১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ১৩ ডিসেম্বর ২০২২, ৮:১১ অপরাহ্ণ

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৪ ডিসেম্বর গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। বাংলাদেশের বিজয় আসন্ন জেনে এদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও আলবদর বাহিনী যৌথভাবে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তাদের বাড়ি থেকে একে একে তুলে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতনের পর হত্যা করে।

এদিন দুপুর ১২টার দিকে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার বাড়ি থেকে আলবদর বাহিনীর ‘চিফ এক্সিকিউটর’ আশরাফুজ্জামান খান এবং ‘অপারেশন ইনচার্জ’ চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের উপস্থিতিতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে। এরপর দুপুর ১টার দিকে সেন্ট্রাল রোডের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নাট্যকার মুনীর চৌধুরীকে। একই দিন সন্ধ্যায় কায়েতটুলির বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারকে। এদিন একে একে বহু বুদ্ধিজীবীকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন স্থানে।

১৪ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মানেকশ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উদ্দেশে এক বার্তায় বলেন, ‘আমার সেনারা এখন ঢাকাকে ঘিরে ধরেছে এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টও এখন কামানের গোলার আওতায়। সুতরাং আপনারা আত্মসমর্পণ করুন। আত্মসমর্পণ না করলে নিশ্চিত মৃত্যু। যারা আত্মসমর্পণ করবে তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে এবং তাদের প্রতি ন্যায়সংগত ব্যবহার করা হবে।’

ঢাকার পরিস্থিতি : গভর্নর হাউসে গভর্নর ডা. এম এ মালিকের সঙ্গে পূর্বপাকিস্তানের মন্ত্রিসভার সদস্যরা ১৪ ডিসেম্বর বৈঠকে বসেন। এ সময় বৈঠকের খবর শুনে ভারতীয় মিত্র বাহিনী বেলা সোয়া ১১টার দিকে গভর্নর হাউসে বিমান হামলা চালায়। এ সময় গভর্নর হাউস বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ বাঁচাতে গভর্নর এম এ মালিক দৌড়ে গিয়ে এয়ার রেইড শেল্টারে গিয়ে আশ্রয় নেন। এ সময় তিনি পদত্যাগপত্র লিখে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পালিয়ে যান।

১৪ ডিসেম্বর বিকালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ নিয়াজী যুদ্ধবিরতির জন্য প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এরপর ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব পাঠায়। ১৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামান ও দুই ভাই যথাক্রমে শাহজাহান ও করিমুজ্জামানকে ঢাকার গোপীবাগের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনী।

১৪ ডিসেম্বর একাধারে হানাদার মুক্ত হয় কেশবপুর, মোড়েলগঞ্জ, শাহজাদপুর, শেরপুর, শিবগঞ্জ, উল্লাপাড়া, তাড়াইল, আক্কেলপুর, পাঁচবিবি, নবীনগর, সাভার, কালিয়াকৈর, গজারিয়া, মির্জাপুর, কাউখালি, চিলমারী, দোহাজারী, নাজিরহাট ও সান্তাহার রেল জংশন, বান্দরবান। এর আগে বান্দরবানের কালাঘাটা, ডলুপাড়া, ক্যানাই জ্যু পাড়াসহ কয়েকটি স্থানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক যুদ্ধ হয় মুক্তিবাহিনীর। এক পর্যায়ে টিকতে না পেরে হানাদার বাহিনী বান্দরবান ছেড়ে পালিয়ে যায়। এদিন সিরাজগঞ্জও হানাদার মুক্ত হয়। এর আগে ১৩ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার আমির হোসেন ভুলুর নেতৃত্বে শৈলাবাড়ীতে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে টিকতে না পেরে ঈশ্বরদীর দিকে ট্রেনে করে পালিয়ে যায় হানাদার বাহিনী। পরে সকালে সিরাজগঞ্জ শহরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তথ্য সূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ- দলিলপত্র একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...