গ্রামীণ লকডাউন বনাম কিছু বাস্তবতা

শেখ সায়মন পারভেজ

  • প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০২১, ৫:০৩ অপরাহ্ণ

গ্রাম্য প্রকৃতির কোলে আমার বেড়ে ওঠা। তাইতো বিধাতার কৃপা পেয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভ করে বড় হয়েছি। সকল সুখ স্মৃতির মাঝে একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা যুক্ত হল এই করোনাই। স্বজাতির নিন্দা করছি না শুধুমাত্র আপন আক্ষেপটা একটু লাঘব করছি কি আর বলব, সকল ক্ষোভ যেন সরকারের প্রতি গ্রামের লোকজনদের ও কেন না সবসময় মুখের মাস্ক পরে রাখতে হয়, আর মাস্ক পরলে নাকি দম বন্ধ হয়ে আসে।

না পারে মাস্ক ছাড়া বাজারে যেতে, না পারে চায়ের দোকানে বসতে, না পারে গল্পগুজব করত , সকল কিছুর মূলই তো ওই মাস্ক এর ব্যবহার। অতএব ইহাই সরকারের প্রতি তিক্ততার কারণ। কিন্তু‘ এটা বোঝার চেষ্টা করে না, তাদের করোনা হতে বাঁচাতে রাষ্ট্রই কত ধৈর্যশীলতা, সক্রিয়তা, নিষ্ঠার পরিচয় দিচ্ছে।

জীবন বাজি রেখে দেশের প্রতিটি প্রশাসকরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে শুধুমাত্র মানুষকে সচেতন করার জন্য, করোনা মহামারী থেকে রক্ষা করার জন্য। বাস্তবতা বুঝাতে আমার উপজেলার কথাই বলি। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ইউএনও মহোদয় করোনার শুরু থেকেই মাঠ পর্যায়ে সশরীরে উপস্থিত সত্যিই অবাক করার মতো।

একজন যোগ্য প্রশাসক হিসেবে দাবিদার। কেন বিষয়টি অবাক করার মতো বলছি। তার বিশ্লেষণে আসি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড় ভাই সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর লেখা ‘পালামৌ’ গল্পে একজন যুবকের গরু জঙ্গলের বাঘ দ্বারা নিহত হওয়ার ফলে যুবক ক্রোধ ও প্রতিজ্ঞায় জঙ্গলের বাঘ না মেরে অন্ন আহার করবে না।

এমন সময় নতজানু জ্ঞানী বৃদ্ধ তাকে নিষেধ করেছে বাঘের সাথে যুদ্ধ না করতে। কেননা এই বৃদ্ধরাই যুবক বয়সে বাঘের তাড়া খাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই তারা বুঝে বাঘের তাড়া খেলে কেমন লাগে। আর সেই অভিজ্ঞতায় যুবককে জঙ্গলে যেতে মানা করছে। এখন আমার কথা হল এটা , একজন প্রশাসক মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত ও বিভিন্ন গুণের অধিকারী।

তিনি অবশ্যই জানেন করোনা কিভাবে ছড়ায়, কিভাবে প্রভাব বিস্তার করে। আর আক্রমণ করলে কতটা ভয়াবহ। এই লকডাউনে অন্যান্য পেশার লোকেরা যখন ঘরে বসে স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা ভেবে সময় কাটাচ্ছে, তখন দেশের সেবায় নিয়োজিত এই প্রশাসক সৈনিকরা জীবন বাজি রেখে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। তাদেরও তো পরিবার আছে, তাদেরও সন্তান স্ত্রী আছে। তাদেরও জীবনের আশঙ্কা আছে। শুধুমাত্র দেশ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে নিষ্ঠার সাথে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। অতএব তারাই দেশের সূর্যসন্তান।

এখন আসি গ্রামের লোকজনদের চিন্তা-ভাবনাও প্রসঙ্গ নিয়ে। গ্রামের লোকজন তো এখনো করোনাকে গুজব মনে করে। বাতাস লাগা, কাক ডাকাকে যদিও এখনো সত্য মনে করে অশুভ ইঙ্গিত মনে করে। লকডাউন প্রেক্ষিতে সবাই তো আরো উৎসুক, বাজারে কি আজ পুলিশ আসছে কিনা? সেজন্য সাথে সাথে একটু আটটু টু মারে বাজারে।

কেউ ঠাট্টা করে যদি বলে পুলিশ আসছে , এদিকে ওদিকে ছোটাছুটি করে আর বাড়ি গিয়ে গিন্নির সাথে পুলিশের কথা শেয়ার না করলে তো রাতের ভাত হজম হবে না আরো কত গুজব কল্পকাহিনীও এবার যা হচ্ছে তা লিখলে হয়ত সম্পাদক সাহেবের পুরো পত্রিকাটি আমার লাগবে। অতএব সম্পাদকের কাগজ বাঁচানো আমার কর্তব্য।

আর সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হল বাড়ির গিন্নি একটু সচেতন তাইত জামা দিয়ে কিংবা একটু কাপড়ের টুকরা দিয়ে বানিয়ে দিয়েছে মাস্ক যাতে তার স্বামী পুলিশের যন্ত্রণা থেকে একটু রক্ষা পেতে পারে। এখন হয়ত মাস্ক বানানোর কাজটা তেমন হয়ে ওঠে না। কারণ ৫ টাকায় মাস্ক কিনা যায়। অতএব গিন্নিকে কষ্ট দেয়া যুক্তি সংগত না। ক্রয় করা মাস্কটি কোনো অনাদিকালে সে ক্রয় করেছিল তা বোধ হয় তার স্মরণ করা কষ্টকর হয়ে পড়বে। সর্বোপরি, মাস্ক তো লাগবেই। কারণ পুলিশ তো মাস্ক না দেখলে মার দিবে।

যাইহোক, স্বজাতিকে এত নিন্দা করলে স্বজাতিই হয়ত আমার দিকে তেড়ে আসবে। মাস্কের কথা এবার রাখি। আরেকটি বলি, বাপ চাচা বলে গ্রামে করোনা নাই, দাদা বলে গুজব। সত্যি অবাক করার মত কথা। অবাক তো তারাই হবে , যারা কিনা কখনো গ্রামের সংস্পর্শে আসে নি । কিংবা মাঝে মাঝে আসে তাও আবার অল্পক্ষণের জন্য ।

কিন্তু ‘আমার মত গ্রামীণ জনপদে বসবাস করা মানুষের কাছে যেন কথাটা স্বাভাবিক বিষয়। মাঝে মাঝে আমার আশপাশের লোকজনকে উৎসাহের বশে কথোপকথন করি করোনা নিয়ে। যখন জানতে চাই বাবা-চাচার বয়সের লোকজনের কাছে করোনা নিয়ে । তখন মৃদু হাসি দিয়ে বলে,’ গ্রামে করোনা নাই। নানা ধরনের অযথা যুক্তিও কলাগাছের মত সামনে দাঁড় করে। যদি একটু বুঝাতে চাই করোনাকে নিয়ে।

তাহলে বেয়াদব হয়ত তখনই বনে যাব। সাথে কিছু নীতিকথাও শুনব। তাই সেদিকে আর পা বাড়াই না। কিন্তু ‘জমে ওঠে দাদার বয়সী লোকজনের সাথে। করোনা নিয়ে যখন কিছু বলি, তখন দাদার বয়সী লোকেরা বলে, ‘করোনা তো গুজব।’ এমন ভাবে বলে যেন স্বচক্ষে সাক্ষী সে। এমন আজগুবি কথা শুনে যদিও তারুণ্যের রক্ত ক্ষেপে ওঠে। কিন্তু ‘কিছু আর করার থাকে না।

তাদেরকে বোঝানো যেন হেঁটে হেঁটে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার মত দুঃসাধ্য কাজ। আমার তো আবার মঙ্গল গ্রহে হেঁটে হেঁটে যাওয়ার ইচ্ছা নাই। মাঝে মাঝে একা একা ভাবি, গ্রামে এমন অসচেতনতার কারণ কি? হয়ত ক্ষুদ্র জ্ঞানে বোধ করি এদেরকে সঠিকভাবে জানানোর অভাব। সেই সাথে ধর্মীয় উপাসনালয়ে করোনা নিয়ে সচেতনমূলক কথাবার্তা বলার অভাব।

পূর্বেই বলেছি, ছোটবেলা থেকেই গ্রামাঞ্চলে বেড়ে ওঠার প্রেক্ষিতে একটু বাড়তি অভিজ্ঞতা কাজ করে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাপন নিয়ে। সে অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। অতি স্বল্প সময়ে দেশে করোনা টিকা প্রদানের পদক্ষেপ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য সরকার। তেমনি তা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিংও বটে। সারাদেশে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে করোনার টিকা প্রদান কর্মসূচি।

যেখানে দেশের অধিকাংশ মানুষেরই করোনা টিকা নিয়ে স্বচ্ছ ধারণার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে সামান্যতম স্বচ্ছ ধারণা নেই বললেই চলে অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর গ্রামীণ মানুষগুলোর। কানকথা, মনগড়া বিভিন্ন আলাপচারিতায় ভ্যাকসিন মানুষের কাছে এখন এক ভীতিকর নাম বললেই চলে। বিশেষ করে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে মানুষের কাছে রয়েছে মনগড়া ধারণা। এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।

মনে রাখতে হবে করোনা কারো বয়স বিবেচনা করে না। যেকোনো বয়সে এর আক্রমণ করতে পারে। সেদিন ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় একটি লেখা পড়ে চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ল। সুদর্শন ২৭ বছরের শেখ নিয়ামুল কবীর নামের এক যুবক করোনাতে মারা গেল, উচ্চ চাকরিজীবী, পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। কয়েকমাস আগে বিয়ে করেছে, তবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এখনো বাকি।

সেই সুদর্শন , চাকরিজীবী, পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান হারানো ব্যথা যে কতটা হতে পারে তার পরিবারেই ভালো জানে। সেই ব্যথা যেন আর কারো জীবনে না ঘটে। তাই সরকার কর্তৃক প্রণীত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। লকডাউন মেনে চলতে হবে। সেইসাথে প্রয়োজন সরকার ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা ও কার্যকরী পদক্ষেপ।

স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে গ্রামাঞ্চল মানুষের মাঝে স্বচ্ছ ধারণা সৃষ্টি করতে হবে। করোনা কিভাবে ছড়ায়, কিভাবে সংক্রমিত হয় এবং এর প্রভাব কেমন। এসব বিষয়ের স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। মূলত ব্যক্তিগত সচেতনতাই করোনার প্রধান প্রতিকার ও প্রতিরোধ। সরকার কর্তৃক প্রণীত সকল বিধিনিষেধ মেনে চললেই ,একদিন করোনা এই দেশ তথা বিশ্ব থেকে নির্মূল করা সম্ভব হবে।

আর এটাই প্রত্যাশা। সবকিছু সমাধান হোক, ফিরে আসুক সেই সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। যেখানে থাকবে না করোনায় মৃত পিতার কাছে সন্তানের না যাওয়ার ঘটনা। থাকবে না কোনো আতঙ্ক। প্রত্যাশা করি সেই আগামী শুভদিনের।

লেখক: শিক্ষার্থী, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই সম্পর্কিত আরও খবর...