সিলেটে সিএনজি চালিত অটোরিক্সার নৈরাজ্য চলছেই

এমজেএইচ জামিল

  • প্রকাশিত: ২৪ নভেম্বর ২০২১, ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ

নগরজুড়ে সিএনজি অটোরিক্সার ভাড়া নৈরাজ্য চলছেই। ট্রাফিক আইনের অজুহাতে ৩ জন যাত্রী বহনের কথা থাকলেও ৪/৫ জন যাত্রী বহন করে আদায় করছে অতিরিক্ত ভাড়া। মাঝে মাঝে ট্রাফিক পুলিশের অভিযানে মামলা জরিমানা আদায় হলেও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রী সাধারণকে। এদিকে নগরীতে চালু থাকা ‘সিটি এক্সপ্রেস’ নামের টাউন বাসের সংখ্যা কম থাকায় সিএনজি অটোরিক্সার ভাড়া নৈরাজ্যের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে যাত্রীদের। ভাড়া নিয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশের নিস্ক্রিয়তার কারণে দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে অটোরিক্সা চালক। কেউ ভাড়া নিয়ে প্রতিবাদ করলে চালকদের তোপের মূখে পড়তে হয়। মাঝে মাঝে চালকেরা মিলে যাত্রীর গায়ে হাত তোলার ঘটনাও ঘটছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে যে কোন সময় অনাকাঙ্খিত ঘটনার আশঙ্কা করছে নিরীহ যাত্রী সাধারণ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন থেকে নগরীতে সিএনজি অটোরিক্সায় গ্রিল লাগানো ও ৩ জন যাত্রী বহনের নির্দেশনা দিয়ে তা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও মহানগর ট্রাফিক পুলিশ। গেল বছরের নভেম্বরে ট্রাফিক পুলিশ কিছুটা হার্ডলাইনে গেলে প্রতিবাদে লাগাতার ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচী পালন করে সিএনজি চালকগন। তাদের প্রতিবাদের মূখে কিছুটা পিছু হটে বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগ। করোনাকালিন লকডাউন চলাকালে এক সিএনজিতে ৩ জন যাত্রী বহনের নির্দেশনা থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে যাত্রী সাধারণকে। এদিকে লকডাউন পুরোপুরি তুলে দেয়ার পর হঠাৎ করে চলতি বছরের ১১ আগস্ট থেকে সেই আইন নিজে থেকেই কার্যকর করতে শুরু করে সিএনজি চালকরা। তারা ৫ জনের পরিবর্তে ৩ জন যাত্রী বহন করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে শুরু করে। এ নিয়ে যাত্রী সাধারণের সাথে শুরু হয় বাক বিতন্ডা। যার ধারা এখনো অব্যাত রয়েছে।

মঙ্গলবার সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, ৩জন চড়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ সিএনজিতে যাত্রী আছেন ৪ জন। কোন কোন ক্ষেত্রে ৫ জন যাত্রীও বহন করছে চালক। কিন্তু ভাড়া নিচ্ছে অতিরিক্ত। মদীনা মার্কেট থেকে ওসমানী মেডিকেলের ভাড়া ছিল ৫ টাকা। সেখানে এখন নেয়া হচ্ছে ১০ টাকা। ৩ জন যাত্রী বহন করার কথা থাকলেও বহন করছে ৪ জন। ভাড়া আদায় করছে মাথাপিছু ১০ টাকা করে। এমন অবস্থা বন্দরবাজার, আম্বরখানা, কুমারগাও বাসস্ট্যান্ড, কদমতলী টার্মিনাল ও মেডিকেল রোডসহ নগরীর সকল পয়েন্টে।

জানা যায়, বন্দরবাজার থেকে টুকেরবাজারের ভাড়া পূর্বে ছিল ১৫ টাকা। গেল বছরে হঠাৎ করেই ভাড়া ২০ টাকা নির্ধারণ করেন সিএনজি অটোরিক্সা স্ট্যান্ড ম্যানেজাররা। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে কোন আলাপ আলোচনা না কওে নিজেরাই এই ভাড়া নির্ধারণ করেন। এই ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারী রাতে বাকবিতন্ডার জের ধরে বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্টে সিএনজি চালকের হাতে খুন হন অগ্রনী ব্যাংক কর্মকর্তা মওদুদ আহমদ। যা নিয়ে গোটা সিলেটে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। বন্দরবাজার থেকে টুকেরবাজারের পুনঃনির্ধারিত ভাড়া ছিল ২০ টাকা। এখন ৩ যাত্রী বহনের কথা বলে জনপ্রতি নেয়া হচ্ছে ৩৫ টাকা। ৫ জন যাত্রী নিয়ে যেখানে পাওয়া যেতো ১০০ টাকা, সেখানে ৩জন যাত্রী নিয়ে চালক পাচ্ছেন ১০৫ টাকা। অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে ৩ জন যাত্রী বহনের কথা বললেও বিভিন্ন অজুহাত তুলে অতিরিক্ত ভাড়ায় ৪/৫ যাত্রী বহন করতে দেখা গেছে। দিনের বেলায় পুলিশ টহল থাকায় কিছু ক্ষেত্রে ৩ যাত্রী বহন করলেও বিকেল হতেই শুরু অতিরিক্ত ভাড়ায় ৪/৫ জন বহন। এই অবস্থা চলতে থাকে পরদিন সকাল পর্যন্ত।

আম্বরখানা থেকে টুকেরবাজার পূর্বের ভাড়া ছিল ১৫ টাকা। এখন জনপ্রতি নেয়া হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। দিনের বেলায় ৩ জন যাত্রী নিলেও সন্ধ্যায় পাল্টে যায় দৃশ্যপট। ভাড়া ২৫ টাকা করে নিলেও যাত্রী বহন করে ৫ জন। এমন দৃশ্য বন্দরবাজার টু বটেশ^র, বন্দরবাজার টু দক্ষিণ সুরমা, আম্বরখানা টু বিমানবন্দর, আম্বরখানা টু টিলাগড়সহ নগরীর সকল রুটে। বন্দরবাজার-শিবগঞ্জ ভাড়া ১০ টাকা হলেও নেয়া হচ্ছে ২০ টাকা। বন্দরবাজার-শাহপরান ২০ টাকা হলেও নেয়া হচ্ছে ৩৫ টাকা। বন্দরবাজার-ঈদগাহ ভাড়া হলো ১০ টাকা, এই ছোট্ট পথেও ভাড়া দিগুণ করে নেয়া হচ্ছে ২০ টাকা। ভাড়া বেশী নিলেও যাত্রী বহন করা হচ্ছে ৫ জনই। প্রতিবাদ করলেই নামিয়ে দেয়া হয় গাড়ী থেকে। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই যাচ্ছেন সবাই। এদিকে আম্বরখানা থেকে এয়ারপোর্টের ভিতর পর্যন্ত পূর্বের ভাড়া ছিল ২৫ টাকা। এখন নেয়া হচ্ছে ৩০ টাকা, তবে এই রুটে যাত্রী বহন করা হচ্ছে ৪ জন। ঐ রুটের চালক জানান, বিমানবন্দরে কর্মরত চাকুরীজীবী ও এলাকাবাসীর অনুরোধে এই রুটে ৪ জন যাত্রী বহন করলেও পুলিশ যাত্রী জনিত কারণে মামলা দিচ্ছেনা। ফলে তারা জনপ্রতি ৫ টাকা অতিরিক্ত ভাড়ায় যাত্রী বহন করতে পারছে। এতে চালক ও যাত্রী উভয়কেই সন্তুষ্ট থাকতে দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নগরীতে সিএনজি অটোরিক্সা চলাচলের নীতিমালা করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এর কোন আগ্রহ নেই। বিষয়টি নিয়ে প্রায় ৬ বছর আগে সিলেট মহানগর পরিবহন কমিটি (এমআরটিসি) পত্র দিলেও আজো বিআরটিএ-এর কোন জবাব দেয়নি। ফলে নীতিমালা না থাকায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে অটোরিক্সা চলাচল। ২০০০ সালে সর্বপ্রথম সিলেট বিআরটিএ কার্যালয়ে থ্রিহুইলার রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে সর্বশেষ অটোরিক্সার রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয় সিলেট বিআরটিএ-তে। ১৪ বছরে সিলেট বিআরটিএ কার্যালয় থেকে ২১ হাজারের বেশী অটোরিক্সার রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়। এর মধ্যে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় ইতোমধ্যে ১০ হাজার অটোরিক্সা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে আছে। আইন অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি অটোরিক্সা চলাচল সম্পূর্ণ বেআইনী। কিন্তু এসব মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি অটোরিক্সা অবাধে চলছে নগরীসহ সিলেটের বিভিন্ন এলাকায়।

এদিকে সিএনজি ভাড়া নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পেতে নগরীতে সিটি টাউন বাস বৃদ্ধি ও চলাচলের রুট বাড়ানোর দাবী যাত্রী সাধারণের। বর্তমানে নগরীর ৪টি রুটে প্রতিদিন ১৫ টি সিটি বাস চলাচল করছে। রুটগুলো হলো: বন্দরবাজার- হেতিমগঞ্জ, বন্দরবাজার-বটেশ^র, বন্দরবাজার-সালুটিকর ও বন্দরবাজার-টুকেরবাজার। নগরীতে ২১টি সিটি বাস থাকলেও ইঞ্জিন ত্রুটি জনিত সমস্যার কারণে দিনে ১৫টির বেশী বাস চলাচল করতে পারেনা। যেসব রুটে সিটি বাস চলাচল করে এসব রুটে সব সময় যাত্রীদের ভীড় লক্ষ্য করা গেছে। সিটি বাসগুলোকে যদি নগরীর প্রতিটি রুটে চালু করা যায় তাহলে সিএনজি অটোরিক্সার হয়রানী থেকে যাত্রীরা কিছুটা হলেও রেহাই পাবে।

এ বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও নগর এক্সপ্রেস সিটি বাস মালিক গ্রুপের আহবায়ক মখলিছুর রহমান কামরান  বলেন, বিআরটিএ কর্তৃক আমাদের যেসব রুটে পারমিট দেয়া হয়েছে সিটি বাস সেসব রুটেই চলাচল করছে। বাস ও রুট বাড়ানোর সাধ্য আপাতত আমাদের নেই। তবে বিষয়টি আমাদের পরিকল্পনায় আছে।

বিআরটিএ সিলেট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (প্রকৌশলী) মোঃ সানাউল হক বলেন, সিএনজি অটোরিক্সার ভাড়া নিয়ে আমাদের কিছু করার নেই। সিএনজি মিটার থাকলে মিটারে চলবে অন্যথায় চুক্তিতে যাত্রী বহন করবে। তবে গ্রীল লাগানোর ব্যাপারে আমাদের নির্দেশনা দেয়া আছে। এসএমপির ট্রাফিক বিভাগ সে লক্ষ্যে কাজ করছে। এছাড়া আমাদের নিয়মতান্ত্রিক মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে মোবাইল কোর্টের অভিযান অব্যাহত আছে।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী বলেন, সিএনজি অটোরিক্সা ভাড়া নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের তেমন কিছু করার নেই। নগরীতে রিক্সাভাড়া নির্ধারণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করলে তিনি বলেন, জনকল্যাণ্যের নিমিত্তে রিক্সার মতো যদি সিএনজি ভাড়া নির্ধারণের কোন নীতিমালা থাকে তাহলে সে আলোকে সিসিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।

এসএমপির উপ পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ফয়সল মাহমুদ বলেন, সিএনজি হোক আর যে কোন যানবাহনই হোক তাদেরকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। আর সড়কে আইন মানতে বাধ্য করতে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করছে। সিএনজি অটোরিক্সা ভাড়া নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের কিছু করার নাই। আমরা আমাদের নিয়ম মাফিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিষয়টি দেখছি।

সিলেট জেলা সিএনজি অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো: জাকারিয়া আহমদ বলেন, নগরীতে ৩ জন যাত্রী বহনের ব্যাপারে আমাদের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এমনকি আমরা প্রতিদিন নিজস্ব টিম দিয়ে মনিটরিং করছি। কেউ অতিরিক্ত যাত্রী বহন করলে কিংবা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে আমরা নিজেরা জরিমানা আদায় ও কিছু সময়ের জন্য গাড়ী চলাচল বন্ধ রাখি। অতিরিক্ত ভাড়ার ব্যাপারে আমাদের কাছে অনেকেই অভিযোগ করেন ঠিকই কিন্তু দৃশ্যমান প্রমাণের কারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারিনা। সিএনজি চালকদের অনিয়ম ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রমাণ আমাদের কাছে প্রদর্শন করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই সম্পর্কিত আরও খবর...