বাজারে দামের উত্তাপ

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২২, ৫:৪৪ অপরাহ্ণ

মশলার দাম বেড়েছে ২০-৪০%, চালে অস্থিরতা, আছে সুখবরও,
দাম বাড়ানোয় বাড়ছে সয়াবিনের সরবরাহ

বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশেও বেড়েছে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম। মূল্য বৃদ্ধির উত্তাপ লেগেছে বাজারে। সব ধরনের মশলার দাম বেড়েছে ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত। বিক্রেতাদের দাবি, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবেই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে আমদানিনির্ভর এ পণ্যের। আর চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে চালের ঘাটতি আছে। কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা মজুতদারি করছেন। আবার বাজারে ঘাটতি আতঙ্কও নানাভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে চালের বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। তবে ব্যাপকভাবে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির প্রস্তুতির আভাস পেয়ে বাজারে চালের দাম কমার পূর্বাভাসও দেখা যাচ্ছে। মিলাররা জানিয়েছেন, দুই-তিন দিন ধরে চালের দাম কমতে শুরু করেছে। আড়তগুলোতেও দাম কমার তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী সপ্তাহে তার প্রভাব খুচরা বাজারেও দেখা যেতে পারে।

এদিকে, দাম বাড়ানোর পর বাড়ছে সয়াবিন তেলের সরবরাহ। রামপুরা বাজারে আসা একজন ক্রেতা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আজ দেখছি দোকানগুলোতে তেলের সরবরাহ বেড়েছে। সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোই ছিল উদ্দেশ্য। আক্ষেপ, ক্রেতাদের স্বার্থ দেখার কেউ নেই। আসলে দাম বাড়ানোই ছিল উদ্দেশ্য। আর সেই উদ্দেশ্য সফল হওয়ার পর বাজারে বাড়ছে সয়াবিন তেলের সরবরাহ।

নওগাঁ চালকল মালিক সমিতির সভাপতি নিরোধ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘এই মৌসুমে চালের বাজার অস্থির হওয়ার কথা নয়। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে বাজারে চালের দাম ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ার বিষয়টি আসলে আমরা নিজেরাও হিসাব করে পাই না।’

দেশে চালের বাজারে অস্থিরতা এমন এক সময় শুরু হয়েছে, যখন ভরা মৌসুম। এ মৌসুমে বাজারে চালের সরবরাহ সবচেয়ে বেশি থাকে। গত কয়েক দিনে চালের বাজারে যেভাবে দাম বেড়েছে, তা অস্বাভাবিক।

বাজারে চালের দাম বাড়ার কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, কোনো একটি সুনির্দিষ্ট কারণ কেউই শনাক্ত করতে পারছেন না। বেশ কয়েকটি বিষয় একযোগে কাজ করছে এর পেছনে।

চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে চালের ঘাটতি আছে। কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা মজুতদারি করছেন। আবার বাজারে ঘাটতি আতঙ্কও নানাভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে খাদ্য সচিব মো. ইসমাইল হোসেন বলেছেন, ‘ভরা মৌসুমে দেশে চাল নিয়ে এমন অস্থিরতা তৈরি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেটিই হচ্ছে।’

তিনি এর কারণ হিসাবে বলেন, ‘এমন হতে পারে, কোনো ব্যবসায়ীই কোনো নিয়ম-কানুন মানছেন না। হতে পারে, কারও কারও অতি লোভ, এ রকমটাও হতে পারে। কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে কিছু করছে কিনা সেটিও যাচাই করে দেখতে হবে।’

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাজারে এখন ধানের সংকট চলছে। কেউ তেমন আর ধান বিক্রি করছে না। ধানের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়ে যাচ্ছে দামও। মিনিকেট চাল তৈরি হয় এমন ধানের মণপ্রতি দাম এখন ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা, যা মাস কয়েক আগেও ছিল ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা। আবার এই বাড়তি দামেও চাহিদা অনুযায়ী ধান পাচ্ছে না মিলাররা।

এর সঙ্গে মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি। এতে ধান থেকে চাল উৎপাদন খরচ কেজিতে বেড়েছে ২ টাকা। ফলে যে পরিমাণ চাল উৎপাদন হচ্ছে, তা বাড়তি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। সেই বাড়তি দামের চাল ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে আরও বাড়তি দামে। কারণ মিলগুলো থেকে চাল পরিবহণের ভাড়াও বেড়েছে প্রতি কেজিতে ৬০ পয়সা এবং ৫০ কেজির বস্তায় ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এতে ঢাকার খুচরা বাজারে চিকণ চাল বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৭৬ টাকায় এবং মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাবুবাজার চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কাওসার আলম খান বলেন, ‘বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের ইস্যুটি দেশে প্যানিক সৃষ্টি করেছে। তার উপর দেশে চাহিদা অনুযায়ী ধান-চালের সরবরাহে ঘাটতিও আছে। আবহাওয়াও এবার খারাপ ছিল। প্রথম যখন ধান লাগায়, তখন পানি নাই। তারপর বৃষ্টি। যখন কাটতে যায় তখন পানির নিচে। শুধু হাওড়েই নয়, বিভিন্ন জায়গাতে বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এখন সবাই সচেতন। বিভিন্ন মাধ্যমে এ খবর চাউড় হওয়ার পর কৃষক থেকে ব্যবসাযী যার যে পরিমাণ ধান-চাল আছে, তারা পকেটে পকেটে মজুদ করেছে। কেউ বাজারে ছাড়তে চাইছে না।’

অন্যদিকে, ডলারের বাজারে অস্থিরতার কথা বলে গেল ৩ আগস্ট বোতলজাত প্রতিলিটার সয়াবিন তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করে ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও উৎপাদক সমিতি। ২০ দিন পর লিটারে সর্বোচ্চ ৭ টাকা বাড়াতে সম্মতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

মিরপুর শেওড়াপাড়ার আলিম স্টোরে দুইদিন আগেও বোতলজাত ৫ লিটার তেল কিনতে পারেননি রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, সংসার বড় হওয়ার কারণে একবারে ৫ লিটার কেনা হয়। কিন্তু পাঁচ লিটার না পেয়ে অগত্যা ২ লিটারের বোতল কিনতে হয়েছে। আশপাশের কোনো দোকানে তখনও পাওয়া যায়নি ৫ লিটারের বোতল। কিন্তু আজ অন্য পণ্য কিনতে এসে দেখছি পাঁচ লিটারের বোতল আছে।’

একই দোকানের ক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক দিন আগেও তিনটি দোকান ঘুরে এক দোকানে তেলের বোতলের গায়ের দামের চেয়ে ১০ টাকা বেশি দিয়ে ২ লিটার তেল কিনেছি। বেশি দামে তেল কিনতে পকেটের টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ আজ দেখছি দোকানগুলোতে তেলের সরবরাহ বেড়েছে। সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোই ছিল উদ্দেশ্য। আক্ষেপ, ক্রেতাদের স্বার্থ দেখার কেউ নেই।’

দোকানি আলিমউদ্দিন বলেন, ‘প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে চাহিদার বিপরীতে কোম্পানি থেকে তেল পাওয়া গেছে কম। গতকাল কোম্পানিকে চাহিদা দেওয়া হলে আজ সকালেই তারা দিয়ে গেছে।’

রাজধানীর হাতিরপুল বাজারের মদিনা স্টোরের দোকানি আলতাফ হোসেন জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে দোকানে সরিষার তেল ছাড়া কোনো সয়াবিন তেল ছিল না। বেশির ভাগ কোম্পানির কোনো প্রতিনিধিকে এখন দেখা যায় না। তবে বুধবার দুই-একজনের দেখা পেলে তারা জানান, এক বা দুইদিনের মধ্যে তেল সরবরাহ করা হবে।

কারওয়ান বাজারেও সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ দেখা যায়নি। তবে গত কয়েক দিনের তুলনায় দোকানগুলোতে এক, দুই বা পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দেখা মিলছে। দু-একটি দোকানে আগের কিছু তেল আছে। সেটা বিক্রি করছেন নতুন দামে। তবে গায়ে লেখা আগের দাম।

চাল এবং সয়াবিন তেলের এই অবস্থার মধ্যেই মূল্য বৃদ্ধির উত্তাপ লেগেছে মশলার বাজারে। সব ধরনের মশলার দাম বেড়েছে ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত। বিক্রেতাদের দাবি, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবেই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে আমদানি নির্ভার এ পণ্যের। তবে ক্রেতা ও খুচরা দোকানিদের অভিযোগ, ডলার বাজারের অস্থিতিশীলতার অজুহাতে অযৌক্তিক হারে বাড়ানো হচ্ছে মশলার দাম।

একজন ক্রেতা বলেন, আগে যে দামে নিতাম তার থেকে ১৫-২০ টাকা বেশি দামে মশলা নিতে হচ্ছে। অন্যান্য মশলার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

একজন বিক্রেতা বললেন, ১৫ দিন থেকে এক মাসের ভেতরে মশলার দাম ২০-৩০ এমনকি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আমরা কিছু জিজ্ঞেস করলে মোকাম থেকে শুধু বলে “ডলার”, এটা ছাড়া আর কোনো কথা বলে না। ডলারের দাম কমলে কী সব মশলার দাম আসলেই কমবে? এসবের কোনো উত্তর তারা দেয় না।

একজন খুচরা বিক্রেতা বলেন, কিছু ব্যবসায়ী আছেন যারা বলেন যে মালটা তার স্টকে আছে ডলারের দামটা বাড়ার কারণে আমি মালের দাম বাড়ায়ে দিলাম। আমদানিকারক ও বড় বড় ব্যবসায়ীরা প্রথম থেকেই এটা নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ তার। জানা গেছে, দেশে ৪৪ ধরনের মশলা ব্যবহার হয়। যার মধ্যে চাষ হয় ৩৪ ধরনের মশলা।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...