গ্রন্থ পরিচিতি : প্রবাসী লেখক আনোয়ার শাহজাহান -এর করোনা আতঙ্ক দেশে দেশে

এম আতাউর রহমান পীর

  • প্রকাশিত: ৩১ মে ২০২১, ১২:৫৬ অপরাহ্ণ

লাতিন শব্দ ভাইরাস অর্থ ‘বিষ’। এটি অতি ক্ষুদ্র জীবাণু। মানুষ, পশুপাখি ও উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী এ ভাইরাস। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে বিভিন্ন সময় ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াঘটিত বিভিন্ন রোগে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জনশূন্য হয়েছে বহু নগর ও জনপদ।

অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৪৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিসে প্লেগ রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় বিশ্বে জনসংখ্যা ছিল খুবই কম, তবুও পাঁচ বছর ধরে চলা ওই রোগে ১ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ৫৪১ সালে শুরু হয়ে ২০০ বছরব্যাপী স্থায়ী হওয়া জাস্টিনিয়ান প্লেগে সারা বিশ্বে মারা যায় ১০ ভাগের ১ ভাগ মানুষ। ১৩৪৬ সালে দ্য ব্ল্যাক ডেথ মহামারিতে ইউরোপে অর্ধেকের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। ১৮১৭ সালে কলেরা ভাইরাস মহামারি আকারে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শতাব্দীকালব্যাপী এ রোগে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে ১৯১৮ ও ১৯১৯ সালের মধ্যে স্প্যানিশ ফ্লুতে বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যায়। এরপর বিশ্বজুড়ে এশিয়ান ফ্লু, গুটি বসন্ত, এইডস, সার্চ, ইবোলা ইত্যাদি রোগ কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

বিগত ১০০ বছরে বড় কোনো মহামারি পৃথিবীতে আঘাত হানেনি। যান্ত্রিক উৎকর্ষতা আর উত্তরোত্তর বৈজ্ঞানিক সাফল্যে মানুষ যখন অতি আধুনিকতায় জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে আবির্ভূত হয় করোনা ভাইরাস। অত্যাধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কয়েক মাসে তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বছর না ঘুরতেই সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতির চাকা থমকে যায় এবং এক মহা আতঙ্ক এসে কড়া নাড়ে মানব দুয়ারে।

ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় করোনা মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী শুরু হয় লকডাউন আর কারফিউ। একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার আপ্রাণ চেষ্টার পরও প্রাণঘাতী এ রোগে ৩০ এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত প্রায় ৩২ লাখ মানুষ মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ কোটি মানুষ। এর পরিণতি যে কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা কেউ জানে না। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক, যুক্তরাজ্যের জেনেটিক সারভাইল্যান্স প্রোগ্রামের প্রধান বিজ্ঞানী প্রফেসর শ্যারন পিকক বলেছেন, ভাইরাস থেকে যেসব রোগ মহামারি আকারে ছড়ায়, সেগুলো বিভিন্ন কারণে একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে করোনা ভাইরাস বিশ্বের কোথাও দুর্বল হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

করোনা ভাইরাস মাত্র এক বছরে বিশ্বের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে তছনছ করে দিয়েছে। মানুষ থেকে মানুষের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। মৃত্যুভয়ে সবাই তটস্থ। তবুও মানুষ বেঁচে আছে, টিকে আছে; নির্মূল হয়নি। অক্লান্ত সাধনায় মানুষ ইতোমধ্যে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। দেশে দেশে চলছে ভ্যাকসিন দেওয়ার উৎসব। অন্যদিকে ভ্যাকসিন নেয়ার পরও মানুষ করোনা পজিটিভ হচ্ছেন। তবুও বলা যেতে পারে, যুদ্ধ করে মানুষ জয়ী হয়েছেন এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে।

গত এক বছরে দেখা গেছে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যত মানুষ মারা গেছেন, তাঁদের অধিকাংশই প্রবীণ। শুধু এ কারণে আমিও সব সময় একধরনের আতঙ্কের মধ্যে জীবন যাপন করছি। ঠিক এমন সময় আমার প্রিয়ভাজন লেখক, গবেষক আনোয়ার শাহজাহান তাঁর করোনাকালে লেখা পাণ্ডুলিপিটি আমার কাছে পাঠান। ‘করোনা আতঙ্ক দেশে দেশে’ (প্রাথমিক পর্যায়) পাণ্ডুলিপিটি আমি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। তাঁর ধৈর্যশক্তি ও সৃজনশীলতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। সবাই যখন নিজ নিজ বাসায় পরিবার নিয়ে একরকম বন্দী জীবন যাপন করছেন, তখন তিনি ঘরবন্দী অবস্থায় থেকে এক মহাযজ্ঞ সম্পন্ন করেছেন। কালিদাসের ‘মেঘদূত’, মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদসিন্ধু’ কিংবা মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্যের চেয়ে তাঁর ‘করোনা আতঙ্ক দেশে দেশে’ কোনো অংশেই কম নয়।

আনোয়ার শাহজাহান নিজে এমনকি তাঁর পরিবারের সবাই করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। মৃত্যুদূত তাঁর দুয়ারে কড়া নেড়েছে বারবার। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় সময় কাটিয়েছেন তিনি। জীবনের কঠিনতম সময়ে আত্মীয়স্বজনদের খোঁজ নিয়েছেন। বিশ্ব মিডিয়ায় চোখ রেখেছেন। উপাসনা করেছেন। একই সাথে করোনা ভাইরাস নিয়ে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা এবং সারা বিশ্বের প্রতিদিনকার আপডেট গ্রন্থ আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন।

বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে তাবৎ মানুষের লেখক সত্তা যখন থমকে গেছে, তখন আনোয়ার শাহজাহান সিন্ধু সেচে করেছেন মুক্তা আহরণ। সারা বিশ্বে কোথায় কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন, তা তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর এ গ্রন্থে। একজন প্রফেশনাল গবেষকের দৃষ্টিতে তিনি করোনা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। মহামারিকালে মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন রং-তুলির আঁচড়ে আঁকা ছবির মতন।

খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ আর অর্থসংকটে মানুষ দিশেহারা। খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে নেমে এসেছে অসহনীয় ভোগান্তি। করোনা আক্রান্ত বিশ্বে প্রতিদিন ঘটছে বিচিত্র সব ঘটনা! ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ হয়েছেন কতই না অমানবিকতার শিকার! এর কিছুই এড়িয়ে যায়নি লেখকের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি থেকে।

আনোয়ার শাহজাহান তাঁর গ্রন্থে একদিকে যেমন চলতি ঘটনার বিশ্লেষণ করেছেন, অন্যদিকে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেছেন। কিছু কিছু নিবন্ধে উপদেশও দিয়েছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ দৃষ্টি অত্যন্ত প্রখর। এককথায় লেখক হিসেবে তিনি সব্যসাচী। দিনলিপি আকারে লেখা নিবন্ধগুলোকে তিনি পাঠকের জন্য সর্বজনীন করে তুলেছেন। সহজ আর সাবলীল ভাষায় করোনাকালে বাংলাদেশের কোনো এক পল্লিগ্রামের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনাও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। গ্রন্থ পাঠে মনে হয়েছে, ঘটনার বর্ণনা ও মর্ম তিনি নিজে পর্যবেক্ষণ করেছেন। করোনায় আক্রান্ত দেশ-বিদেশের ইতিহাস আখ্যানের আশ্রয় নিয়ে তিনি সুখপাঠ্য এক মহাকাব্য রচনা করেছেন। তাঁর অনবদ্য এই আখ্যান ভবিষ্যতের পাঠকদের জন্য উল্লেখযোগ্য এক গ্রন্থ হয়ে থাকবে।

আমাদের আগামী প্রজন্ম করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জানতে অবশ্যই আনোয়ার শাহজাহানের ‘করোনা আতঙ্ক দেশে দেশে’ গ্রন্থটির সহায়তা নেবে, এটাই প্রত্যাশা। কেননা একবিংশ শতাব্দীতে সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নের চাকাকে স্থবির করে দেওয়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের সঠিক পরিসংখ্যান জানতে চাইলে এ গ্রন্থের কোনো বিকল্প নেই। আশা করছি, লেখকের পরিশ্রম সার্থক হবে।

এম আতাউর রহমান পীর
সাবেক প্রিন্সিপাল, মদন মোহন কলেজ, সিলেট।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই সম্পর্কিত আরও খবর...