সব
মতিয়ার চৌধুরী, লন্ডন,
রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনার জবাবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্কার করে বলেছেন, তিনি মনে করেন “ইউক্রেনের জন্য এখন নতুন একজন প্রেসিডেন্ট পাওয়া প্রয়োজন।” এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, লাখ লাখ টন রুশ ডিজেল যুক্তরাষ্ট্রে আনার এই নতুন চুক্তিটি মস্কোকে তাঁর দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ জোগাবে; তিনি বিষয়টিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একটি ‘উপহার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ১১ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলার অনুমোদন অব্যাহত রেখে জেলেনস্কি “বিশ্বের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে” চাইছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো বলেন, “তার এটা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।” এরপর তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন ইউক্রেনের এমন একজন “নতুন নেতা” প্রয়োজন যিনি “সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন”।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর পর থেকে দেশটিতে সামরিক আইন বলবৎ রয়েছে, যার ফলে নির্বাচনও স্থগিত রাখা হয়েছে। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সব ধরনের সহযোগীতা করে আসছে। আমেরিকান সাহায্য ছাড়া ইউক্রেনের পক্ষে এতোদিন ঠিকে থাকা সম্ভব হতোনা। এর ভেতর যুক্তরাষ্ট্রও তাদের যতটুকু প্রয়োজন সব করে নিতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত সমর্থনের ফলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি ভেবেছিলেন তার আর ভাবনার প্রয়োজন নেই। তিনি কখনো তার নিজের সামর্থের দিকে ফিরে থাকাননি। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষনায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কির মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। তিনি এখন চোঁখে শুধু অন্ধকারই দেখছেন। ইউক্রেনের নেতার এই অসহায়ত্ব দেখে অনেকদিন পূর্বে একজন কৃষকের কাছ থেকে শোনা একটি গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। অক্ষর জ্ঞানহীন এই কৃষক বলেছিলেন ‘‘ তিনি অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করতেন, জমির মালিকের কথায় তিনি যা ইচ্ছে তাই করতেন, কখনোই ভেবে দেখেননি তিনি পরের শক্তিতে বলিয়ান হয়ে গ্রামের অন্যান্য কৃষকদের সাথেও খারাপ আচরন করতে শুরু করেন। তিনি ভাবছিলেন তার মতো শক্তিশালী আর কেউ নেই। একদিন সেই জমির মালিক এই কৃষককে জানিয়ে দিলেন তিনি আর তাকে তার জমি চাষ করতে দেবেননা। অবশেষে এই কৃষকের কাছ থেকে সব কিছু কেড়ে নেন। তখন এই কৃষক আপসোস করে বলেছিলেন পরের ধনে পোদ্দারী করে আমি ভূলই করেছি। আগে যদি নিজের সামর্থের কথা ভাবতাম তা হলে হঠাৎ করে এই বিপদে পড়তে হতোনা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের ফলে ডিজেলসহ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে; এর জেরে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে, যে পথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তেলজাত পণ্য পরিবাহিত হয়। জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান উৎপাদক দেশ রাশিয়া এবং ইউক্রেন সম্প্রতি একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর হামলা জোরদার করেছে, যা জ্বালানি বাজারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প আরও বলেন, “আমরা বলেছিলাম, ‘রাশিয়ার বিরুদ্ধে আপনারা যা খুশি করতে পারেন, কিন্তু তেল শোধনাগারগুলোতে আঘাত করবেন না’; কারণ এর ফলে বিশ্বজুড়ে সমস্যা তৈরি হয়।” “তিনি অনেক চুক্তিই করতে পারতেন, কিন্তু কোনো এক কারণে তিনি তা কখনোই করেন না।”
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে “অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক” বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে, ইউক্রেনের এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন যারা প্রকৃতপক্ষে শান্তির ওপর মনোনিবেশ করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট শুক্রবার নিশ্চিত করেছেন যে, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রুশ ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার বিষয়ে মস্কোর সাথে একটি সমঝোতা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জেলেনস্কি বলেন, এই সমঝোতার ফলে মস্কো নতুন তহবিল সংগ্রহের সুযোগ পাবে, যা দিয়ে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারবে। জাপোরিঝিয়ায় নতুন করে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মস্কোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে, তারা এই সমঝোতাকে এমনভাবে দেখছে যেন তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে এবং শহরগুলোর ওপর বোমা বর্ষণ অব্যাহত রাখতে পারবে।
বিশ্লেষণ:
রাশিয়ার সাথে ট্রাম্পের আকস্মিক চুক্তি জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে ক্রমবর্ধমান চাপের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট শনিবার বেশ কয়েকজন মিত্রের সাথে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ সময় তিনি “ইউক্রেনে জীবন রক্ষায়” এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে “বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত” গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন । এদিকে ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জেলেনস্কির সাথে কথা বলেছেন এবং তাঁর প্রতি “পূর্ণ সংহতি” প্রকাশ করেছেন। মুখপাত্র আরো জানান, তাঁরা একমত হয়েছেন যে রাশিয়ার উচিত “অবিলম্বে জ্বালানি-সংক্রান্ত যুদ্ধবিরতি” মেনে নেওয়া এবং কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা বন্ধ করা; কারণ এর ফলে “বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ অবিলম্বে বৃদ্ধি পাবে”। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার ডিজেল চুক্তির বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কাল্লাসের সমালোচনার মুখে পড়েছে। জেলেনস্কির সাথে সুর মিলিয়ে তিনিও বলেছেন যে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে তা “মস্কোকে যুদ্ধ চালানোর জন্য আরও অর্থ জোগাবে”। তিনি আরও বলেন, “রাশিয়ার ওপর চাপ কমানোর সময় এটি নয় এবং ইউরোপ তা করবে না।”
তিনি জানান, সোমবার ইউরোপীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজটি অনুমোদন করার পরিকল্পনা করছেন। ইরান-সংক্রান্ত পরিস্থিতির রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘ সময় ব্যয় করার পর, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে ট্রাম্পের নেওয়া সর্বশেষ পদক্ষেপ হলো রাশিয়ার সাথে এই চুক্তিটি। ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া সেই সংঘাতের ফলে পেট্রোল এবং বিশেষ করে ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে; এর ফলে আমেরিকান জনগণের কাছে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে, কারণ জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং এর পরোক্ষ প্রভাবের জেরে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এএএ (AAA)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬.২৮ ডলার (৪.৭৪ পাউন্ড)—যা গত মাসের গড় দাম ৫.৯৪ ডলার এবং গত বছরের ৩.৬৮ ডলারের তুলনায় বেশি। এই চুক্তির আওতায়, রাশিয়া প্রথমে ৩ লাখ টন ডিজেল “আমেরিকান ও বিশ্ববাজারে” সরবরাহ করবে এবং এরপর নভেম্বর মাসে আরও ৫ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন যে এরপর আরও ১০ লাখ টন এবং পরবর্তীতে “অল্প সময়ের মধ্যে” আরও ৩০ লাখ টন জ্বালানি সরবরাহ করা হবে—তবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই সরবরাহ নির্ভর করবে তাদের ডিজেল শোধনাগারগুলোর পরিস্থিতির ওপর।
গত ১০ মাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশজুড়ে দুবার তীব্র জ্বালানি সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় ডিজেল উৎপাদন আনুমানিক ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বরেই ট্রাম্প ইউক্রেনে নতুন নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছিলেন; তিনি বলেছিলেন যে জেলেনস্কিকে পরিবর্তন করার সুযোগ ইউক্রেনীয় ভোটারদের থাকা উচিত। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউক্রেনে সামরিক আইন বলবৎ রয়েছে, যার ফলে সেখানে নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছে। এদিকে জেলেনেস্কির উপর ইউক্রেনের জনগনের আস্থা নেই, দেশটির ৮০% মানুষ মনে করেন জেলেনেস্কির ভূল সিদ্ধান্তের কারনে অসংখ্য প্রাণহানি সহ উন্নত ইউক্রেন একটি দরিদ্র দেশে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেনের সাধারন মানুষও চাইছেন নেতৃত্বের পরিবর্তন।