সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

পোশাক নিয়ে এক শিক্ষার্থীকে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে পাঠদান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠনটি বলেছে, তিনি ‘রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, অপতথ্য ও বিদ্যায়তনিক পরাধীনতার’ শিকার।
শনিবার (১০ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি এ কথা জানায়। তারা বলেছে, তাসনিম সিরাজ মাহবুব দীর্ঘদিন ধরে একটি ঘৃণাবাদী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। তাকে বিপদে ফেলে মাথা নত করাতেই এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এটি বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতাকে পরাভূত করার আয়োজন।
তাসনিম সিরাজকে পাঠদান থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্তকে ‘বিধিবহির্ভূত’ বলেছে নেটওয়ার্কটি। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিচয় যাচাইয়ের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুখমণ্ডল প্রদর্শনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে শিক্ষকদের এই সংগঠনটি। এ ছাড়া অনুমতি ছাড়া শিক্ষকের বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি করেছেন তারা।
শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, শিক্ষার্থীর মানসিক যন্ত্রণা ও অপমানবোধের কারণ হতে পারে, এমন আচরণের বিরোধী আমরা। এ ক্ষেত্রে সেটির ব্যত্যয় হয়ে থাকতে পারে।
তবে ঘটনাটিকে ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে জনপরিসরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবি তোলা ব্যক্তিদেরই প্রচলিত আইনে শাস্তি হওয়া উচিত।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর একটি উগ্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। তারা উদারপন্থী শিক্ষকদের হেনস্তা করছে। এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রায় একই ধরনের একটি ঘটনায় মব তৈরি করে দুজন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ও ছাত্রী সংস্থা সেই ভূমিকা নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে নেটওয়ার্কটি। তারা বলেছে, দ্রুততম সময়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তাসনিম সিরাজ মাহবুব বলেন, গত ৭ অক্টোবর মাস্টার্সের শেষ সেমিস্টারের একটি ক্লাসে দরজার পাশে তিন শিক্ষার্থী বসেছিলেন। তাদের মধ্যে একজনের চোখসহ পুরো মুখমণ্ডল ঢাকা ছিল। চোখ দেখতে না পাওয়ায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পারছিলাম না।
তাসনিম সিরাজের ভাষ্য, চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করতে না পারায় ওই শিক্ষার্থী তার বক্তব্য কীভাবে গ্রহণ করছেন এবং শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে কীভাবে অংশ নিচ্ছেন, তা বুঝতে তার অসুবিধা হচ্ছিল। এতে পাঠদানের সময় তিনি স্বস্তি বোধ করছিলেন না। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনা থেকেই তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন।
তাসনিম সিরাজ বলেন, পুরো আলোচনায় ওই শিক্ষার্থীর পোশাক পরিবর্তন নিয়ে কোনো কথা হয়নি। চোখ দেখতে না পাওয়ায় স্বস্তি বোধ করছেন না—এ কথা বলার পর ওই শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে চলে যান। এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। তবে শিক্ষার্থীর পক্ষে কথা বলা আরেক ছাত্রীর সঙ্গে কথা হয়।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ছাত্রী পোশাকের স্বাধীনতার কথা বললে তিনি শিক্ষার্থীদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারা এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পাঠদানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীর পরিচয় শনাক্ত করতে না পারা এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর যোগাযোগ ব্যাহত হলে পাঠদানে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, সেটিই বোঝানো ছিল তার বক্তব্যের মূল বিষয়।
তাসনিম সিরাজ আরও জানান, তিনি ওই শিক্ষার্থীকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য করেননি। পোশাক পরিবর্তন করতে, নেকাব খুলতে কিংবা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে যেতেও বলেননি। ধর্মীয় পোশাকের কারণে তাকে কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি বা ভবিষ্যতে তার ক্লাসে আসতে নিষেধ করা হয়নি। তিনি বলেন, তার কথা ছিল চোখ ঢাকা নিয়ে, হিজাব, বোরকা বা পর্দার বিরুদ্ধে নয়।
তাসনিম সিরাজের ভাষ্য, ওই শিক্ষার্থীর সহপাঠীদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তার কথায় শিক্ষার্থী হয়তো কষ্ট পেয়েছেন এবং সে কারণেই ক্লাস ছেড়ে চলে যান। এরপর কয়েকবার সরাসরি দেখা করতে চাইলেও ওই শিক্ষার্থী দেখা করেননি।
নিজের বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রচার করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তাসনিম সিরাজ। এতে তার বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য যথাযথভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ইংরেজি বিভাগ আমার বক্তব্য গ্রহণ না করেই আমার সব কোর্স অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করেছে। আমার ব্যাখ্যা উপস্থাপনের সুযোগ পাওয়ার আগেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মর্মাহত হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আমার অনুরোধ, অভিযোগগুলোর বিষয়ে আমার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। এই প্রক্রিয়ায় আমি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
তাসনিম সিরাজ আরও বলেন, ঘটনার পর বেনামি ফোন, ইমেইল, আপত্তিকর বার্তা ও হুমকি আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।