লন্ডনে ‘স্বাধীনতা মঞ্চের‘ আয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা সমম্মাননা ও গানে গানে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন

মতিয়ার চৌধুরী. লন্ডন,

  • প্রকাশিত: ২৭ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ৫৬তম বার্ষিকী  উপলক্ষে লন্ডনে মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা ও গানে গানে ব্রিটিশ বাংলাদেশীরা  উদযাপন  করলেন মহান স্বাধীনতা দিবস। প্রবাসে থেকেও মাতৃভূমির ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বীর শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে স্বাধীনতা মঞ্চের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়  “গানে গানে স্বাধীনতা দিবস” উদযাপন অনুষ্ঠান।২৬ মার্চ ২০২৬ বৃহস্প্রতিবার  লন্ডন সময় সন্ধ্যা সাতঘটিকায় পূর্বলন্ডরে রয়েল রিজেন্সী হলে অনুষ্ঠানের শুরুতেই ব্রিটেনে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা মকবুল চৌধুরী নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। এতে ফুটে উঠেছে  শুরু থেকে  মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ব্রিটেনে প্রবাসী বাঙ্গালীদের আন্তর্জাতিক জনমত আদায়ে আন্দোলন সংগ্রামের  চিত্র ।

স্মরণ করা হয় একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। ব্রিটেনে বসবাসরত রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানিয়ে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়, এবং তাদের মঞ্চে রেখে  রনাঙ্গনে তাঁদের অদম্য সাহস, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে নীরবে তাঁদের প্রতি  শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেই মুহূর্তে যেন লন্ডনের প্রবাসী প্রাঙ্গণেও ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি, যে স্মৃতির ভেতর জড়িয়ে আছে বাঙালির স্বাধীনতার অমর গৌরবগাথা। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন প্রদান করে ছোট্ট শিশু অয়ন। কবিতা আবৃত্তি করেন মুনিরা পারভিন, স্মৃতি আজাদ ও সালাউদ্দিন শাহীন।

এরপর শুরু হয় সংগীত পরিবেশনা। শিল্পীরা একে একে পরিবেশন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অমর গান, মুক্তিযুদ্ধের রণসঙ্গীত এবং দেশাত্মবোধক বিভিন্ন সংগীত। সুরের মূর্ছনায় যখন ভেসে ওঠে স্বাধীনতার গান, তখন হলভর্তি দর্শকের হৃদয়ে যেন জেগে ওঠে একাত্তরের সেই অদম্য চেতনা। গানের পরতে পরতে ফুটে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সংগ্রাম ও বিজয়ের গৌরবময় স্মৃতি।সঙ্গীত পরিবেশন করেন, খ্যাতিমান সঙ্গীত শিল্পী গৌরি চৌধুরী, বাউল শহীদ, লাবনী বড়ুয়া, শাহনাজ সুমি, মোহনা, রুবি সরকার, মিষ্টি তালুকদার, তারেক হাসান, বন্যা তালুকদার, অমিত দে, সিগ্ধা রায়, অবলা, শ্রেয়সী, মৃদুল, জয়, শুভাঙ্গী, সাদমান খান প্রমূখ শিল্পরা।

স্বাধীনতা মঞ্চের দুই সংগঠকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত উপস্থাপনা করেন  সংগঠক ও খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ঊর্মি মাজহার। তাঁর সাবলীল বাচনভঙ্গি, উষ্ণ উপস্থিতি এবং আবেগঘন উপস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আরেক সংগঠক সিনিয়র সাংবাদিক এবং সাপ্তাহিক সত্যবাণী সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশা।  তার বক্তব্যে  তিনি বলেন, আজ আমরা শুধু একটি দিন উদযাপন করতে এখানে সমবেত হইনি, আমরা এসেছি আমাদের আত্মপরিচয়কে স্মরণ করতে, আমাদের ইতিহাসকে নতুন করে উচ্চারণ করতে। কারণ এই স্বাধীনতা হঠাৎ করে আসেনি; এটি অর্জিত হয়েছে অগণিত শহীদের রক্তে, মা-বোনের ত্যাগে, আর এক মহান নেতা বঙবন্ধুর অবিচল সাহসী নেতৃত্বে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজও কিছু অপশক্তি, কিছু বিভ্রান্ত চেতনা আমাদের সেই গৌরবময় ইতিহাসকে মুছে দিতে চায়। তারা আঘাত হানতে চায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, ধ্বংস করতে চায় আমাদের স্মৃতির ভিত্তি। কিন্তু আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে ইতিহাস রক্তে লেখা, তা কখনো মুছে ফেলা যায় না; যে সত্য আত্মত্যাগে নির্মিত, তা কখনো পরাজিত হয় না।

তাঁর বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন একাত্তরের বীর শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। হলভর্তি দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি যেন পরিণত হয় এক অনন্য মিলনমেলায়। এতে রাজনীতিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সুপরিচিত ব্যক্তিসহ সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সবার অংশগ্রহণে প্রবাসের মাটিতে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়ছোঁয়া আবহ, যেখানে স্বাধীনতার গান আর স্মৃতির আবেগ মিলেমিশে হয়ে ওঠে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

গান, স্মৃতিচারণ এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে লন্ডনের এই আয়োজন যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়; এটি ত্যাগ, সংগ্রাম এবং অদম্য আত্মমর্যাদার এক ইতিহাস। আর সেই ইতিহাস বুকে ধারণ করেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্বাধীনতার চেতনাকে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের মন্তব্য  প্রবাসে স্বাধীনতা মঞ্চের এই আয়োজন কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি ইতিহাসকে স্মরণ করার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার এবং বাংলাদেশকে হৃদয়ের গভীরে ধারণ করার এক উজ্জ্বল প্রয়াস।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh