ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের সাক্ষাৎকার

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২:২৪ অপরাহ্ণ

আহমদ রফিক ব্যক্তিজীবনে চিকিৎসক হলেও একই সঙ্গে তিনি কবি-প্রাবন্ধিক ও গবেষক। একজন ভাষাসংগ্রামী হিসেবে সুপরিচিত। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ১৯৫২ সালে মেডিকেল কলেজের ছাত্র থাকাকালীন ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে ঐতিহাসিক আমতলার জনসভায় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে অনেকে আহত ও শহীদ হন। তখনো তিনি সমাবেশের সম্মুখসারিতে থেকে প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন। এই ভাষাসংগ্রামী মানুষটি তিলে তিলে সংরক্ষণ করেছেন ভাষার ইতিহাস। লিখেছেন একুশের উপাখ্যান। এই কর্মচঞ্চল মানুষটি জীবনের নব্বইয়ের কোটার দ্বারপ্রান্তে এসেও লিখে চলেছেন ভাষা আন্দোলনের নানা দিক নিয়ে। লাভ করেছেন একুশের পদকসহ অনেক স্বীকৃতি ও পুরস্কার। ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জিনাত জান কবীর

আপনি কখন কীভাবে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন?

আমি স্কুলজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতি করা ছেলে, সেটা অবিভক্ত বঙ্গে। সে সময় ছাত্রজীবনে পাকিস্তানপন্থি রাজনীতি করিনি, বাম রাজনীতি করেছি। ৪৭ সালে কলেজ জীবনেও তাই। এরপর ৪৯ সালে ঢাকায় এসে স্বভাবতই সব গণ-আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি এবং সেই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলনে যোগদান।

পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছিল, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আপনারা ভাষার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন এ সম্পর্কে কিছু বলুন?

ভাষা আন্দোলনের দুটো মাইলফলক। প্রথমটি ১৪৪ ধারা ভাঙা। ১৪৪ ধারা না ভাঙলে একুশে একুশ হতো না। দ্বিতীয়টা হলো, যদিও এটা অপ্রিয় কথা, ২১ তারিখ দুপুরে পুলিশ গুলিবর্ষণ না করলে আন্দোলন এতটা তীব্রতাণ্ডএতটা ব্যাপকতা এবং প্রদেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ত না। আমি ইতিহাস লিখতে গিয়ে ঢাকার বাইরে দেখেছি, সুদূর চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেখানে কলেজ ছিল না, স্কুলের ছাত্ররা আন্দোলন করেছে। সেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কক্সবাজার যেখানে কলেজ ছিল না এবং পূর্বদিকে গারো এলাকায়-হাজং এলাকায় সেখানেও ব্যাপক আন্দোলন বিস্তৃতি পেয়েছিল। শুধু এ খবর তারা শুনেছিল যে, পুলিশের গুলিতে ঢাকায় ছাত্র মারা গেছে। এই সংবাদ শুনে সাধারণ মানুষও আবেগণ্ডআপ্লুত হয়ে পড়ে। আবেগের আরেকটা উদাহরণ হলো, পুরান ঢাকার বাসিন্দারা যাদের আমরা ঢাকাইয়া বলি, তারা ৪৮ সালের আন্দোলনে প্রচণ্ড রকম বিরোধিতা করেছিল। কারণ তারা তো দোআশলা উর্দু ভাষায় কথা বলে অর্থাৎ উর্দু বাংলার মিশ্রণ ছিল তাদের ভাষা। তাদের কথাবার্তায় বেশির ভাগ শব্দ ছিল বাংলা কিন্তু উর্দু মিশেল ছিল। তাদের বোঝানো হয়েছিল নবাববাড়ি থেকে বিশেষ করে ঢাকার পঞ্চায়েতের সরদাররা প্রচার করছিলেন, এই আন্দোলনের সঙ্গে হিন্দু আর ভারতের লোকরা জড়িত। কিন্তু যখন পুলিশের গুলিতে ছাত্ররা মারা যায় তখন ঢাকাবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয় এবং তারা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। আমার অনেক বন্ধু, পুরান ঢাকা থেকে যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, তারাও বলেছে আমাদের মুরব্বিরা বলেছে, আরে ‘ছাত্র মাইরা হালাইছে’ (ওদের ভাষায় বলেছে)। ছাত্র মেরে ফেলেছে এটা একটা প্রবল আবেগ সৃষ্টি করেছিল। সেজন্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এক দিনের মধ্যে ঢাকায় গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়।

যারা উর্দু ভাষায় কথা বলত তারাও কি তাহলে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল?

সবাই না। আলিয়া মাদ্রাসার বেশ কিছু ছাত্র অংশ নিয়েছিল। অবশ্য এর একটি বড় কারণ রয়েছে, আলিয়া মাদ্রাসার তখনকার প্রিন্সিপাল ছিলেন বেশ উদারপন্থি। আলিয়া মাদ্রাসার বেশ কিছু ছাত্র বায়ান্নর আন্দোলনে একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে ঐতিহাসিক আমতলায় মিটিংয়ে এবং দুপুরে আমাদের হোস্টেলের ভেতরে-বাইরে জমায়েত হয়েছিল। পরে আলিয়া মাদ্রাসার উদারচেতা ছাত্র লোকমান আহমেদ আমিনী আমাকে বলেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের পশ্চিম-দক্ষিণ কোনায় সেখানে বেশ কিছু মানুষ জমায়েত ছিল, তার পাশেই দাঁড়ানো এক যুবক শার্ট-প্যান্ট পরা গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। আমরা বহু চেষ্টা করেছি, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ ধরনের কেউ ভর্তি হয়েছে কি না, তার পরিচয় বের করার জন্য। কেন জানি না, তার কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। অনেকে ধরাধরি করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। তার ভর্তির কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলেছে কি না—সেটাও একটা ব্যাপার। কারণ আমরা তো খোঁজ করেছি অনেক পরে। বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন মতাদর্শী মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, কারণ ভাষা যেহেতু একটা সাধারণ বিষয়, এটা অন্য দাবি-দাওয়ার মতো না। প্রত্যেকের মুখের ভাষা, সাহিত্যের ভাষা তাই বিভিন্ন স্তরের মানুষ ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল।

মূলত ভাষা আন্দোলনের মূল ঘটনা ঘটেছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজে। পুলিশ যখন লাঠিপেটা করে, তখন ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজে আশ্রয় নিয়েছিল। পুলিশের গুলিতে রফিক-বরকত-সালামণ্ডজব্বার শহীদ হন, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আপনার কাছ থেকে জানতে চাই?

একুশে ফেব্রুয়ারি সকালবেলা যেহেতু রাজনীতিবিদরা এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বললেন, ১৪৪ ধারা ভাঙা যাবে না। সে কারণে ছাত্ররা একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিল্ডিং প্রাঙ্গণে ঐতিহাসিক আমতলায় জমায়েত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, যেকোনো মূল্যে ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। সে হিসেবে ১০ জন ১০ জন গ্রুপ হয়ে মিছিল করে ছাত্রছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভাঙার পরিকল্পনা করে। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে দুপুর ১২টা নাগাদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে জমায়েত হয় (যেহেতু এটা পরিষদ ভবনের, বর্তমান জগন্নাথ হলের কাছাকাছি ছিল)। ছাত্ররাই ছিল বেশি সেখানে। ছাত্রদের চেষ্টা ছিল পরিষদ ভবনের সামনে যাওয়া এবং ঘেরাও করা। এখনকার ঘেরাও না, তখনকার ঘেরাও। অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ ঘেরাও। প্রস্তাব নেবেন বাংলা ভাষার পক্ষে এবং সেটা গণপরিষদে পাস করাবেন। কিন্তু সে পর্যন্ত যাওয়া গেল না, পুলিশের শক্ত ব্যারিকেড, প্রবল লাঠিচার্জ এবং টিয়ার গ্যাসের কারণে। বিকাল ৩.২০ মিনিটে সরকারি হিসাবে, পুলিশ ২৬ রাউন্ড গুলি, মূলত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে জমায়েতের দিকে লক্ষ্য করে ছোড়ে। হোস্টেলের উল্টোদিকে রাস্তার ওপর পুলিশ গুলি ছোড়ে। সেখানে একজন যুবকের গায়ে গুলি লাগে। এলিস কমিশনের রিপোর্টে একজন যুবকের গুলিবিদ্ধ ঘটনার কথা আছে। কাজেই আমরা চোখ বন্ধ করে বলি রফিক, বরকত, সালাম, জব্বারসহ অন্তত পক্ষে ৬ জন কিংবা এর বেশিও হতে পারে যারা একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। ৩.২০ মিনিটে যখন গুলি ছোড়ে তখন আমরা সবাই ছড়ানো-ছিটানো ছিলাম। কেউ কেউ মেডিকেল হোস্টেলের ব্যারাকের আড়ালে, বাঁশের ছাউনির আড়ালে থেকে আবার স্লোগান দিচ্ছিল। গুলি চলার পর অনেকেই চিৎকার করে বলেছিল ফাঁকা আওয়াজ। পুলিশ যে গুলি ছুড়েছিল তা কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি। ১৪ নম্বর ব্যারাকের সামনে রাস্তার ওপরে রফিক উদ্দীনের মাথায় গুলি লাগে। তার মানে সে প্রথম শহীদ। দ্বিতীয় শহীদ হলো জব্বার। ২০ নম্বর ব্যারাকের সামনের রাস্তায় দাঁড়ানো ছিল। ২০ নম্বর ব্যারাকে ৬ নম্বর রুমে আমি থাকতাম। জব্বার এসেছিল সেখানে অন্য কারণে। তার শাশুড়ি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। উনি এসেছিলেন গফুরগাঁও পাচুয়া গ্রামের এক ছাত্রের কাছে। সেই সহপাঠী আবার আমার পাশের রুমেই থাকত। তখনকার দিনে আমরা নাগরিক সুসভ্য হয়ে উঠিনি। কাজেই দেশীয় ভাই ব্যাপারটি ছিল। একজন শহরে এলে দেশি ভাই পরিচয়ে অনেকে ফ্লোর সিট করে থাকত। তেমনি আমার বন্ধু হুলমত আলীর সঙ্গে সেদিন দেখা করতে এসেছিল জব্বার। বারান্দার একটু ওপরে দাঁড়ানো ছিল সেই অবস্থায় তার তলপেটে গুলি লাগে। আমাদের ব্যারাকের এক বন্ধু সিরাজুল হক, আরেক সহপাঠী ১৮ নম্বর ব্যারাকের ফজলে রাব্বী ওরা দুজন তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। রক্তে পুরো লুঙ্গি ভিজে গিয়েছিল। আমি হাত লাগিয়ে ওপরে তুলে দিয়েছিলাম। আমি যাইনি, ওরা ইমারজেন্সিতে নিয়ে গেল। সেখান থেকে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করলেন। তৃতীয় শহীদ হলেন আবুল বরকত। ১২ নম্বর ব্যারাকে দাঁড়ানো অবস্থায় তার ঊরুতে (ফিমোরাল আর্টারিতে) গুলি লাগে। তখনকার চিকিৎসাব্যবস্থা এতটা উন্নত ছিল না। ডাক্তার হিসেবে আমার বিশ্বাস অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে সে। তখন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুসংগঠিত ব্লাডব্যাংক ছিল না। আমার কাছে এখনো অবিশ্বাস্য লাগে, মাঝে মাঝে যখন চিন্তা করি অন্তত আবুল বরকতকে ব্লাড দিয়ে বাঁচানো যেত। কিন্তু কেন বাঁচানো গেল না? এ প্রশ্নটা এখনো আমাকে তাড়া করে। ঠিক সাড়ে তিনটার সময় তাকে ইমারজেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু সাড়ে চারটার পরে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হলো। এত পরে কেন? আর তার পরে রক্ত দেওয়ারই বা কি ব্যবস্থা হয়েছিল সেটাও আমার জানা নেই। কারণ তখন তো আমরা হোস্টেল প্রাঙ্গণে আন্দোলনে ব্যস্ত। আমার ধারণা যথাযোগ্য চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে তারা মারা গেছে। অন্তত ভালো চিকিৎসা দেওয়া গেলে বরকতকে বাঁচানো যেত। বরকতকে বাঁচাতে না পারলেও জব্বারকে বাঁচানোর সম্ভাবনা ছিল। সালামের গুলি লেগেছিল পায়ের গোড়ালিতে, হাসপাতালে ভর্তি ছিল, মারা গেলেন এপ্রিল মাসের ৭ তারিখে। হাসপাতালের চিকিৎসা তখন নিম্নমানের ছিল। দেড় মাস পরে মারা যাওয়ার কোনো কারণ নেই। এই হলো ৪ জন আর একজন কিশোর আর আলিয়া মাদরাসার ছাত্রের সাক্ষ্য অনুযায়ী আরো একজন যুবক- এভাবে ৬ জন শহীদ হন। এরপরের দিনও একইভাবে ছাত্র আন্দোলন হলো সেদিন পুরান ঢাকার লোকজন আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। সেদিন শফিউর, অহিউল্লাহ, তাঁতীবাজারের সিরাজউদ্দীন শহীদ হন। আরো অনেককে পুলিশ ধরে নিয়ে ট্রাকে করে চলে গেছে। এসব হিসাব করে সিদ্ধান্তে এসেছি, একুশে ফেব্রুয়ারি ৬ জন এবং বাইশে ফেব্রুয়ারি কমপক্ষে ৬ জন, এর চেয়ে বেশিও হতে পারে, যাদের আমরা হদিস পাইনি, পুলিশ লাশ গুম করে ফেলেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘শহীদ দিবস অমর হোক’ স্লোগান ২২ তারিখ থেকে দেওয়া শুরু করি। তার আগে ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, চলো চলো অ্যাসেম্বলিতে চলো’- স্লোগান। এই দিন যুক্ত হলো, নতুন স্লোগান- ‘শহীদ দিবস অমর হোক’। শহীদ দিবস সফল করার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ২৩ তারিখ সকালবেলা চিন্তা-ভাবনা করে শহীদ মিনার নির্মাণের। সেদিনই রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ২ জন রাজমিস্ত্রি নিয়ে কাজ করে সাড়ে ১০ ফুট লম্বা ৬ ফুট চওড়া শহীদ মিনার তৈরি করেছিলাম। এর নাম ছিল ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। আমরা জোগালির কাজ করেছি অর্থাৎ মাটি কাটা, ইট বহন করা। রোগীকে বহন করা স্টেচার দিয়ে বালি বহন করেছি, সিমেন্ট বহন করেছি। হোসেনী দালানের পিয়ারু সরদার আমাদের কলেজের সম্প্রসারণ কাজের ঠিকাদার ছিলেন। তার উদার মন ছিল। তার কাছ থেকেই চাবি নিয়ে এসে সিমেন্টের গুদামের তালা খুলেছিলাম। আমি প্রায়ই রসিকতা করে বলি, আজকের মতো দিন হলে সিমেন্ট গুদামের তালা মোচড় দিয়ে ভেঙে ফেলত কিংবা দরজা ভেঙে সিমেন্ট বের করত। তখন আমরা সবকিছু করেছি শান্তিপূর্ণভাবে। চাবি এনে সিমেন্ট বের করে দুদিন পর আবার চাবি ফেরত দিয়ে এসেছিলাম। এখন হলে চাবি তো ফেরতই দিত না। ভাবত আবার কষ্ট করে যাব, কী দরকার? এটা মূল্যবোধের ব্যাপার। এভাবে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি হলো। অর্থাৎ সবাই সহযোগিতা করেছিল স্মৃতিস্তম্ভটি করতে। ২৪ ফেব্রুয়ারি সেদিন ছিল রবিবার সরকারি ছুটির দিন। ২৪ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বস্তরের মানুষ বিশেষ করে পুরান ঢাকার লোকজন শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে ভেঙে পড়ল ফুল, টাকাপয়সা দেওয়ার জন্য। সেদিন এতটা আবেগ সৃষ্টি হয়েছিল যে, এক ভদ্রমহিলা গলার হার খুলে দিয়েছিলেন শহীদ মিনারের পাদদেশে।

ভাষা শহীদ রফিক ও জব্বারের লাশ অনেকের মধ্যে আপনিও বহন করেছিলেন সেই দিনের রক্তমাখা স্মৃতি আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।

রফিকের লাশ হুমায়ুন কবীর, মোশারফ হোসেন, মোরশেদুল হক আরো অনেকে নিয়েছিলেন। যারা রফিকের লাশ বহন করেছিলেন তাদের কেউ বেঁচে নেই। আমি জব্বারের লাশে সামান্য হাত লাগিয়ে তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু বহন করিনি।

আবদুল গাফফার চৌধুরী ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ এই বিখ্যাত গানটি ভাষাশহীদ রফিকের রক্তাক্ত লাশ দেখে লিখেছিলেন এ ব্যাপারে আপনি কী জানেন?

এ ব্যাপারে আমি পরে শুনেছি। কারণ প্রভাতফেরি শুরু হয় ১৯৫৩ সালের শহীদ দিবসে। এ আন্দোলনের দুটো অর্জন। একটি হলো শহীদ দিবস আরেকটি হলো শহীদ মিনার। শহীদ দিবস পালনের সময় আমরা প্রভাতফেরি করি খুব ভোরে। রোদ ওঠার অনেক আগে। খালি পায়ে স্লোগান এবং গান এসবের মধ্য দিয়ে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করি। ৫৩ সালে আবদুল গাফফার চৌধুরীর এই গানটি গাওয়া হয়নি। আবদুল গাফফারের ওটা তখন কবিতা হিসেবে লেখা হয়েছিল। পরে সুর ?দিয়েছে। ৫৩ সালে আমরা দুটো গান গেয়েছি, মোশারেফ হোসেনের লেখা ‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে, আজিকে স্মরিয় তারে…’ আর আমার বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গাজিউল হকের ‘লেখা ভুলবো না ভুলবো না একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলবো না…’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা গাজিউল হকের গানটি বেশি গেয়েছিল। আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ, জগন্নাথ কলেজসহ অন্য কলেজের ছাত্রছাত্রীরা মোশারেফ হোসেনের গানটি গেয়েছিল বেশি। ৫৪ সালে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গানটি প্রাধান্য পেয়েছে। অসাধারণ করুণ-হৃদয় স্পর্শ করা সুরের কারণে এই গানটি এত জনপ্রিয় হয়েছে। কৃতিত্ব অনেকটা আলতাফ মাহমুদের। পরবর্তী সময়ে সিকান্দার আবু জাফর, সরদার জয়েন উদ্দিন, সম্ভবত ফজলে লোহানীও একটি একুশের কবিতা লিখেছিলেন।

আপনি শুধু একজন ডাক্তারই নন, একজন সুসাহিত্যিক ও কবি। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আপনার অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখার আপনার কি কোনো পরিকল্পনা আছে?

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লিখেছি আমি। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আমার পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। এটা কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এটার জন্য যে পরিমাণ অর্থ শক্তি-জনশক্তি প্রয়োজন সেটা কোনো একজন ব্যক্তির পক্ষে সহজ নয়। হয়তো কোনো গ্রামের স্কুলে ভাষা আন্দোলনের কিছু জিনিসপত্র রয়েছে সেটা কাউকে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। আমি তো আর এই বয়সে যেতে পারব না। আমার সঙ্গে আরো দু-চারজন আছে তাদের পক্ষেও যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের এমন কোনো অর্থ-কড়ির উৎসও নেই যে করব।

কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকার যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে কি আপনি বর্তমান প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস দিয়ে যেতে পারবেন?

আমি সক্রিয়ভাবে করতে পারব না। তবে সম্পাদনা করে দিতে পারব। ইতিহাসের চেয়ে দলিলপত্রের গুরুত্ব অনেক বেশি। পরবর্তীকালে দলিলপত্রের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষকরা গবেষণা করতে পারবে।

আপনি ভাষাসংগ্রামী হিসেবে অনেক সম্মাননা ও পদক পুরস্কার লাভ করেছেন। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদকও আপনি পেয়েছেন, এসব সম্মাননা ও পদকপ্রাপ্তির জন্য কতটুকু গর্ববোধ করেন।

সম্মান ও পদকের জন্য গর্ববোধ করি না, কিন্তু ভালো লাগে, আনন্দ লাগে বলব। কারণ যেকোনো কাজের স্বীকৃতি হলে ভালো লাগে। সে ক্ষেত্রে গর্বের জায়গাটা আমার দিক থেকে আমি মনে করি না। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সংগঠন বিভিন্ন সময় পুরস্কার পদক দেয় তা আমাকে নতুন কাজের অনুপ্রেরণা জোগায়, দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। লেখক-কবি-শিল্পীদের পাশাপাশি তরুণদের উদ্দেশে আমি বলি, যে দেশ তোমাকে লালন-পালন করছে, তোমাদের ক্যারিয়ারের পাশাপাশি দেশের দায়িত্ব পালন কর। আমি আমার সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে দেশের জন্য কাজ করেছি। সেই কাজের জন্য যদি সম্মাননা পাই সেটা বাড়তি পাওনা।

আপনাকে ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

আপনাকেও ধন্যবাদ।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...