পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে ধানের গোলা, চাহিদা সারাদেশেই

আব্দুর রউফ, ধামরাই (ঢাকা)

  • প্রকাশিত: ৩১ মার্চ ২০২২, ২:৪৬ অপরাহ্ণ

ঢাকার ধামরাইয়ে টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলের পরিত্যক্ত প্লাস্টিকজাতীয় ওয়ান টাইম বেল্ট দিয়ে হস্তশিল্পের মাধ্যমে ধানসহ বিভিন্ন ফসল সংরক্ষণের গোলা ও বেড়ী তৈরি হচ্ছে। এটি প্লাস্টিকের তৈরি হলেও দেখতে বাঁশ ও বেতের তৈরি মনে হয়। গ্রামীণ জনপদের নারী-পুরুষ সামান্য প্রশিক্ষণের মাধম্যে তৈরী করছেন এমন পণ্য। তাদের তৈরি এ পণ্য স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। এতে করে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থানের।

উপজেলার প্রতিটি ইইউনিয়নে ধান কাটার মহোৎসব শেষে কষ্টার্জিত এ ফসল ভালোভাবে সংরক্ষণে কৃষকের চিন্তার শেষ নেই। তাই এ ধান সংরক্ষণ করার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরণের গোলা কিংবা বেড়ী তৈরি করে থাকেন। বিভিন্ন অঞ্চলে শুধু বাঁশ-বেত দিয়ে গোলা কিংবা বেড়ী তৈরি হলেও কালের বিবর্তনে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার সূয়াপুর, কুশুরা, সুতিপাড়া, সানোড়া, গাংগুটিয়া, বালিয়া, বাইশাকান্দা, কুল্লা, নান্নার ওরোয়াইল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন গ্রামে তৈরি হচ্ছে টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলের পরিত্যক্ত প্লাস্টিকজাতীয় ওয়ান টাইম বেল্ট থেকে।

ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক শিল্প কারখানা। কারখানার মালিকের কাছ থেকে কিনে নিয়ে আসেন পরিত্যক্ত প্লাস্টিকজাতীয় ওয়ান টাইম বেল্ট। এই প্লাস্টিক দিয়ে গ্রামীণ নারী-পুরুষরা মিলে তৈরি করেন গোলা কিংবা বেড়ী। সারাদেশেই চাহিদা রয়েছে এ পণ্যের। স্থানীয় হাট-বাজার ছাড়াও কারখানা থেকে খুচরা ও পাইকারি বিক্রি হয়। আর কয়েক দিন পর শুরু হবে ধান কাটার মৌসুম। এর আগে গোলা কিংবা বেড়ী তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। এছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে কারখানার পরিত্যক্ত প্লাস্টিকজাতীয় ওয়ান টাইম বেল্ট দিয়ে কারিগররা তৈরি করেন ঘরের সিলিং, বেড়াসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র, যা দেখতে মনোমুগ্ধকর।

এ শিল্পকে ঘিরে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। এ গোলা কিংবা বেড়ীতেই জীবিকা নির্বাহ করছে স্থানীয় বহু পরিবার। মাত্র কয়েক বছর আগেও এলাকার পুরুষরা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকলেও নারীরা ছিলেন বেকার। নিজ বাড়ির গৃহস্থালী কাজ করেই তাদের সময় কাটতো। এর ফলে সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। তবে বর্তমানে এ চিত্র পাল্টেছে। নারী-পুরুষ উভয়েই প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করছেন ধানের গোলা কিংবা বেড়ী। এখন সচ্ছলতা এসেছে তাদের সংসারে। তবে চাহিদা বেশি থাকলেও অর্থের অভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণ গোলা/বেড়ী সরবরাহ করতে পারছেন না এখানকার কারিগররা। তারা বলছেন, সরকার রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংক কিংবা কোনো বেসরকারি ব্যাংক বা এনজিও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করলে হয়তো এ হস্তশিল্প আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব হতো বলে দাবি এখানকার প্লাস্টিক কারিগরদের।

কথা হয় এখানে গোলা কিংবা বেড়ী বানানোর কারিগর সুবল দাসের সাথে। তিনি জানান, বর্তমানে প্লাস্টিকের তৈরি গোলা কিংবা বেড়ী চাহিদা ব্যাপক, যার কারণে রাত-দিন কাজ করেও শেষ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে সামনে ধান কাটা লাগবে, সেই জন্য প্লাস্টিকের এই গোলার চাহিদা বেড়ে গেছে। তবে আগের চেয়ে এখন ভালো আছি।

অমরপুর থেকে ধান রাখার বেড়ী কিনতে আসা নুর হোসেন জানান, আমি একটি বেড়ী কিনেছি। যার ওজন হয়েছে ৩৮ কেজি, দাম ৩ হাজার ৮শ টাকা। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। কারণ আমরা সব সময় বাঁশের তৈরি বেড়ী ও গোলার মধ্যে ধান সংরক্ষণ করে থাকি। তবে এগুলো বেশিদিন ব্যবহার করা যায় না, ইঁদুরে কেটে ফেলে। ফলে ধান নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এখানকার প্লাস্টিকের তৈরি গোলা কিংবা বেড়ীতে ধান রাখলে কোনো নষ্ট হয় না। ইঁদুরেও কাটে না। ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।

আর্থিক অসচ্ছলতার অভাবে এ ব্যবসা দীর্ঘদিন হয়তো করা সম্ভবপর হবে না মহাজন ও কারিগরদের দাবি, কারণ এই অঞ্চলে প্লাস্টিকের বেল্টের তৈরি গোলা/বেড়ী, বেড়া ও ঘরের সিলিং-এর ব্যাপক চাহিদা সত্ত্বেও তৈরি করা যাচ্ছে না আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে। তাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও এনজিওগুলো যদি সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে, তাহলে তাহলে এটি আরও এগিয়ে যাবে। এতে করে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে বলে জানান তারা।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...