জ্বালানি সংকটে বিশ্বজুড়ে ফ্লাইট বাতিল, চাপে বিমান শিল্প

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১১ অপরাহ্ণ

বিশ্বজুড়ে বিমান সংস্থাগুলো জ্বালানি সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ধীরে ধীরে ফ্লাইট বাতিল শুরু করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে জেট ফুয়েলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে জেট ফুয়েলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক দেশের জন্য এই জ্বালানি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলো তাদের ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। কিছু সংস্থা অলাভজনক রুট বন্ধ করছে, আবার কিছু সংস্থা সরাসরি ফ্লাইট বাতিল করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জেট ফুয়েলের দাম অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা বিমান পরিচালনা ব্যয়কে মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক ফ্লাইট এখন আর অর্থনৈতিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

কিছু এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যে হাজার হাজার ফ্লাইট কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের ওপর বাড়তি ভাড়া চাপানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে আরও ফ্লাইট বাতিল হতে পারে এবং বৈশ্বিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

অন্যদিকে, কিছু বিমান সংস্থা জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিকল্প কৌশল নিচ্ছে—যেমন কম যাত্রীযুক্ত ফ্লাইট একত্র করা, কম লাভজনক রুট বন্ধ করা এবং সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করা।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে বিমান শিল্পকে আরও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রের জেট ফুয়েলের গড় দাম ছিল প্রায় ২.৯৭ ডলার প্রতি গ্যালন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি ছিল।

কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর দাম দ্রুত বেড়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে জেট ফুয়েলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গ্যালন প্রতি প্রায় ৪ ডলার বা তার বেশি পৌঁছেছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে এটি প্রতি ব্যারেল প্রায় ২০০ ডলারের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিমান পরিচালনা ব্যয় মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট রুট ও ফ্লাইট বাতিল বা কমিয়ে দিয়েছে। লুফথানসা গ্রুপ প্রায় ২০,০০০ শর্ট-হল ফ্লাইট বাতিল করেছে, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখসহ বিভিন্ন হাব থেকে।

কেএলএম ইউরোপের মধ্যে ১৫০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে এবং আমস্টারডাম থেকে প্রায় ৮০টি রিটার্ন ফ্লাইট বন্ধ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে দুবাই রুটেও ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।

ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স রাতের (রেড-আই) ফ্লাইট ও সপ্তাহের মাঝামাঝি মঙ্গল ও বুধবারের কিছু ফ্লাইট বাতিল করেছে। পাশাপাশি তেল আবিব ও দুবাই রুটে ফ্লাইট স্থগিত করেছে।

সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স কম লাভজনক রুট কমিয়েছে এবং শিকাগো ও’হেয়ার ও ওয়াশিংটন ডালেসে কিছু অপারেশন স্থগিত করেছে।

আলাস্কা এয়ারলাইন্স মেক্সিকো রুটে ফ্লাইট কমিয়েছে এবং কিছু সময়সূচি বাতিল করেছে।

এছাড়াও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্স (এসএএস) এপ্রিল মাসেই প্রায় ১,০০০ ফ্লাইট বাতিল করেছে, বিশেষ করে নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের অভ্যন্তরীণ রুটে। এশিয়ার কিছু এয়ারলাইন্স যেমন এয়ারএশিয়া ও ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন অনেক রুটে ফ্লাইট চালানোই অলাভজনক হয়ে গেছে। বিশেষ করে কম যাত্রীসংখ্যার রুট, রাতের ফ্লাইট এবং স্বল্প দূরত্বের লো-প্রফিট ট্রিপ প্রথমে বন্ধ করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে জেট ফুয়েলের মজুত মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য পর্যাপ্ত থাকতে পারে। সংকট দীর্ঘ হলে আরও বেশি ফ্লাইট বাতিল এবং ভাড়া বৃদ্ধি অনিবার্য। ইতোমধ্যে কিছু এয়ারলাইন্স ভাড়া ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে।

বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সাময়িক সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক বিমান শিল্পের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত। জ্বালানির দাম দ্রুত স্থিতিশীল না হলে ভবিষ্যতে আরও বেশি রুট বন্ধ, টিকিটের দাম বৃদ্ধি এবং যাত্রী ভোগান্তি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh