স্মার্টফোন আসক্তিতে লেখার অভ্যাস কমেছে শিক্ষার্থীদের

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ৬:৩৩ অপরাহ্ণ

করোনাভাইরাসের ধকল কাটিয়ে সশরীরে ক্লাসে ফিরেছে অনেক আগেই। নিয়মিত ক্লাস করছে, পরীক্ষাও দিচ্ছে। কিন্তু করোনাকালীন ক্লাস-পরীক্ষা চলেছে অনলাইনে। এই সময়ে স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ছিল তাদের সঙ্গী। এখন এই সঙ্গীই সর্বনাশের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। গেল অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় মিলেছে এর প্রমাণ। শিক্ষার্থীরা আশঙ্কাজনক হারে খারাপ করেছে। দ্বিগুণ হয়েছে ফেল করা শিক্ষার্থী। অনেক শিক্ষার্থী খাতায় ঠিকমতো লিখতেই পারেনি বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। এর জন্য না লেখার চর্চা, পর্যাপ্ত মনিটরিং না থাকা ও স্মার্টফোনে আসক্তিকে দায়ী করেছেন শিক্ষাবিদ-অভিভাবকরা।

রাজধানীর প্রথম সারির কয়েকটি স্কুলের অর্ধবার্ষিক বা অর্ধসাময়িক পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশি ফেল করা বিষয়ের তালিকায় গণিত, ইংরেজি, বাংলা, বিজ্ঞান ও ধর্মশিক্ষা। ক্লাস অনুযায়ী ফেলের হার ৭০-৯৫ শতাংশ পর্যন্ত।

ক্লাস শিক্ষকরা বলছেন, করোনায় দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা হাতের লেখায় অনেক পিছিয়ে গেছে। সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারছে না। নবম শ্রেণিতে বিশেষ বিষয়ের ওপর জ্ঞানের মাত্রা অনেক কম। সে কারণে ফেলের হার বেড়ে গেছে।

হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের এক ছাত্রী জানায়, বিজ্ঞান বিভাগে তাদের ৬০ জন ছাত্রী রয়েছে। অর্ধসাময়িক পরীক্ষায় ৪২ জন ফেল করেছে। এক থেকে চার বিষয় পর্যন্ত কেউ কেউ ফেল করেছে। তার মধ্যে উচ্চতর গণিত, বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞানে ফেল বেশি। তবে ফেল করা অনেক মেয়ে ক্লাস শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেটে পড়ে। স্যারদের কোচিংয়ে পড়েও তারা ফেল করেছে। বিজ্ঞানের বিষয়গুলো অনেক কঠিন মনে হচ্ছে। গণিতের অনেক সূত্র ভুলে গেছি। সেগুলো নতুন করে মুখস্ত করতে হচ্ছে। একটি অধ্যায়ে স্যাররা একটি অংক করিয়ে বাকিগুলো আমাদের করতে বলেন। সেগুলো একার পক্ষে সমাধান করতে পারছি না। স্যারকে বললে ভালো করে আর বেঝাতে চান না।

আবার ক্লাস শিক্ষক বলছেন, বাড়িতে কাজ দিলে সেটি ক্লাসে করতে পারছে না। দীর্ঘদিন বাড়িতে বসে থাকায় হাতের লেখায় তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিত বই পড়লেও গত দুই বছর লেখার প্র্যাকটিস কম করেছে বলে পরীক্ষায় তারা খারাপ করছে। এটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের ২০২২ সালের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফলে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২৬৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৭৮ জন পাস করেছে। পাসের হার ২৯ দশমিক ২১ শতাংশ। সপ্তম শ্রেণিতে ৩০৪ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস ১৫০ জন। পাসের হার ৪৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। অষ্টম শ্রেণিতে ২৭৫ জনের মধ্যে ৬৫ জন পাস করেছে। পাসের হার ২৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ২৭৮ জন পরীক্ষা দিয়ে তার মধ্যে ৩৮ জন পাস করেছে। পাসের হার ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ, ব্যবসায় বিভাগে ৩১ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন। দশম শ্রেণিতে টেস্ট পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে ২৮৬ জন পরীক্ষা দিয়ে ২৬ জন পাস করেছে, পাসের হার ৯ শতাংশ। ব্যবসায় বিভাগে ২৬ জন পরীক্ষা দিয়ে কেউ পাস করতে পারেনি। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এ স্কুলে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ফেল করলেও ক্লাসে একজন পাস করতে পারেনি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। সব ক্লাসে আগের তুলনায় ফেলের হার দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আবু সাঈদ ভূইয়া বলেন, করোনার ক্ষতি এখনো আমাদের শিক্ষার্থীরা ধকল কাটিয়ে ওঠেনি। স্কুল বন্ধ থাকায় তাদের অনেক শিখন ঘাটতি হয়েছে। তবে করোনার মধ্যে আমরা প্রথম ও নিয়মিত অনলাইন ক্লাস শুরু করি। সে কারণে অনেকে পড়ালেখায় এগিয়ে থাকলেও হাতের লেখার গতি ও সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখার অভ্যাস ভুলতে বসেছে। অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে সবাই যুক্ত হতে না পারায় খুব বেশি সহায়ক হয়নি।

এই প্রধান শিক্ষক আরো বলেন, ছাত্রদের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হলেও অনেকে তা কপি-পেস্ট করে জামা দিতো। অনেকের ক্ষেত্রে এটি ধরা পড়েছে। তাদের আবারও নতুনভাবে লিখতে দেওয়া হয়েছে। সব শিক্ষকের পক্ষে নকল ধরাও সম্ভব হয়নি। এ পদ্ধতিটিও খুব বেশি কাজে আসেনি বলে শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে গেছে। অটোপাস দেওয়ায় তারা পেছনের অধ্যায় না শিখে ওপরের ক্লাসে উঠে নিজেরাও বুঝতে পারছে না, শিক্ষকদের পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। ওপরের ক্লাসে এ সমস্যা চরমভাবে দেখা দিয়েছে।এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা প্রয়োজন।

মিরপুরে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ে চলতি বছরের অর্ধসাময়িক পরীক্ষার ফলে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৫৩ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৪২ জন পাস করেছে, সপ্তম শ্রেণিতে ৬২ জনের মধ্যে ৪২ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ৫৫ জনের মধ্যে ৩৫ জন, নবম শ্রেণিতে ৫২ জনের মধ্যে ৪০ জন পাস করেছে। তবে ২০১৯ সালের একই পরীক্ষায় পরিসংখ্যানে প্রতিটি ক্লাসে ৫ থেকে ১০ জনের বেশি ফেল করেনি।

ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহমেদ হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীর বাড়িতে নানা ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। তারা অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে পড়ালেখায়। অনেকের বাবা-মা স্কুলে এসে আমাদের কাছে অভিযোগ করছেন। কোনো কোনো অভিভাবক এমন পরিস্থিতি দেখে সন্তানের কাছ থেকে জোর করে ফোন বা ল্যাপটপ নিয়ে ভেঙে পর্যন্ত ফেলছেন।

আহমেদ হোসেন বলেন, করোনার মধ্যে যারা সপ্তম শ্রেণিতে পড়তো তারা পর্যাপ্ত পড়ালেখা ছাড়া নবম শ্রেণিতে উঠেছে। তাদের মধ্যে কেউ বিজ্ঞান, ব্যবসায় ও মানবিক বিভাগে পড়লেও এই স্তরের জ্ঞানার্জন করতে পারেনি। সে কারণে পাঠ্যবইয়ের পড়া বুঝতে পারছে না, ফেলের সংখ্যা বেড়েছে। এ সমস্যা কাটাতে স্কুল-কলেজে লেখাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস বাড়াতে হবে। ক্লাসরুম আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। শিক্ষকদের বাড়তি প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক জোর বাড়াতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিক আহসান বলেন, করোনায় আমাদের শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা পোষাতে চলমান বাড়তি ক্লাস নেওয়া বা বাড়তি মনিটরিং পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষার্থীরা ক্ল্যাসিকাল সাবজেক্টের একটি লেভেল বা লেয়ার অতিক্রম করতে পেছনের জ্ঞানগুলো বুঝতে না পারলে পরের স্তরে সমস্যা হয়। তার মধ্যে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয় রয়েছে। এগুলোর শিখন ঘাটতি কাটাতে আরও বেশ কিছু কার্যকর প্রোগ্রাম দরকার। প্রতিবেশী শিক্ষার্থীর মধ্যে লার্নার গ্রুপ তৈরি করে ক্লাসরুমের বাইরেও কিছু কার্যক্রমে যুক্ত করা যায়। এর মাধ্যমে অন্যদের কাছে শেখার সুযোগ তৈরি হবে। শুধু ক্লাসরুমে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। অ্যাসাইনমেন্টগুলো আরও চিন্তা-ভাবনা করে প্রজেক্টভিত্তিক করে তুলতে হবে। যেন শিক্ষার্থীরা ক্লাসের বাইরে, বাড়িতে ও অবসরে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তার সমস্যার সমাধান করতে পারে। এভাবে তার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। শিক্ষকরা শুধু বিষয় নির্বাচন করে দিলেন আর শিক্ষার্থীরা বাসায় থেকে তা লিখে জমা দিলেই শিখন ঘাটতি পূরণ হবে না। ক্লাসরুমে পড়িয়ে শিখন ঘাটতি পূরণ হবে তাও সঠিক নয়। অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের সংযোগ তৈরি করা হবে। প্রতিদিনের যে কার্যক্রম সেটি শিক্ষার্থীরা কীভাবে করতে পারে বাবা-মাকে বোঝাতে হবে। তারা সেটি জানলে সন্তানকে সহযোগিতা করতে পারবেন।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...