তবে ইচ্ছা করলেই এসব ত্রুটি অল্প সময়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। সেই বাস্তবতায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে প্রথমেই প্রশিক্ষিত মানবিক ড্রাইভার তৈরি করতে হবে। তার মধ্যে এই উপলব্ধি বোধ জাগ্রত করতে হবে যে, তার একটা ভুলের কারণে একটা পরিবারে যেকোনো সময় নেমে আসতে পারে অন্ধকারের ঘনছায়া। একজন প্রশিক্ষিত ড্রাইভার কখনো হেলপার দিয়ে গাড়ি চালাতে পারে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার আগে ট্রাফিক বিভাগ এবং বিআরটিএ কর্তৃক চালকদের রোড সাইন, রাত্রিকালীন গাড়ির হেডলাইটের সঠিক ব্যবহার এবং ট্রাফিক আইনের সঠিক বিষয়গুলোসহ মানবিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই, প্রতিটি চালক যেন রাস্তায় প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়।

আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, মহাসড়কে যত দুর্ঘটনা ঘটে, তার শতকরা আশিভাগ দুর্ঘটনা ঘটে চালকদের বেপরোয়া ও খামখেয়াালিপনা গাড়ি চালানোর ফলে। মহাসড়কে প্রয়োজন ছাড়া ওভারটেক করার কোনো প্রয়োজন নেই বললেই চলে। অথচ আমরা দেখতে পাই, পেছনের গাড়ি সামনের গাড়িটিকে ওভারটেক না করা পর্যন্ত যেন স্বস্তি নেই। আমাদের দেশের চালকদের এটা একটা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যত দিন পর্যন্ত এই ব্যাধি থেকে চালকরা মুক্ত না হবে, তত দিন পর্যন্ত এভাবে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। হাইড্রোলিক হর্ন শব্দদূষণসহ আমাদের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এ ধরনের হর্ন হাইপারটেনশন রোগীর জন্য মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করে। এ ছাড়া শিশুদের শ্রবণশক্তির মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। তার পরও এ ধরনের হর্ন বাজানো থেকে চালকদের বিরত রাখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে জরুরি প্রয়োজনে ওভারটেক যদি করতেই হয়, এ ক্ষেত্রে আমি মহাসড়কে চলার জন্য দুটি রোড সাইনের কথা বলব। একটা সাইন থাকবে সোজা রাস্তায় সাদা ফাঁকা ফাঁকা দাগের। এখানে একজন চালক ইচ্ছা করলে ওভারটেক করতে পারবে। অপর একটা সাইন থাকবে রাস্তার বাঁকে, ব্রিজের ওপর কিংবা বাজার এলাকায়। যতক্ষণ পর্যন্ত রাস্তার মাঝখান দিয়ে সাদা লম্বা দাগ চলে গেছে সেই জায়গায় ওভারটেক করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু রাস্তার বাঁক এলাকায় এই চিহ্ন দেওয়া সত্ত্বেও চালকরা এই রোড সাইন না বুঝে ওভারটেক করার চেষ্টা করে। এর ফলে ঘটে মারাত্মক দুর্ঘটনা। আমাদের দেশে অতীতে যেসব মারাত্মক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তার বেশির ভাগ ঘটেছে রাস্তার বাঁকে। ওভারটেক করার নিয়ম হলো ঝামেলামুক্ত জায়গায় সোজা রাস্তায় পেছনের গাড়ি রাইট ইন্ডিকেটর দিলে সামনের গাড়ি যদি লেফট ইন্ডিকেটর দেয়; সে ক্ষেত্রে পেছনের গাড়ি সামনের গাড়িটিকে ওভারটেক করতে পারবে। তবে কোনো অবস্থাতেই বাম পাশ দিয়ে ওভারটেক করা যাবে না। কিন্তু এসব নিয়মের তোয়াক্কাও করে না আমাদের দেশের চালকরা।

যেহেতু আমাদের দেশে মহাসড়কগুলো সুরক্ষিত নয়, তাই গাড়ির গতি কমাতে হবে। বাসের জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার, ট্রাকের জন্য ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার এবং প্রাইভেট গাড়ির জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার হওয়া বাঞ্ছনীয়। অধিক গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য গাড়ির মালিকরা অনেকাংশে দায়ী কারণ তারা অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়। মালিকদের কথামতো গাড়ি না চালালে অনেক ক্ষেত্রেই চালকরা তার চাকরি হারায়। আবার অনেক সময় মালিকরা অধিক মুনাফার জন্য ভালো চালকদের বাদ দিয়ে অদক্ষ চালকদের দিয়ে গাড়ি চালায়। ফলে দুর্ঘটনার হার বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে চালকদের চাকরি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে। মাঝে মাঝে যাত্রীরা চালকদের অধিক গতিতে গাড়ি চালাতে উৎসাহিত করে ও বিভিন্ন ধরনের কমেন্টস করে, এটা পরিহার করতে হবে। বর্তমান মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা অনেকাংশে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সি ছেলেরা বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানোর ফলে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। মোটরসাইকেলে হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক অথচ অনেকে হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালানোর ফলে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অনেক পিতা-সন্তানসহ স্ত্রীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে ভ্রমণ করে, এটা খুবই দুঃখজনক। বাবা হয়ে তিনি পুরো পরিবারকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন । এ ধরনের কর্মকান্ড থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। ফিডার রোড থেকে প্রধান সড়কে ওঠার নিয়ম হলো প্রথমে প্রধান সড়কের গাড়িকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তারপর ডানে-বামে দেখে ইন্ডিকেটর জ্বালিয়ে হর্ন বাজিয়ে প্রধান সড়কে উঠতে হবে।

মোট দুর্ঘটনার ৩০ শতাংশ সংঘটিত হয় পথচারীদের সঙ্গে। পথচলার নিয়মে না জানার কারণে তারা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। আমাদের দেশের গাড়ি চলে বামপাশ দিয়ে এবং পথচারীও হাঁটে বামপাশ দিয়ে। ফলে তারা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। পথচারীরা যদি ডানপাশ দিয়ে হাটত, তাহলে পেছন থেকে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম থাকত। কারণ ডানপাশ ব্যবহার করলে পেছনে কোনো গাড়ি থাকে না, গাড়ি থাকে পথচারীর সম্মুখভাগে। রাস্তা পারাপারের নিয়ম হলো প্রথম ডানে তাকাতে হবে, তারপর বামে, পরিশেষে ডানে তাকিয়ে রাস্তা পার হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অন্যমনস্ক হয়ে কিংবা দৌড়ে বা মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হওয়া যাবে না। পথচলার নিয়মটি প্রাইমারি লেভেলে পাঠ্যপুস্তকে লিপিবদ্ধ থাকা জরুরি। মহাসড়কের এ দুর্ঘটনা কমানোর জন্য সারা দেশে স্পিডগানের ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রতি জেলায় যদি গাড়িসহ দুটি টিম নিয়োগ করা যায়। এর প্রতিটিতে কমপক্ষে ৩০ কিলোমিটার এলাকা নির্ধারণ করে দিয়ে স্থান পরিবর্তন করে স্পিডগানের মাধ্যমে দ্রুতগতির গাড়িগুলো শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলার জরিমানা করা অব্যাহত থাকে, তাহলে মহাসড়কে চালকরা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে সাহস পাবে না। দ্রুতগতির গাড়ি শনাক্ত করার জন্য একজন পুলিশ সদস্য স্পিডগান এবং ওয়াকিটকিসহ যেকোনো গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দ্রতগতির গাড়িগুলো শনাক্ত করে নির্ধারিত ৫০০ মিটার দূরে অবস্থানরত টিমকে কত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে, তা ওয়াকিটকির মাধ্যমে অবহিত করে, তবেই ওইসব গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে জরিমানা মালিকের পরিবর্তে চালককে বহন করতে হবে। তাহলে পরবর্তীতে চালক দ্রতগতিতে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকবে। যদি প্রতিটি টিমে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা যায় এবং দ্রতগতির গাড়িসহ মহাসড়কে চলাচলরত নসিমন-করিমন, ইজিবাইক, ভটভটি, থ্রি-হুইলার ও ইঞ্জিনচালিত নিষিদ্ধ গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে নগদ জরিমানা অব্যাহত থাকে; তাহলে সারা বাংলাদেশের মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণে আসতে বাধ্য। পাশাপাশি জাতি এই অভিশপ্ত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাবে। এই কাজটি বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মহাসড়কে একযোগে হতে হবে।

আমার অভিমত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দ্রুতগতির গাড়ির বিরুদ্ধে যে নগদ জরিমানা করা হবে, তার শতকরা ৫০ ভাগ টাকা ম্যাজিস্ট্রেটসহ উক্ত টিমকে ইনসেনটিভ হিসেবে দেওয়া হলে এবং অবশিষ্ট ৫০ ভাগ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করলে উক্ত কাজ করতে তারা উৎসাহিত হবে। সকালের দিকে যে দুর্ঘটনাগুলো সংঘটিত হয় তার বেশির ভাগ ঘটে ঘুমের কারণে। একজন চালক আইন অনুসারে একটানা ৫ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারে অথচ অনেক সময় দেখা যায়, একজন চালক বিশ্রাম ব্যতীত একটানা ১৩-১৪ ঘণ্টা গাড়ি চালাচ্ছে। ফলে ঘটছে মারাত্মক দুর্ঘটনা। যদি মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ইউনিয়ন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করত, তাহলে এই দুর্ঘটনাগুলো অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো।

পরিশেষে বলব, চালকদের প্রতি আমাদের আরো সদয় হতে হবে। মহাসড়কের পাশে তাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি চালকদের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করা হয় এবং তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হয়, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক : পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন)
ঝিনাইদহ
ksalahuddin84@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই সম্পর্কিত আরও খবর...