আবাহনী-মোহামেডান: ধুলো জমা রূপকথার ছাইচাপা আগুন

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২২, ২:৫৪ অপরাহ্ণ


বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা কোনটি? সন্দেহাতীতভাবেই এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায় ক্রিকেট। তবে ক্রিকেটীয় ভালোবাসা ছাপিয়েও এদেশের আপামর জনতার কাছে বিশাল এক আক্ষেপের নাম হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিনের বাংলার ফুটবল। সেই আক্ষেপটা আরও একটু বাড়িয়ে দেয়া যায় কিভাবে জানেন?

আজ থেকে দুই দশক আগের প্রজন্মের কোনো বাঙালির সামনে গিয়েই আবাহনী আর মোহামেডান এই নাম দুটো শুধু একবার উচ্চারণ করুন। বাংলার ফুটবলের ধ্রুপদী এই লড়াই আজ যেন আক্ষেপের সমার্থক শব্দেই পরিণত হয়েছে।

খেলাধুলার ইতিহাসের সেরা দ্বৈরথ কোনগুলো? বিশেষত যদি বলা হয় ফুটবলের কথা? সবার আগেই হয়তো মাথায় আসবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই বা রিয়াল-বার্সার ধ্রুপদী এল-ক্ল্যাসিকো অথবা এসি মিলান-ইন্টার মিলানের ঐতিহ্যবাহী মিলান ডার্বি। তবে এসব আগুনে লড়াই ছাপিয়েও বাংলার আপামর ফুটবল পাগল জনতার কাছে একসময় ফুটবল মানেই ছিলো ঢাকার মাঠের ঐতিহ্য আর মর্যাদার আবাহনী-মোহামেডানের লড়াই। ফুটবল পাগল বাঙালি ভালোবেসেই যে লড়াইয়ের নাম দিয়েছিলো ‘ঢাকা ডার্বি’।

আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি, বাংলাদেশের ফুটবলে শেষ কবে গ্যালারি ভরা দর্শক দেখেছেন বলতে পারবেন? এক ঝটকাতেই পারবেন না জানি, স্মৃতির পাতা হাতড়ে বেড়াতে হবে যে। তবে এদেশের ফুটবলেও একটা সময় ছিলো। যখন জাতীয় দল নয়, এই আবাহনী-মোহামেডান লড়াইয়েই বিন্দু পরিমাণ জায়গা হতো না বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে।

আবাহনী-মোহামেডান লড়াই মানেই স্থবির হয়ে যেতো পুরো দেশ। গুলিস্তানের স্টেডিয়াম পাড়ায় সেদিন যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। যান্ত্রিকতার ঢাকা শহরের সকল মানুষ যেন সেদিন হামলে পড়েছে এক গুলিস্তানের পথে। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচকে ঘিরে দুই ভাগ হয়ে গেছে গোটা একটা দেশের রাজধানী, গোটা একটা দেশ। আকাশী-নীল আর সাদা-কালো পতাকার ভিড়ে ঢাকা শহরের সোডিয়াম বাতির আলো খুঁজে পাওয়াই তখন দায়। শহরের একদিকে স্লোগান উঠতো সালাউদ্দিন-মুন্না-আসলামদের নামে, তো আরেক প্রান্তে গর্জন তুলতো কায়সার হামিদ-জুয়েল রানা-সাব্বিরদের নাম।

অগ্রজদের নাম ছাপিয়ে ঢাকার মাঠে ধ্রুপদী এই লড়াইয়ে নাম তুলেছেন আমিনুল, কাঞ্চন, রজনীকান্ত, আলফাজ, বিপ্লব, নজরুল বা হাসান আল মামুনরাও। তবে তারপরেই যেন খুঁজে পাওয়া যায়নি আর কাউকে। কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসা এক আক্ষেপের নাম হয়েই রয়ে গেছে ঢাকাই ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার এই যুদ্ধ।

 

ঐতিহ্যের এই লড়াইয়ে মরিচা ধরেছে বহু আগেই। পুরোনো দিনের ধ্রুপদী লড়াইয়ের গল্পে যেখানে প্রবীণদের স্বস্তি, যেখানেই নবীনদের ঝুড়িভরা আফসোস। একময়ের আগুনের উত্তাপে যেন হঠাৎ করেই বরফ শীতল নীরবতা। আফসোসটা যে হারিয়ে ফেলা সোনালি দিনের সেই আগুন ঝরা ফুটবলের।

অনেকেই বলে ইউরোপীয় ফুটবলের ডামাডোলেই নাকি হারিয়ে যেতে বসেছে ঢাকার ফুটবলের সেই পুরোনো উত্তাপ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, কথাটা কতখানি সত্য? পাশের দেশ ভারতেও তো পৌঁছেছে মেসি-রোনালদোদের দ্বৈরথের আবহ। তবুও তাদের ছাপিয়েই কলকাতার যুব ভারতী বা সল্ট লেকে আজও স্ব-মহিমায় গর্জন তোলে ইস্ট বেঙ্গল-মোহনবাগান। কালের বিবর্তনে টাকার খনি আইএসএল আসার পরেও ওপার বাংলায় ফুটবল বলতেই আজও হইহই রইরই কাণ্ড ইস্ট বেঙ্গল বা মোহনবাগানের গ্যালারিতে। শহুরে টিনেজ থেকে ৮০ পেরোনো পাড়ার বৃদ্ধ, এখনও গর্জে উঠে ‘রক্তে মিশে আছে মোহনবাগান’ বলে। কলকাতা ডার্বির খেলা মানেই ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের ঘরে ঘরে পাওয়া যায় সর্ষে ইলিশের ঘ্রাণ।

ওপার বাংলার এই উন্মদনা দেখেও আফসোস হয় শুধু এই বাংলার নস্টালজিয়ার সেই আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথের। আমাদের দাদু-নানুদের বারুদ ঠাসা গল্প যেন রূপকথাই মনে হয় নাতি-নাতনিদের কাছে। তাতে দায়টা কি সেইসব নবীনদের নিজেদেরই নয়?

শুধু নামের ভারেই নয়, একসময় আবাহনী-মোহামেডানের ধ্রুপদী লড়াই দেখা যেতো মাঠের ফুটবলেও। খেলার ধরণ আর ক্লাবের দর্শনে দুই দলকে অনেকেই তুলনা করতো ধ্রুপদী এল-ক্ল্যাসিকোর রিয়াল-বার্সার সাথেই। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের মতো স্বাধীনতা-পূর্ব যুগ থেকেই অভিজাত মতিঝিল অঞ্চলের মোহামেডান ছিল ঢাকার মাঠের ঐতিহ্যবাহী দল। আর স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আবাহনী ছিল গণমানুষের দল। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ ঘিরে যেমন অনাচারে পড়েছিলো বার্সেলোনা, তেমনই ৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশেও অনেক অনাচারের শিকার হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ কামালের হাতে প্রতিষ্ঠিত ধানমন্ডি পাড়ার আবাহনী।

 

পুরোনো ইতিহাস আর ফুটবল পাগল বাঙালির উন্মাদনা, সব মিলিয়েই ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মাথায় ঐতিহ্যবাহী মোহামেডানের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে যায় আবাহনী। ঢাকার ফুটবল পায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীতার ঝাঁজ। সে সময়ে দুই দলের সূচিও ফেলা হতো লিগের একেবারে শেষ দিনে। খেলায় থাকতো অঘোষিত ফাইনালের আগুনে ঝাঁজ। দুই দলের সমর্থকদের চিৎকারে কানের পর্দা ফাটার উপক্রম হতো স্টেডিয়াম পাড়ায়। সেসময় আবাহনী-মোহামেডানের খেলার সংবাদ ছাপা হতো জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতার বড় হেডলাইনেই।

আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ মানেই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মাঠ ছাপিয়ে গ্যালারি হয়ে উঠতো উন্মত্ত এক রণক্ষেত্র। স্টেডিয়াম এলাকায় প্রলয় উঠতো সমর্থকদের উত্তাপে। দুই দলের সমর্থকদের মারামারি থামাতেই স্টেডিয়াম পাড়ায় নিয়োজিত থাকতো পুলিশের সাঁজোয়া যান।

পুরোনো দিনের এই ঐতিহ্যবাহী লড়াই নিয়ে প্রচলিত একটি গল্পই ছিলো, কোন এক নতুন সমর্থক গ্যালারিতে বসে আরামসে নিজ মনে খেলা দেখছেন। হঠাৎ প্রিয় দলের গোলে গলা ছেড়ে ‘গো-ও-ও-ওল’ বলে চিৎকার। আর তাতেই যেন তিনি পড়ে গেছেন অকূল পাথারে। তার জানাই ছিল না যে তিনি বসে আছেন প্রতিপক্ষের গ্যালারিতে।

 

লাল সবুজের ফুটবলের অবনতির ধাপে ধাপে আজ জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এক সময়ের মাঠ কাপানো আকাশী-নীল আর সাদা-কালোর মর্যাদার লড়াই। তবুও আজও যখন দুই দলের লড়াইয়ে মাঠে নামেন ফুটবলাররা, তখন কিছুটা হলেও কি তাদের মনে সেই বারুদের উত্তাপ জেগে ওঠে না? তাদের মনে না উঠলেও ঠিকই সেই বারুদে আগুন লাগা উত্তাপ নিয়েই আজও হয়তো কোন প্রবীন বৃদ্ধ আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ দেখতে বসে নিজ দলের পতাকা হাতে নিয়েই।

প্রশ্ন থেকে যায় একটাই। রূপকথার জগতে হারাতে বসা লাল-সবুজের ফুটবল বা ঢাকা ডার্বির সেই জনপ্রিয়তা কি আবারও ফিরবে এদেশের ফুটবলে? ফেরানো কি সম্ভব আবাহনী-মোহামেডানের সেই বারুদ ঠাসা দ্বৈরথ? উত্তরটা, হয়তো সম্ভব। তার জন্য বাংলার ফুটবলে আবারও কাজ করতে হবে গোড়া থেকে। তুলে আনতে হবে সালাউদ্দিন, মুন্না, আসলাম, সাব্বির, চুন্নু বা জুয়েল রানাদের উত্তরসূরিদের। সমর্থকদেরও ফিরতে হবে মাঠে। সোনালি দিনের বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সেই উপচে পড়া গ্যালারি ফিরিয়ে আনতে হবে আরো একবার।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...