কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ২০ দিনে দুই শিশু চুরি: নিরাপত্তাহীনতায় চরম আতঙ্ক

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৩ অপরাহ্ণ


কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে দুটি শিশু চুরির মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। প্রথম চুরির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত নবজাতক ও বিশেষ পরিচর্যা ইউনিট (স্ক্যানু) থেকে আরও একটি নবজাতক চুরির ঘটনায় হাসপাতালটির সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠেছে।

দুটি ঘটনার পর এখন পর্যন্ত জড়িত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, নিরাপত্তার এই ভয়াবহ ঘাটতি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে, আর সাধারণ রোগী ও স্বজনদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে শিশু ওয়ার্ড থেকে সাত মাস বয়সী রাকিব নামের এক শিশুকে চুরি করে নিয়ে যান অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন রাকিবের বাবা মোহাম্মদ রুবেল হোসেন। ঘটনার দিন ওই অজ্ঞাত নারী তার নিজের তিন মাস বয়সী এক শিশুকে রুবেলের স্ত্রীর কাছে রেখে কান্নারত রাকিবকে কোলে নিয়ে শান্ত করার কথা বলে সটকে পড়েন।

সিসিটিভি ফুটেজে ওই নারীকে অটোরিকশায় করে উখিয়ার সোনারপাড়ার দিকে চলে যেতে দেখা গেলেও শিশুটির আর খোঁজ মেলেনি। এ ঘটনায় ২০ সেপ্টেম্বর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় এবং ফেলে যাওয়া তিন মাস বয়সী শিশুটিকে চট্টগ্রামের রাউফাবাদের ‘ছোটমণি নিবাসে’ পাঠানো হয়েছে।

প্রথম ঘটনার ঠিক ২০ দিন পর, ৯ অক্টোবর রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালের স্ক্যানু ওয়ার্ড থেকে আরও একটি নবজাতককে চুরি করে নিয়ে যান বোরকা ও মাস্ক পরিহিত এক নারী। শিশুটির মা রোজিনা আক্তার জানান, গেইট পাস ও বিশেষ পোশাক ছাড়া স্ক্যানু ওয়ার্ডে প্রবেশের সুযোগ নেই।

রাত ১১টা ১৭ মিনিটে শিশুকে দুধ খাওয়ানোর পর তিনি কক্ষে ফিরে যান। আড়াইটার দিকে খুঁজতে এসে দেখেন তার সন্তান নেই। রোজিনার দৃঢ় অভিযোগ, ওয়ার্ডের ভেতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও সরাসরি সহযোগিতা ছাড়া এভাবে নবজাতক চুরি করে বের হওয়া একেবারেই অসম্ভব।

শিশু চুরির ঘটনা তদন্তে নেমে পুলিশ দেখতে পায়, হাসপাতালের বেশিরভাগ সিসিটিভি ক্যামেরাই বিকল বা ফুটেজ অস্পষ্ট। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাজিব পাল জানান, স্ক্যানু থেকে শিশু চুরি করা নারীর মুখে মাস্ক ও বোরকা থাকায় তাকে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

নিরাপত্তার চরম অবনতির বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিংঞো জানান, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সুপার বরাবর একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা পাওয়া যায়নি।

তবে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান এই দাবি নাকচ করে বলেন, পুলিশ বক্সে চার-পাঁচজন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালের প্রতিটি পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন করা বাস্তবসম্মত নয়। সিসিটিভি, নার্স ও আয়ার উপস্থিতির মধ্যে স্ক্যানুর মতো নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ড থেকে শিশু চুরির ঘটনা হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বড় ঘাটতিকেই প্রমাণ করে। আগে আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও বাজেট সংকটে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের সরিয়ে দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পরপর দুটি ঘটনার পর রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান মিজানুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও অন্যান্য জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে তারা প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি, তা রোববারের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে দ্বিতীয় শিশু চুরির পর ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয়রা ১০ অক্টোবর হাসপাতালে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। বর্তমানে শিশু ওয়ার্ডের রোগী ও স্বজনদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। রামুর মরিচ্যা থেকে আসা রোগীর স্বজন তসলিমা আক্তার জানান, ঘটনার পর কড়াকড়ি বাড়লেও ভয়ে এখন রাতে কেউ ঘুমাতে পারছেন না।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh