বই আলোচনা: সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সৌধ

শ্রাবন্তী চক্রবর্তী

  • প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২১, ৪:৪৮ অপরাহ্ণ

স্বাধীনতা প্রতিটি জাতি ও মানুষের জন্য গৌরবের। প্রত্যেক জাতিকে তাদের নিজ নিজ স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় সংগ্রাম, নিপীড়ন, অত্যাচার এবং রক্তস্রোতের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক পলাশীর প্রান্তরে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলেও, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর সাথে যে মানসিক দ্বন্দ্ব -সংঘাত, বিবাদ -বিদ্রোহ ও ঘাত-প্রতিঘাতের সৃষ্টি হয়েছিল, তা ক্রমেই অগ্নিশিখার মতো ছড়িয়ে পড়ে পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের মনে। এরপর থেকে ভাষা আন্দোলনসহ বহু সংগ্রাম, লক্ষ প্রাণের রক্ত, মা-বোনদের সম্ভ্রমহানী এবং কতই-না বঞ্চনা ও শোষণের ইতিহাস পাড়ি দিয়ে ১৯৭১ সালে দেখা মেলে প্রাণের কাঙ্খিত স্বাধীনতার। কিন্তু অতীতের দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠীর অপশাসন, অন্যায়, বঞ্চনা, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-নিপীড়ন বাঙালির মন থেকে মুছে যায়নি। অপশক্তি কর্তৃক অপশাসন ও নিপীড়নের প্রতিফলন ঘটেছে কবিতা, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং নাটকসহ সাহিত্যের সকল শাখায়. মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস বাঙালিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। তাই বাঙালির জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত গৌরবময় ও তাৎপর্যমন্ডিত ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা। যে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ত্যাগ ও গৌরবের ইতিহাস। যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য। এমনকি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে বাঙালি সাহিত্যিকগণ শিল্প-সাহিত্যে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের মাধ্যমে বাঙালির দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, শৌর্য-বীর্যবত্তা এবং অসীম সাহসিকতার সুপরিচয় যুগ-যুগান্তরব্যাপী বিবৃত হয়ে এসেছে। সুতরাং স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলা সাহিত্য অনন্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।

আনোয়ার শাহজাহান এমন একজন মানুষ যিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও জন্মভূমির প্রতি তাঁর ভালোবাসা হৃদয়ে লালন করেন। শেকড় এবং ঐতিহ্যের প্রতি টান থেকে তিনি স্মরণ করাতে চান বাঙালির গৌরবজনক ইতিহাস। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি একাধারে লেখক, গবেষক, সংগঠক, সাংবাদিক এবং শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর দেশপ্রেম এবং বাংলাভাষার প্রতি ভালোবাসা তাঁর সাফল্যগাথার প্রধান চাবিকাঠি। মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ এবং সিলেট এই ত্রিধারার সংযোগ ঘটেছে তাঁর রচিত ‘মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সৌধ’ গ্রন্থটিতে। ভবিষ্যত প্রজন্মের সিলেটের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত গবেষণার এটি একটি পথনির্দেশিকা।

মুক্তিযুদ্ধ মানে বাঙালির শোকবহ ইতিহাসের স্মরণ। একাত্তরের শতসহস্র মানুষের আত্মত্যাগ আর অসংখ্য মা বোনের সম্ভ্রম হারানোর শোকাবহ গল্প বাঙালিকে প্রেরণায় উজ্জীবিত করে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতবর্ষের সীমান্তবর্তী সিলেট রেখেছিল অসামান্য অবদান! মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল এমএজি ওসমানী ছিলেন সিলেটের কৃতিসন্তান। ক্ষমতামোহে অন্ধ পাকিস্তান সরকার তৈরি করেছিল আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী। যাদের সহযোগিতায় সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে চলেছিল নরমেধ যজ্ঞ, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উজ্জীবিত রাখতে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সিলেটে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্মৃতিময় ভাস্কর্য, স্মৃতিফলক! এই নিয়েই রচিত হয়েছে সিলেটের ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সৌধ’।

এই গ্রন্থে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলোর কথা তুলে ধরা হয়েছে এবং যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বেদনা ও অভিজ্ঞতার বর্ণনাও রয়েছে। আরও রয়েছে সে সব স্থানে কিভাবে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। সেই সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নির্বিচারে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক মানুষ। সেসব নির্যাতনের স্থান ও বধ্যভূমিগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করলে নতুন প্রজন্ম ভুলে যাবে সেসব দিনের ইতিহাস।

আনোয়ার শাহজাহান বহু শ্রম ও সময়ের বিনিময়ে সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও স্মৃতিসৌধ সম্পর্কে তথ্য আহরণ করে পরম যত্নের সঙ্গে এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। গ্রন্থটিতে আনোয়ার শাহজাহান বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানের বর্ণনা করেছেন, যার দ্বারা বাঙালির জাতিসত্ত্বা ও স্বাধিকার আন্দোলনের মধ্যে এক ঐকান্তিক সম্পর্কের মেলবন্ধন রচনা করতে সক্ষম হন। এই গ্রন্থটিতে সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের স্থান ও সৌধের বিস্তৃত বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি চারটি অধ্যায়ে চারটি বিভাগের নির্ভরযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করেছেন। অসাধারণ পারদর্শিতা ও দক্ষতার সাথে গবেষণার মাধ্যমে এমন অসংখ্য স্থান ও সৌধের উল্লেখ গ্রন্থটিতে আছে, যে নতুন প্রজন্ম জ্ঞান আহরণ করে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ অর্জনের পেছনে সিলেটের ত্যাগগাথা সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশমাতৃকার কল্যাণের জন্য প্রেরণা লাভ করবে। তাই এই গ্রন্থে নিঃসন্দেহে সিলেটের গর্ব ও অহংকার।

আদিত্যপুর গণহত্যার স্মৃতিসৌধ, কুচাই শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ, ডক্টর মুক্তাদির একাডেমী, একাত্তরের শহিদদের স্মরণে নির্মিত সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার, ওসমানী মেডিকেল কলেজ স্মৃতিস্তম্ভ, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট অনুশীলন, জকিগঞ্জে তিন শহিদের স্মৃতিফলক, তামাবিল মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর, দিগেশ ঘোষ স্মৃতিস্তম্ভ, পুলিশলাইন স্মৃতিস্তম্ভ, বিষ্ণুপুর গণহত্যার স্মৃতিফলক, মেন্দিবাগ স্মৃতিস্তম্ভ, শহিদ সফিক স্মৃতিফলক, সিলেট সরকারী কলেজের স্মৃতিসৌধ, বড়চর স্মৃতিফলক, হবিগঞ্জের দুর্জয়, রানীগঞ্জ গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ,সুনামগঞ্জের ‘যাদের রক্তে মুক্ত এদেশ’, শ্রীমঙ্গল বীরশ্রেষ্ঠ সরনি, হামিদুর রহমান বীরশ্রেষ্ঠ সরনি ইত্যাদি এইরূপ ৮৫টি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সৌধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা আছে চারটি অধ্যায়ে। সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার। এছাড়া পঞ্চম অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ আছে তথ্যসূত্র ও নির্ঘণ্ট। বইটি উৎসর্গীকৃত ‘যাঁদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি’।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিটি জায়গার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। স্থানও যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে। সেগুলো প্রতীক হয়ে রয়েছে যুদ্ধের নৃশংসতা বা সাহসিকতার।

আনোয়ার শাহজাহানের প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যা সাতটি। এছাড়া তাঁর সম্পাদিত অনেক গ্রন্থগুলিও পাঠকমহলে যথেষ্ট সমাদৃত। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বেশ কয়েকটি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

শেকড়সন্ধানী ও গবেষক আনোয়ার শাহজাহানের গবেষণাধর্মী এই গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে অনেক অজানার দ্বার উন্মোচন করেছে। তাঁর দেশ ও জাতির প্রতি এই দায়বদ্ধতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নতুন প্রজন্ম নিশ্চয়ই এইরূপ গবেষণামূলক কাজে এগিয়ে আসবে। অনেক জায়গা আজও অশনাক্ত রয়ে গেছে, তার কারণ একটি প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর একজন মানুষের গবেষণাই শেষ কথা নয়. ভিন্ন ভিন্ন মানুষের শানিত চিন্তা, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার পরশে নতুন চিন্তার নতুন কোন দিক উন্মোচিত হবে এই আশা ও শুভকামনা।

শ্রাবন্তী চক্রবর্তী
রসায়ন শিক্ষক, মাস্টার্স ও গবেষণা (রসায়নশাস্ত্র) কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই সম্পর্কিত আরও খবর...