সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে গুম সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’। কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের শিকার হয়ে এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
কমিশন মোট ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের অভিযোগ যাচাই করে বলেছে, এসব ঘটনা ছিল সুস্পষ্টভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ। রোববার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয় বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ‘গুম ও আয়নাঘর’ ইস্যুটি নতুন করে সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৭ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের গুম তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।
কমিশন এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়, যার কিছু অংশ পরদিন প্রকাশ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয়। পরে ৪ জুন দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তি ও প্রত্যক্ষদর্শী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বরাতে নির্যাতন ও স্বীকারোক্তি আদায়ের সচিত্র বিবরণ তুলে ধরা হয়।
কমিশনের বিবেচনায় ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে গত ৮ অক্টোবর গুমের দুটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। পাশাপাশি সাবেক কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার বিচার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
কমিশনের তথ্যমতে, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।
কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, “গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে। অনেক ভুক্তভোগী বা তাঁদের পরিবার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে গেছেন, আবার অনেকেই অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।”
কমিশন সদস্যরা জানান, সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে গুমের পেছনে মূল চালিকা শক্তি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুমের শিকার হয়ে যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবির এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, “হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
গুমের শিকার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম; জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, আহমদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।
কমিশনের মতে, অনেক ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজেই গুমের নির্দেশদাতা ছিলেন। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ‘রেন্ডিশন’-এর তথ্য পাওয়া গেছে, যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া সম্ভব নয়।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। আপনারা যে ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন, বাংলায় এক কথায় বললে সেগুলো পৈশাচিক। এই নৃশংসতার ডকুমেন্টেশন জাতির সামনে তুলে ধরেছেন আপনারা।”
তিনি আরও বলেন, “গণতন্ত্রের লেবাস পরে কীভাবে মানুষের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে, এই প্রতিবেদন তার প্রমাণ। এই নৃশংসতা যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সেই পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।”
প্রধান উপদেষ্টা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সহজ ভাষায় জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে করণীয় ও প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা পেশ করতে কমিশনকে নির্দেশ দেন।
এছাড়া আয়নাঘরের পাশাপাশি যেসব স্থানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে, সেসব স্থান ম্যাপিং করার নির্দেশ দেন তিনি। কমিশনের তথ্যমতে, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জ এলাকাতেও লাশ গুমের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থানের জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানান। তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন, তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।