সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম
গত ১৪ই ডিসেম্বর রোববার সন্ধ্যায় পশ্চিম লন্ডনের লন্ডনের নটিংহীল গেইটে অবস্থিত ঐতিহাসিক বাংলাদেশ সেন্টারে বিলেতের সাংস্কৃতিক সংগঠন “গীতবীণা” বাংলাদেশের ৫৫তম বিজয় দিবস পালন উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। উল্লেখ্য বাংলাদেশ সেন্টার ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিলেতে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের পক্ষে বাংলাদেশের দূতাবাস হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বের সমর্থন আদায়ের কাজে ব্যাপৃত ছিল।
গীতবীণার এ আয়োজনে ছিলো শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ, বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা প্রদান এবং দুই পর্বের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গীতবীণার শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা ও অতিথি শিল্পীদের গান। সর্বপ্রথমে অসুস্থতার কারণে সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা বাতিরুল হকের অনুপস্থিতিতে গীতবীণার পক্ষে অভ্যাগতদের স্বাগত জানান রুমি হক।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি এবং স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের স্মৃতি ও বীরাঙ্গনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে সমবেত ও দ্বৈত কন্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান ও বৃন্দ-আবৃত্তিসহ অন্যান্য দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন গীতবীণার শিল্পী রুমী হক, মিতালী বানোয়ারী ও সুনীতা চৌধুরী এবং প্রশিক্ষক ডক্টর শ্যামল চৌধুরী। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন ডক্টর শ্যামল চৌধুরী। এতে সূত্রধরের ভূমিকা পালন করেন বাংলা ও ইংরেজীতে যথাক্রমে মোস্তফা কামাল মিলন ও স্নেহাসন চৌধুরীগীতি আলেখ্যের অংশ হিসেবে গানের ফাঁকে ফাঁকে ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের সময় মাকে লেখা “একজন মুক্তিযোদ্ধার চিঠি” ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠ করেন রুমী হক আর ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ গ্রন্থ থেকে “একজন বীরাঙ্গনার নিজের কথা” পাঠ করেন সুনীতা চৌধুরী। এ দুটি পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকবৃন্দকে ভীষণভাবে আন্দোলিত ও আবেগতাড়িত করে।
এরপর ২য় পর্বে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা হিমাংশু গোস্বামীকে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগীতের মাধ্যমে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁকে পুস্পস্তবক দিয়ে, উত্তরীয় পরিয়ে ও সম্মাননা ক্রেস্ট দিয়ে সংবর্ধনা জানান গীতবীণার প্রতিষ্ঠাতা শিল্পীত্রয় যথাক্রমে রমী হক, মিতালী বানোয়ারী ও সুনীতা চৌধুরী। উল্লেখ্য ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে জাগরণী গান গেয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করার জন্য নিরলস কাজ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার অন্যতম সদস্য মাহমুদুর রহমান বেণুকেও বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা প্রদানের বিষয় ঘোষিত হয়। তবে যুক্তরাজ্যের বাহিরে অবস্থান করায় তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর এ সম্মাননা হস্তান্তর করার কথা জানান গীতবীণার আয়োজকবৃন্দ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা হিমাংশু গোস্বামী তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে সে সময়কার কঠিন পরিস্থিতির স্মৃতিচারণ করেন। বেতারে স্বল্প সময়ের মধ্যে গান সৃষ্টি করে বেতারে পরিবেশন এবং রণাঙ্গন ও শিবিরে শিবিরে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করার স্মৃতিগুলোর বর্ণনা দেন তিনি।
তারপরই মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান গৌস সুলতান। তাঁকে সংগঠনের পক্ষ থেকে পুস্পস্তবক দিয়ে ও উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি এ উপলক্ষে কথা বলতে গিয়ে পাকিস্তানী হানাদার সৈন্য ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার- আলবদরদ- আলশামসের শঠতা, বর্বরতা ও নৃশংসতাকে অগ্রাহ্যকরে ও দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করে মুক্তিযোদ্ধারা সকল প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতাকে ভেদ করে যে বিজয়কে ছিনিয়ে এনেছিলো, তিনি ঐ সব খণ্ড খণ্ড চিত্র তুলে ধরেন।
স্মৃতিচারণ ও সম্মাননা প্রদান পর্বের পর শুরু হয় অতিথি শিল্পীদের পরিবেশনা। অত্যন্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও যত্নের সাথে প্রতিনিয়ত মহড়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের পুরোপুরি প্রস্তুত করার মাধ্যমে অত্যন্ত সাবলীল ও নিখুঁতভাবে গীতবীণার মনমুগ্ধকর ও প্রাণবন্ত এ সাংস্কৃতিক পর্বটি উপহার দেওয়ার জন্য বিশেষ করে প্রশিক্ষক ডক্টর শ্যমল চৌধুরী ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রশংসা করেন উপস্থিত দর্শকবৃন্দ। যাতে ছিলো চমৎকারিত্ব ও পেশাদারিত্বের প্রচ্ছন্ন ছাপ।
গীতবীণার শিল্পীদের পরিবেশনা মহান মুক্তিযুদ্ধের সে সময়কার বিভৎস, আত্মবলিদান ও ত্যাগ -তিতিক্ষার স্মৃতিগুলো উপস্থিত দর্শকদের মানসপটে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠলে অনেকে কপোলে বিষাদের ছাপ পরিলক্ষিত হয়।
ব্যতিক্রমধর্মী এ অনুষ্ঠানে অতিথি শিল্পীদর পরিবেশনা-পর্বে কবি শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতা ” তোমাকে পাবার জন্য হে স্বাধীনতা” থেকে আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পী ডাঃ সুপ্রিম রায়। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন ফাহমিদা শামসুদ্দিন। এছাড়াও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্বাধীনতা কবিতা আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব জনাব আবু হাসান।
অতিথি শিল্পী হিসাবে সংগীত পরিবেশন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সংগীত, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিমাংশু গোস্বামী, রাশিদা খান বানু, মোস্তফা কামাল মিলন ও ডক্টর শ্যামল চৌধুরী।
অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাণবন্তভাবে অনুষ্ঠানটি বাংলা ও ইংরেজিতে সঞ্চালনা করেন যথাক্রমে মোস্তফা কামাল মিলন ও স্নেহাসন চৌধুরী। তবলায় ছিলেন হিরন্ময় গোস্বামী, অক্টোপ্যাড বাজিয়েছেন দীপু ও শব্দ নিয়ন্ত্রণের কাজটি করেছেন হিরণ বেগ।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সেন্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট গুলনাহার খান ও জেনারেল সেক্রেটারি দেলওয়া হোসেন। উভয়েই বাংলাদেশ সেন্টারের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের কথা উল্লেখ করে একে টিকিয়ে রাখা ও এটাকে আরও গতিশীল করার বিষয়ে আলোকপাত করেন এবং এ সেন্টারের সঠিক সুবিধা গ্রহণের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
সবশেষে অনুষ্ঠানে আসার জন্য ও বদান্যতা প্রদশর্নের জন্য যথাক্রমে উপস্থিত সবার প্রতি ও বাংলাদেশ সেন্টারের প্রতি এবং একই সঙ্গে দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়।