৬০০ ছাত্রীর বিদ্যালয়ে নেই একজনও নারী শিক্ষক

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০২৬, ৩:১৭ অপরাহ্ণ


‘আমাদের স্যাররা আন্তরিকভাবে পাঠদান করছেন, কিন্তু মেয়েদের অনেক কথা থাকে, যা আমরা পুরুষ শিক্ষকদের বলতে পারি না। গার্লস গাইডের দল থাকলেও নারী প্রশিক্ষক না থাকায় কোনো কার্যক্রম নেই।’ এই আক্ষেপ শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৈশাখী পালের।

মৌলভীবাজারের এই সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে বর্তমানে একজনও নারী শিক্ষক নেই। প্রায় ৬০০ ছাত্রীর এই বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষক সংকট চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সবশেষ তিন বছর আগে এক নারী শিক্ষক মারা যাওয়ার পর থেকে সেখানে আর কোনো নারী শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি।

ফলে বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত ও মানসিক নানা সমস্যা নিয়ে ছাত্রীদের চরম সংকোচ ও দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছেন বিদ্যালয়ের আয়া এবং উচ্চ শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে পাঠদানে সমস্যা না থাকলেও ছাত্রীদের ব্যক্তিগত ও শারীরিক বিষয় এবং বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষকের অভাব অনুভূত হচ্ছে।

১৯৩০ সালে শ্রীমঙ্গলের বনেদি পরিবার রাধানাথ দেব চৌধুরী তার মায়ের নামে ‘দয়াময়ী বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৯৮৫ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হলে এর নামকরণ হয় শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।

দীর্ঘ ঐতিহ্যের এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৯৮ শতাংশ সাফল্য অর্জন করলেও শিক্ষক সংকটের কারণে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ছাত্রী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক পদের সংখ্যা ১৯ হলেও বর্তমানে ছয়টি পদ শূন্য রয়েছে; নেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষকও।

তিনি বলেন, সম্প্রতি একজন ধর্ম শিক্ষককে অস্থায়ীভাবে অন্য বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছে। আর তিন বছর আগে বিদ্যালয়ের একমাত্র নারী শিক্ষক মারা যাওয়ার পর থেকে সেখানে আর কোনো নারী শিক্ষক পদায়ন হয়নি।

ছাত্রীরা বলছে, বয়ঃসন্ধিকালে নানা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের বিষয়ে তারা পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে না। অনেক সময় স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা জটিলতা নিয়েও কাউকে কিছু বলতে পারে না। লজ্জা ও সংকোচে বিষয়গুলো গোপন রেখে কষ্ট সহ্য করতে হয়। ফলে পড়শোনায়ও বিঘ্ন ঘটে এবং অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকতে পারে না।

অভিভাবকদের অভিযোগ, একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক না থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

দিলিপ কৈরী নামের এক অভিভাবক বলেছেন, মেয়েদের নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়গুলো বিবেচনায় অন্তত কয়েকজন নারী শিক্ষক জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শারদীয়া মল্লিক বলেন, গত চার বছর ধরে আমি এই বিদ্যালয়ে পড়ছি। এ সময়ের মধ্যে একজন নারী শিক্ষককে দেখেছিলাম, কিন্তু তিন বছর আগে তিনি মারা যান। এরপর থেকে বিদ্যালয়ে আর কোনো নারী শিক্ষক নেই। এর ফলে আমরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। বিশেষ করে মাসিকজনিত সমস্যায় ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা হঠাৎ বিপাকে পড়ে যায়। লজ্জার কারণে আমরা পুরুষ শিক্ষকদের বিষয়টি বলতে পারি না। এমন পরিস্থিতিতে একজন নারী শিক্ষক খুবই প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী বাবা মৌলভীবাজার পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সভাপাতি আব্দুর রহিম বলছিলেন, যেখানে পুরো স্কুলের শিক্ষার্থী মেয়ে, সেখানে একজনও নারী শিক্ষক নেই। আমার মেয়ের কোনো শারীরিক সমস্যা হলে সে বাড়িতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে। কিন্তু স্কুলে যদি নারী শিক্ষিকা থাকত, তাহলে আমার মেয়েসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও তাদের সমস্যার কথা সজজেই জানাতে পারত।

বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সময়ে ছাত্রীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তার জন্য একটি বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক থাকা জরুরি বলে মনে করেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী।

তিনি বলছেন, নারী শিক্ষক থাকলে ছাত্রীরা সহজে সমস্যার কথা বলতে পারে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ পায়।

বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক না থাকায় কি কি ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামাল উদ্দিন বলেন, আমাদের বিদ্যালয়টি নারী শিক্ষায় অনেক এগিয়ে। এখানে সব শিক্ষকই পুরুষ। পাঠদানে সমস্যা না থাকলেও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শারীরিক ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে পারে না। এছাড়া বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে জেলা, বিভাগীয় কিংবা জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বাইরে যেতে হয়। এসব ক্ষেত্রে পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে যেতে অনেক শিক্ষার্থী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তাই নারী শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলী বলছেন, নারী শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একাধিকবার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন করেছে। সবশেষ চলতি বছরের ১০ মার্চ আবারও নারী শিক্ষক চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল সিলেট বিভাগীয় উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় বিদ্যালয়টিতে নারী শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ওই বছরের ২১ মে সিদ্ধান্তটি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো পদায়ন হয়নি বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) মো. ইউনুছ ফারুকী বলেন, নতুন নিয়োগ বা পদায়নের সুযোগ সৃষ্টি হলে শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

তিনি বলেছেন, বর্তমানে আবেদনকারী পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় পদায়ন দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা সেখানে থাকতে চান না। সূত্র: বিডি নিউজ

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh