সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাজা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত জানার অপেক্ষায় বাংলাদেশ।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সোমবার এ মামলার রায় ঘোষণা করবে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই বিচারক হলেন মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
দেড় দশক দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করা শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ (প্রসিকিউশন)। আদালত তাতে সম্মতি দিলে দেশে প্রথম কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের ওপর ঝুলবে মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া।
ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা আদালতের দৃষ্টিতে পলাতক। সে কারণে এ মামলার শুনানিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তিনি পাননি।
তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জুলাই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে তার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীও তাকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন সরকারের পদত্যাগের এক দফার রূপ নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, শেখ হাসিনা পালিয়ে যান ভারতে।
এরপর তার বিরুদ্ধে কয়েকশ মামলা হয় দেশের বিভিন্ন আদালত ও থানায়। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে সেসব মামলায় আসামি করা হয়। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার বিচারের উদ্যোগ নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, যে আদালত তার সরকার গঠন করেছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য।
ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের আমলে জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ শীর্ষ নেতা এবং বিএনপির একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এবার সেই বিশেষ আদালতেই শেখ হাসিনার রায় হতে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনা ছাড়াও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সেই সময়ের আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এ মামলার আসামি।
জুলাই আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট ৫ অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
তাদের মধ্যে হাসিনা ও কামালকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচার কাজ চলে। তিন আসামির মধ্যে একমাত্র চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনই কারাগারে আটক আছেন। দায় স্বীকার করে তিনি এ মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছেন।
প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন কৌঁসুলি মো. মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, বিএম সুলতান মাহমুদ, ফারুক আহম্মদ, মো. আব্দুস সোবহান তরফদার, মো. সহিদুল ইসলাম সরদার, তানভীর হাসান জোহাসহ প্রসিকিউশন দল।
চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন যায়েদ বিন আমজাদ। আর শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন শুনানি করেন।
ট্রাইব্যুনাল আইনে কীভাবে এ বিচার
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিচারের কথা বলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। গত বছরের ১৪ অগাস্ট সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সামনে তিনি ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতা ও সহযোগীদের এ আদালতে বিচারের আইনি যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
তিনি সেদিন বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা, যারা আদেশ দিয়েছেন, বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সকলকে ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের অধীনে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব।
এ আইনটি করা হয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য। এ ট্রাইব্যুনালে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীকে বিচারের আওতায় আনা এবং স্বাধীনভাবে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ পরিচালনার বিধান যুক্ত করে ২০০৯ সালে আইনে কিছু সংশোধনী আনা হয়। এর মাধ্যমেই ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়।
১৯৭৩ সালে প্রণীত আইনের ৩(১) ধারায় বলা আছে, আইনের দুই নম্বর উপধারায় উল্লিখিত যে-কোনো অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী [বা সংস্থা] বা কোনো সশস্ত্র, প্রতিরক্ষা বা সহায়ক বাহিনীর কোনো সদস্যের জাতীয়তা যাই হোক না কেন, তা যদি এই আইন প্রবর্তনের আগে বা পরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তার বিচারের এবং শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।
অর্থাৎ মানবতাবিরোধী অপরাধ, শান্তিবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনিভা কনভেনশন বিরোধী কাজসহ আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে যে কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা দল, সেনাবাহিনী কিংবা তাদের সহযোগী সশস্ত্র বাহিনীর বিচারের ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়েছে।
কী অভিযোগ
চলতি বছরের ১২ মে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এরপর ১ জুন প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের দপ্তরে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং যাবতীয় দলিল জমা দেয়।
পরে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাড়ে আট হাজার পৃষ্ঠার ওই অভিযোগপত্র বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন। এ তিনজনের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ হয়।
গত ১০ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচ অভিযোগে শেখ হাসিনা, কামাল ও মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। সেই সঙ্গে মামুনের রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
অভিযোগ-১: গণভবনে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য প্রদান এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তৎকালীন সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ‘প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায়’ তাদের অধীনস্ত ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও সশস্ত্র ‘আওয়ামী সন্ত্রাসীদের’ মাধ্যমে ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর আক্রমণের অংশ হিসেবে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ করার অপরাধ সংঘটনের প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতা, অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শান্তি প্রদান না করা এবং ষড়যন্ত্র করার অপরাধ; যা আসামিদের জ্ঞাতসারে সংঘটিত।
অভিযোগ-২: আসামি শেখ হাসিনার ছাত্র-জনতার উপর হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ’ এবং এ নির্দেশ বাস্তবায়নে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ও অধীনস্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ প্রদানের পাশাপাশি সহায়তা, সম্পৃক্ততা ও ষড়যন্ত্র করেন।
অভিযোগ-৩: রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে স্বল্প দূরত্ব থেকে নিরস্ত্র আন্দোলনকারী ছাত্র আবু সাঈদের ‘বুক লক্ষ্য করে বিনা উসকানিতে একাধিক গুলি চালিয়ে’ তাকে নির্মমভাবে হত্যা করার মাধ্যমে উল্লিখিত আসামিদের জ্ঞাতসারে এবং তাদের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচণা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্র করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন।
অভিযোগ-৪: ঢাকা মহানগরীর চাঁনখারপুল এলাকায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে নিরীহ-নিরস্ত্র ৬ জন ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করার মাধ্যমে উল্লিখিত আসামিদের জ্ঞাতসারে এবং তাদের কর্তৃক হত্যার নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্র করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন।
অভিযোগ-৫: ঢাকার আশুলিয়া থানার সামনে এবং আশপাশ এলাকায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরীহ-নিরস্ত্র ৬ ছাত্র-জনতাকে গুলি করে তাদের মধ্যে ৫ জনের মৃতদেহ এবং একজনকে জীবিত ও গুরুতর আহত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অপরাধ, যা আসামিদের জ্ঞাতসারে সংঘটিত হয়েছে। ওই ঘটনায় হত্যা, নির্যাতন, মৃত ও জীবিত অবস্থায় আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে অমানবিক আচরণ করার অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে।
গত ৩ অগাস্ট প্রসিকিউশন প্রারম্ভিক বিবৃতি (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) দেয় এবং ৪ অগাস্ট মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় ট্রাইব্যুনাল থেকে।
সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক শেষে ২৩ অক্টোবর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়। এরপর ১৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল জানায়, এ মামলার রায় হবে ১৭ নভেম্বর।
সাক্ষীরা কে কী বলেছেন
এ মামলায় মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক আবু সাঈদের বাবা, নিহতদের পরিবারের সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম, জুলাই আন্দোলনের আরেক নেতা উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।
বদরুদ্দিন উমরের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয় ট্রাইব্যুনালে, যা তিনি মৃত্যুর আগে লিখে পাঠিয়েছিলেন।
এ ছাড়া রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
তিনি বলেন, “১৮ জুলাই ২০২৪‑এ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে ফোন করে জানায় যে, শেখ হাসিনা আন্দোলন বন্ধ করার জন্য প্রত্যক্ষভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।”
হেলিকপ্টারে করে হামলার বিষয়ে মামুন বলেন, “প্রতিবাদকারীদের এলাকা ভাগ করা হয়েছিল। তারপর হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ছাত্র ও সাধারণ বেসামরিক অনেককে হত্যা ও জখম করা হয়।”
এই মামলার ৪ নম্বর অভিযোগ হল রাজধানীর চানখাঁরপুলে ৬ হত্যা। এ মামলায় ১৬ অক্টোবর সাক্ষ্য দেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যিনি আন্দোলনের সামনের সারির ছাত্রনেতা ছিলেন।
১৪০০ জনকে হত্যার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এখন আমরা বিভিন্নভাবে তালিকা পাচ্ছি। এর আগে আমরা আরও দুটি হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছি, যেটা বিডিআর বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তীতে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড। শত শত মানুষকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে। অনেককে আর ফিরে পাওয়া যায় নাই। আমরা আয়নাঘর প্রত্যক্ষ করেছি।
“সুতরাং প্রত্যেকটা ঘটনায় প্রত্যেকটা ভিক্টিমের জন্য যদি আপনি একবার করে বিচার করতে যান, তাহলে এই বিচার হয়ত কেয়ামত পর্যন্ত শেষ হবে না।
“আমরা এ সকল ভিক্টিমদের পক্ষ থেকে এই ‘মিসডিডগুলো’ যে শেখ হাসিনা এবং এর সাথে আর যারা জড়িত ছিলেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছি এবং আশা করি এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে।”
মাহমুদুর রহমান সাক্ষ্যে বলেন, “বিডিআর হত্যাকাণ্ডে শেখ তাপসের জড়িত থাকার সব রকম প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাকে কখনও বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমিক ৫৭ জন অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
“তাদের পরিবারের উপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তৎকালীন সরকার প্রধান, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, স্বরাষ্টমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ সেনাসদস্য এবং তাদের পরিবারকে রক্ষা করবার কোনো রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, বরং দুই দিন ধরে এই হত্যাযজ্ঞ ঘটতে দিয়েছিল।”
ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন আমাদের দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ফাইল ছবি
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম সাক্ষ্যে বলেন, “ছাত্রদেরকে রাজাকারের বাচ্চা এবং রাজাকারের নাতিপুতি আখ্যায়িত করায় সমগ্র দেশের ছাত্রছাত্রীরা অপমানিত বোধ করে।”
ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, “‘রোম স্ট্যাটিউট অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট’-এর ৭ অনুচ্ছেদে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ‘ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক’ এবং ‘সিস্টেম্যাটিক অ্যাটাকের’ কথা বলা আছে। এ দুই ধরনের অপরাধ শেখ হাসিনা করেছেন।”
অন্যদিকে শেখ হাসিনার আইনজীবী মো. আমির হোসেন যুক্তিতর্ক শুনানিতে বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে মূল এভিডেন্স অ্যাক্ট প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। সিআরপিসিও এ আইনে গ্রহণ করা যায় না। এ আইনে বিচার মানে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিয়ে আসামিকে বলা হবে, ‘এখন সাঁতার কাটো’।”
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র অভিযোগের বিষয়ে আমির হোসেন বলেন, “যদি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে বৈধও ধরে নেওয়া হয়, সেই আন্দোলনকেও নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের রয়েছে।”
প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম
এ আইনজীবীর ভাষ্য, “রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি থাকতে পারে। সেগুলো মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। পৃথিবীর শুরু থেকে এগুলো হয়ে আসছে। ইরানের খোমেনি, মালয়েশিয়ার মাহথির মোহাম্মদ করেছেন। শুধু বেঠিকটাকে প্রাধান্য দেবেন, সঠিকটাকে দেবেন না–তা তো হবে না।”
কী বলেছেন হাসিনা
ভারতের পালিয়ে থাকায় আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পেলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন শেখ হাসিন।
ব্রিটিশ দৈনিক ইনডিপেনডেন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেছেন, ট্রাইব্যুনাল যদি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তাতে তিনি ‘বিস্মিত বা ভীত’ হবেন না। তার ভাষায়, “এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক প্রহসনের বিচার।”
ইনডিপেনডেন্ট লিখেছে, শেখ হাসিনাকে যখন প্রশ্ন করা হল, জুলাই আন্দোলনে নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারের কাছে তিনি ক্ষমা চাইবেন কি না, তখন তিনি বলেন, “আমরা একটি জাতি হিসেবে যে সন্তান, ভাইবোন, আত্মীয় ও বন্ধুকে হারিয়েছি, তাদের প্রত্যেকের জন্য আমি শোক করি। আমার এই শোকপ্রকাশ অব্যাহত থাকবে।”
জুলাই আন্দোলনকে ‘সহিংস বিদ্রোহ’ হিসেবে বর্ণনা করে শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো হত্যার দায় ‘স্বীকার করেন না’। তার দাবি, মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে’ হতাহতের সংখ্যা বেড়েছিল।
“একজন নেতা হিসেবে আমি নেতৃত্বের দায় অবশ্যই স্বীকার করি, কিন্তু আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলাম–এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
শেখ হাসিনা
ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে এই আন্দোলন দমনে নিজের ভূমিকা নিয়ে হাসিনা বলেন, “সহিংসতা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য অবশ্যই ভুল করেছেন।
“কিন্তু, যেটা বলা হচ্ছে যে আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিটি পদক্ষেপের নির্দেশ দিচ্ছিলাম—এটা আসলে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যপ্রণালী সম্পর্কে ভুল ধারণা। আবারও বলছি, কোনো অবস্থাতেই আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালানোর অনুমতি দিইনি।”
আর বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি অস্বীকার করছি না যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, কিংবা অপ্রয়োজনে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালানোর কোনো নির্দেশ আমি কখনও দিইনি।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও তিনটি মামলা করা হয়েছে। টিএফআই সেলে আটক রেখে নির্যাতন, জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে রেখে নির্যাতন এবং শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড বিষয়ে হওয়া মামলা তিনটি তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের পথ তৈরি করা হয়েছে গত মে মাসেই। সেই বিচার শুরুর জন্য তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
বিচার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সব কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে।
ফলে টানা ১৫ বছর দেশ শাসন করা দলটি আগামী ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত হওয়ায় শেখ হাসিনার এখন স্বতন্ত্র হিসেবেও ভোট করার সুযোগ নেই।
আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বড় একটি অংশ শেখ হাসিনার মতই দেশের বাইরে অথবা আত্মগোপনে আছেন। কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে আছেন কারাগারে।
দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা থাকায় দুয়েক জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে ঝটিকা মিছিল ছাড়া আওয়ামী লীগের তেমন কোনো তৎপরতা এতদিন ছিল না। তবে রায় ঘনিয়ে আসায় শেখ হাসিনা একের পর এক বিদেশি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করেন। বিদেশে তার আইনজীবী দলও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত ও জাতিসংঘে আর্জি জানাতে শুরু করেন।
ঢাকাজুড়ে নিরাপত্তা, গুলির নির্দেশ
১৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার মামলার তারিখ ঘোষণা করে। ওই দিনটি ঘিরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত বোমাবাজির পাশাপাশি যানবাহনে আগুন দেওয়া শুরু হয়। তখন থেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
রায় ঘিরে রবি ও সোমবার ফের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। নগরজুড়ে টহল বাড়ানো, তল্লাশি চৌকি স্থাপন, হোটেল-মেসসহ সন্দেহজনক আবাসনে তল্লাশির মত অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি শতাধিক জনকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে পুলিশ। কিন্তু তাতে বন্ধ হয়নি নাশকতা।
রোববারও ইস্কাটন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণে একজন পথচারী আহত হয়েছেন। ঢাকার আরো কয়েকটি এলাকায় হাতবোমা বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে সন্ধ্যার পরও। ভোরে রাজধানীর উপকণ্ঠে দুটি থেমে থাকা বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। একই রকম নাশকতার খবর এসেছে ঢাকার বাইরে থেকেও।
এমন পরিস্থিতিতে রোববার বিকেলে ডিএমপির ওয়্যারলেস চ্যানেলগুলোতে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল নিক্ষেপ করতে এলে গুলির নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
জানতে চাইলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমি ওয়্যারলেসে বলেছি যে কেউ বাসে আগুন দিলে, ককটেল মেরে জীবনহানির চেষ্টা করলে তাকে গুলি করতে। এটা আমাদের আইনেই বলা আছে।”
সহিংসতার আশঙ্কায় ঢাকার পাশপাশি গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও মাদারীপুর জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তাও।
পুলিশ তৎপর থাকার কথা বললেও শঙ্কা কাটছে না মানুষের। ঢাকার অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রোববার থেকেই অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে। সোমবার কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করতে বলেছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আইএনজিও। অনেকগুলো বহুজাতিক কোম্পানিও একই পথ ধরেছে।
সূত্র: বিডিনিউজ