চা উৎপাদনে শীর্ষে মৌলভীবাজার

পুলক পুরকায়স্থ, মৌলভীবাজার,

  • প্রকাশিত: ১ জুন ২০২৩, ৯:২০ পূর্বাহ্ণ

দেশে চা উৎপাদনের শীর্ষে রয়েছে চায়ের রাজ্য মৌলভীবাজার। দেশের চা শিল্প ব্রিটিশ শাসনামল থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ। দীর্ঘ সময়ে এ শিল্পের অগ্রযাত্রা থামেনি। অমিত সম্ভাবনার এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১ কোটি মানুষ।

চা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি উঁচু ভূমি, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল আবহাওয়া ভালো চা উৎপাদনে সহায়ক। মৌলভীবাজার অঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় চায়ের উৎপাদনও বেশি। যার কারণে এখানে চা বাগানের পরিধি বাড়াচ্ছেন উদ্যোক্তারা। অন্যান্য জেলায় চা বাগানগুলোর হার তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন কম হচ্ছে। শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক চা নিলাম কেন্দ্র চালু হওয়ায় এখানকার চা উৎপাদনে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী দেশে সমতল ও পাহাড়ি মিলে চা বাগানের সংখ্যা ১৬৭টি। এর মধ্যে বেশি চা বাগান রয়েছে চায়ের রাজধানীখ্যাত মৌলভীবাজারে। এ জেলায় ৯২টি বাগানের আওতাধীন ১ লাখ ৫৬ হাজার ১৯২ একর জমির মধ্যে চা চাষে ৮৫ হাজার ১৪০ একর জমিতে মোট বার্ষিক উৎপাদনের ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ অবদান রাখছে।

চা বোর্ড সূত্র জানায়, ২০২২ সালে দেশে ৯ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ১৬২ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৪৮ লাখ ১ হাজার ১০৩ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়।

দেশে চা উৎপাদনে ২০২২ সালে ২য় অবস্থানে আছে পঞ্চগড় জেলা। গত বছর সেখানে চা উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৮১ হাজার ৯৩৮ কেজি। এছাড়া ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫৭২ কেজি চা উৎপাদন করে ৩য় অবস্থানে রয়েছে হবিগঞ্জ জেলা। এছাড়াও চট্টগ্রামে ১ কোটি ১০ লাখ ৬৮ হাজার ৪৩৪ কেজি, সিলেটে ৫৪ লাখ ১০ হাজার ৭২৪ কেজি, রাঙামাটি জেলায় ৫৯ হাজার ১০৫ কেজি এবং বান্দরবানে ৭ হাজার ২৮৪ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে।

চা বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২২ সালে দেশে ১০ কোটি কেজি চায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও উৎপাদন হয়েছে ৯ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার কেজি। তবে চলতি বছর চায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কোটি ২০ লাখ কেজি। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রাসহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চা উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে মনে করছে চা বোর্ড ও চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কোম্পানিগুলো সাড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশের বেশি নতুন আবাদ করছেন। চা উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও চা শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত চা শিল্পের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের। তবে বাগান মালিকদের আকাশচুম্বী উন্নতি হলেও ভূমির অধিকার না থাকায় বাগান মালিকদের কাছে এরা যেন আধুনিক ক্রীতদাস।

তিনি বলেন, বেশিরভাগ বাগানে বিদ্যালয় নেই। আবার প্রাথমিকের পর শিক্ষার দায়িত্বও নেয় না বাগান কর্তৃপক্ষ। অধিকাংশ বাগানে নামমাত্র একটি চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও জটিল কোনো রোগ হলে নিজ খরচে বাইরে চিকিৎসা করাতে হয়। এর মধ্যেও চা শ্রমিকরা শ্রম আর ঘামে চা উৎপাদনের চাকা সচল রাখছেন।


এদিকে অনুকূল আবহাওয়া থাকলে চা উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন চা বোর্ড ও বাগান মালিকরা।

এ ব্যাপারে জেরিন চা বাগানের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সেলিম রেজা বলেন, চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজারে বাড়ছে বাগানের আয়তন। চা উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করছে সরকার। এজন্য বাগান মালিকরাও তাদের অনাবাদি জমিতে নতুন চারা রোপণ শুরু করেছেন। বাগানের গাছের পরিচর্যার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি চেষ্টা অব্যহত আছে বলে জানান তিনি।

শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগানের মালিক মহসীন মিয়া বলেন, অমিত সম্ভাবনার অনুপাতে অনেকটা অর্জিত না হলেও এ শিল্পের অর্জনও একেবারে কম নয়। বিটিআরআই উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান চা শিল্পে জেনেটিক মোডিফিকেশন ও মাইক্রোপোপাগেশনের মাধ্যমে চায়ের ক্লোনচারা রোপণে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি সার, কীটনাশকসহ সবকিছুর দাম বাড়লেও চায়ের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এতে চা বাগান পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশন সিলেট ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যানের জি এম শিবলী বলেন, চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মৌলভীবাজার জেলা দেশের চা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। জেলার প্রায় সব উপজেলা ছোট বড় চা বাগান রয়েছে। চা উৎপাদনে পরিবেশগত সুবিধা থাকায় এবং বাগান মালিকদের আন্তরিকতায় প্রতি বছর সর্বোচ্চ পরিমাণ চা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh