সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম
২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট পরবর্তি বাংলাদেশের চলমান সংকট , ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা লন্ডন ভিত্তিক সংগঠন ‘ হৃদয়ে৭১‘ আয়োজিত দুদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত লন্ডন ঘোষনা আনুষ্টানিক ভাবে প্রকাশ করেছে । ২৬ জানুয়ারী ২০২৬ লন্ডন সময় সন্ধ্যা ছয় ঘটিকায় পূর্বলন্ডনের একটি হলে জনাকীর্ন সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন আয়োজকরা। হৃদয়ে৭১‘ এর আহবায়ক ডাকসুর সাবেক সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান গৌস সুলতানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন হৃদয়ে৭১‘ নেতা অ্যাডভোকেট শাহ ফারুক আহমেদ, আলিমুজ্জামান, সাবেক ছাত্রনেতা মতিউর রহমান মতিন, সাংস্কৃতিকর্মি অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মনি , ছমিরুন চৌধুরী, কিটন শিকদার, ভিপি আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা প্রমুখ । সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আয়োজকরা বলেন ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশটাকে গভীর সংকটটে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন উগ্র্রগোষ্টী এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের দখলে।
প্রতিদিনই দেশে চলছে মব ভায়লেন্স , অরাজকাতা,খুন হত্যা রাহাজানি। এরা ইচ্চেকৃত ভাবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের হয়রানি করছে সেইসাথে এরা দেশের মাইনরিটি সম্প্রদায়কে দেশছাড়া করতে কাজ করছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের উচিত নির্বাচন বয়কট করা। ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচনে দেশের মানুষ ভোট দেবে বিএনপিকে কিন্তু ক্ষমতায় আসবে জামাতের নেতৃত্বাধীন এ্যালায়েন্স তখন বিএনপি বুঝবে। এই সরকার দেশটাকে একটি গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর থেকে পরিত্রান পেতে হলে আমাদের সকলকে লন্ডন ঘোষনার আলোকে এগুতে হবে। নীচে লন্ডন ঘোষনার বিস্তারিত তুলে ধরা হলোঃ–
লন্ডন ঘোষনা
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে (১৯৭০-৭১) গণরায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। এ দেশের জনগণ স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ন্যায়বিচার, সমতা উপভোগ করার ও সমবেত ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের নিঃশর্ত অধিকারের দাবীদার। জবাবদিহীতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা দীর্ঘ মেয়াদী সামাজিক শান্তি, অর্থনৈতিক প্রবৃত্তি ও রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙ্গালীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা তথা জাতীয়তাবাদী চেতনার পাথেয়। ১৯৭২ সালের সংবিধান জাতির রক্তরাঙ্গা মুক্তিযুদ্ধের সফল অর্জন। বঙ্গবন্ধুর দীক্ষা ও সংগ্রামী জীবন আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার এবং ভবিষ্যত পথচলার অনুপ্রেরণা ।
বাংলাদেশের চলমান খুন, অগ্নিসংযোগ, নৈরাজ্য, বিচারহীনতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মত ও সংবাদ প্রকাশে চরম নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিবন্ধকতা, ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ ও আক্রমন, বিভিন্ন ধরনের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির উপর নির্যাতন, শিশু ও নারী নির্যাতন, দূর্ণীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধ্বংস করার মাধ্যমে এক বহুমাত্রিক সংকট এবং অস্বাভাবিক ও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দখলদার সরকারের ঔদাসীন্য ও পক্ষপাত মূলক আচরন সমগ্র রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছে। সমগ্র দেশ একটি শ্বাসরুদ্ধকর কারাগারে পরিণত হয়েছে।
এসব বিবেচনায় আমরা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদর্শ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী নাগরিক, মুক্তিযোদ্ধা, মানবাধিকার কর্মী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্ম হৃদয়ে৭১-এর উদ্যোগে বিগত ১৭ ও ১৮ জানুয়ারী (২০২৬) দুই দিন ব্যাপি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করি। প্রথম দিন দেশী-বেদেশী গুনিজন বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। দ্বিতীয়দিন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনের আলোকে এবং চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা ঘোষনা করছি যে বর্তমান রাষ্ট্রীয় সংকট নিরসন ও জনগণের সার্বভৌম অধিকার পূণঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিম্ন বর্ণিত বিষয়সমুহ একান্ত প্রয়োজন ও অপরিহার্যঃ
■ জনগণের অধিকার পূণঃপ্রতিষ্ঠা
জনগণের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক হবে সুরক্ষামুলক, নিরপেক্ষ, সকলের প্রতি সমান আচরণ, বিশ্বস্ততা ও জবাবদিহীতা মূলক। জনগণের জান, মাল ও জীবিকার নিশ্চয়তা প্রদান সহ যাবতীয় মৌলিক চাহিদা মিটাতে রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ হতে হবে। অবিলম্বে জনগণের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার পূণঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
■ আইনের শাসন ও স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা
প্রতিহিংসা মূলক ও বানায়োট মামলা রুজুর মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্যাতন ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি পরিহার করে সকলের প্রতি সমতার ভিত্তিতে আইনের শাসন ও স্বচ্ছ বিচার প্রাপ্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আইন আদালতকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার পরিহার করে সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বেআইনী এবং অসাংবিধানিক রূপান্তর বাতিল করে সাংবিধানিক ধারায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
■ মত ও সংবাদ প্রকাশ এবং সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনের অবাধ সুব্যবস্থার নিশ্চয়তা
সংবাদ প্রকাশ, সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ ও নিশ্চয়তা এবং জনগোষ্ঠির মত প্রকাশের স্বাধীনতা জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা অধিকার সংরক্ষনের পূর্ব শর্ত । এসব স্বাধীনতা ভোগের অনিয়ন্ত্রিত নিশ্চয়তা প্রদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। সকল কালাকানুন ও দমনমূলক আইন বাতিল করে সংবাদ মাধ্যম, সাংবাদিক ও নাগরিকদের বাক স্বাধীনতা ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার কার্যকর নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
■ মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে আইনী বিচার
বৈসম্য বিরোধী আন্দোলনের নামে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশ্রয়ে সংঘঠিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব ঘটনাবলীর পরিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পৃর্বক আইনানুগ বিচারের মাধ্যমে জনজীবনে স্বস্থি ও নিরাপত্তা বোধ পূণঃপ্রতিষ্ঠা একান্তই প্রয়োজন।
■ মবতন্ত্র, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ নিয়ন্ত্রণ পূর্বক সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা
সাম্প্রতিক কালে রাষ্ট্রীয় উস্কানী, মদদ ও ইংগিতে যত সব মব আক্রমন, সন্ত্রাস ও জঙ্গী কর্মকান্ড, অস্ত্র লুন্ঠন সংঘটিত ও বিস্তারিত হয়েছে সে সব নিয়ন্ত্রণ পৃর্বক সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দোগ অপরিহার্য।
■ সংবিধান সংরক্ষণ ও সর্বোচ্চ মর্যাদা নিশ্চতকরন
১৯৭২-এর সংবিধান ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত ও কয়েক লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এক গৌরবোজ্জ্বল ফসল। এই সংবিধান নিয়ে হটকারীতামূলক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বালখিল্যতা জাতিকে নূতন করে অজানা অন্ধ প্রকোষ্টে নিক্ষেপ করবে। সর্বাবস্থায় এই সংবিধানের সর্বোচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করে একে সংরক্ষনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য অক্ষুন্ন রাখতে হবে। তথাকথিত বেআইনী গণভোট একটি গণবিরোধী চক্রান্ত, সংবিধানের উপর আঘাত এবং দেশের জনগণকে বহুধা বিভক্ত করার প্রক্রিয়া।
■ স্বচ্ছ, ন্যায্য ও অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচন আয়োজন
বর্তমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া ও স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিলম্বে স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সকল দল ও মতের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আগামীর চলা ও উন্নয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়।
আমরা আশা করি বাংলাদেশের জনগণ দেশকে পূণরুদ্ধারে জেগে উঠবেন। বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে বিশ্বের গণতন্ত্রমনা ও মানবাধিকার সমর্থক ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সরকার সমুহের প্রতি আহবান জানাচ্ছি যে বর্তমান অসহায় অবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আপনাদের হাত সম্প্রসারণ করবেন।
১৭, ১৮ জানুয়ারী (শনি ও রবিবার) ২০২৬ লন্ডন কেন্দ্রীক এক ভার্চুয়াল আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়; যার আয়োজন করে সিভিল সোসাইটি গ্রুপ হৃদয়ে৭১//71@Heart। এতে সহযোগি উদ্যোক্তা ছিলেন Global Centre for Democratic Governance (GCDG), Canada, South Asian Democratic Forum (SADF), Brussels এবং Global Coalition for Secular and Democratic Bangladesh (GCSDB), USA। উদ্যোগটি সমর্থন করেন একাত্তরের প্রহরী (যুক্তরাষ্ট্র) এবং যুক্তরাজ্যস্থ সেকুলার বাংলাদেশ মুভমেন্ট, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও জয়বাংলা ফাউন্ডেশন।
প্রথম দিনের ওয়েবিনারে আলোচনায় ছিলেন যুক্তরাজ্যস্থ ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরামের মার্কেটিং ডাইরেক্টর ক্রিস্টোফার ব্ল্যাকবার্ণ, ফ্রান্সের কোট দ্য জুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং গবেষক ড. এস এম মাসুম বিল্লাহ, জার্মানির হীলব্রুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ড. জোবাইদা নাসরীন, ব্রাসেলস এসএডিএফ-এর ইডি সাবেক এমইপি পাওলো কাসাকা, পোল্যান্ড নেভার এগেইন এসোসিয়েশন এবং মাইনরিটিস ফর পিস-এর প্রতিনিধি নাটালিয়া সিনেইভা-পাকাওয়াস্কা এবং কানাডার জিসিডিজির প্রেসিডেন্ট, (বাংলাদেশের) প্রাক্তন সংসদ সদস্য ডা. এম হাবিবে মিল্লাত ।
দ্বিতীয়দিন অনুষ্ঠিত হয় আয়োজকবৃন্দ সহ মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য, আদর্শ ও চেতনা ভিত্তিক ৭১ অনুসারীদের সম্মেলন। প্রথম দিনের সভায় সভাপতিত্ব করেন হৃদয়ে৭১-এর আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা, ডাকসুর প্রাক্তন সদস্য ও লেখক-গবেষক দেওয়ান গৌস সুলতান এবং সঞ্চালনা করেন টিভি উপস্থাপিকা তামান্না আলী। দ্বিতীয় দিনের সভায় সভাপতিত্ব করেন হৃদয়ে৭১-এর সিনিয়র সংগঠক, লেখক-গবেষক অ্যাডভোকেট শাহ ফারুক আহমদ এবং উপস্থাপনা করেন যৌথ ভাবে সিনিয়র সংগঠক মতিউর রহমান মতিন ও আলীমুজ্জামান। দ্বিতীয় দিন সমবেত ভাবে এই “লন্ডন ঘোষনা” প্রনয়ন, অনুমোদন ও গ্রহন করা হয় ।