পরিবহন মালিকদের চাপ; সরকার ফিটনেসবিহীন গাড়ি সরানোর উদ্যোগ থেকে নতি স্বীকার

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২৫, ৭:০৮ অপরাহ্ণ

দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে দেশে পুরোনো ও অনিরাপদ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে ফেলার সরকারের পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। কারণ হিসেবে মূলত পরিবহন মালিক ও সিন্ডিকেট নেতাদের প্রভাব, চাঁদাবাজি ও ধর্মঘটের হুমকির বিরুদ্ধে সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) ‘ফিটনেসবিহীন’ গাড়ি সড়ক থেকে সরানোর অভিযান শুরু হতেই পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন ধর্মঘটের হুমকি দেয়। সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হলে বাধ্য হয়ে নতি স্বীকার করতে হয়েছে। এতে করে পরিবহন খাতের সংস্কার ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির অগ্রগতি থমকে গেছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

পুরোনো যানবাহন সরানোর অভিযান ও মালিকদের প্রতিক্রিয়া
গত ১ জুলাই থেকে বিআরটিএ ঢাকা শহর ও দেশের মহাসড়ক থেকে ঝক্কড়, রং উঠে যাওয়া, লাইট ভাঙা কিংবা সিট নষ্ট হয়ে যাওয়া বিভিন্ন পুরোনো মোটরযান সরানোর অভিযান শুরু করে। এতে মালিকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা পরিবহন নেতাদের উস্কানিতে ধর্মঘটের ডাক দেয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী ১২ আগস্ট থেকে ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘট শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে ১০ আগস্ট সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিআরটিএ’র তথ্যে বলা হয়, গত মাসে সারা দেশে ৩৬৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়, যেখানে ২৮২৪টি মামলা দায়ের হয়। কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১২ জনকে, ডাম্পিং করা হয়েছে ৮৪টি গাড়ি এবং মোট ৭১ লাখ ২৪ হাজার ৮০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

পরিবহন মালিকদের দাবি ও সরকারের প্রতিক্রিয়া
পরিবহন মালিকরা গত ২৭ জুলাই ৮ দফা দাবি সরকারের কাছে উপস্থাপন করে। প্রধান দাবিগুলো ছিল:

বাণিজ্যিক মোটরযানের ইকোনমিক লাইফ ২০ ও ২৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর বিভিন্ন ধারায় সংশোধনী আনা

এবং অভিযান স্থগিত রাখা

তারা ধর্মঘটের মাধ্যমে দাবিগুলো আদায় করতে চেয়েছিল। একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পরিবহন নেতারা ধর্মঘটের বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে দাবি আদায়ের চেষ্টা করেন। এসব চাপের মুখে সরকার বাধ্য হয় তাদের কথা শোনার।

সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ১০ আগস্ট অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানান, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে অংশগ্রহণকারীদের মতামত নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ সংশোধনের খসড়া প্রস্তুত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, পুরোনো গাড়ি অপসারণের সময় মালিক ও শ্রমিক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন সেজন্য সরকার সচেতন। এছাড়া রিকন্ডিশন্ড বাণিজ্যিক যানবাহনের আমদানি সহজ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাণিজ্য উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা চলছে।

পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার ও মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক
বৈঠকের শেষে শ্রমিক নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “সরকারকে জিম্মি করে দাবি আদায় করাই আমাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং আইনানুগ সিদ্ধান্তে মালিক-শ্রমিকরা সহযোগিতা করবে।” সরকারের উদ্যোগে শ্রমিক-মালিক সমিতি সর্বসম্মত হয় ধর্মঘট প্রত্যাহারের জন্য।

বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “সরকার নাগরিক সমাজের মতামত গুরুত্ব দিচ্ছে না, মালিকরা একচেটিয়া সুযোগ নিচ্ছে এবং সরকার সেই ফাঁদে পা ফেলেছে।” তিনি বলেন, পরিবহন সেক্টরের কৌশলগত নেতৃত্বের অভাব আছে। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান দক্ষ জনবল নিয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা করার।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, “আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা পরিবহন নেতাদের জিম্মি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানি ভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়নি।” তিনি বিআরটিএ-এর অপেশাদারিত্বকেও সমস্যার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ফিটনেসের ব্যাপারে তিনি বলেন, “২০ বছর বয়স হলে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে—এমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করলে ৫০ বছরও চলতে পারে।” তবে বাংলাদেশের ফিটনেস পরীক্ষা প্রক্রিয়া যথাযথ নয়, ফলে অনেক অযোগ্য গাড়ি চলাচলে থাকে।

সরকারের সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘‘মালিকদের সময় দেওয়া হয়েছে, তবে নতুন গাড়ি না এলে সংকট দেখা দিতে পারে। গাড়ি ডাম্প করার জায়গার অভাবও সমস্যা। তিনি বলেন, “আমরা অভিযান অব্যাহত রাখব, কিন্তু কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হোক তার ব্যবস্থা নেব।”

সরকার দাবিগুলো মেনে নিচ্ছে কি না বা চাপের কাছে নত হচ্ছে কি না- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা চাপের কাছে নত হচ্ছি না।”

সমালোচনা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিবহন খাতের সংকট দূর করতে হলে পরিবহন মালিকদের দৌরাত্ম্য ভেঙে দিয়ে কার্যকর ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং সরকারের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যথাযথ মনোযোগ দিতে হবে।

সংক্ষেপে: সরকারের পরিবহন খাত সংস্কারের যাত্রা পুনরায় একবার পরিবহন মালিকদের প্রভাব ও ধর্মঘটের হুমকিতে থেমে গেছে। সরকারের নীতিগত উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং সিন্ডিকেটের দাপট সরকারের নীতি পরিবর্তনের আগে বাধ্য হয়েছে নত হওয়ার পথে। এর ফলে দেশের যানজট, দুর্ঘটনা ও পরিবহন ব্যবস্থার অবনতি রোধের লক্ষ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেরি হচ্ছে, যা সাধারণ যাত্রী ও দেশের অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh