অস্থির পোশাক খাত : বন্ধ আড়াই শতাধিক কারখানা

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের টানা পঞ্চম দিনের বিক্ষোভে চরম উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানীসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলো। গতকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকার মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া এবং গাজীপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ মুহুর্মুহু টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে, শিল্পাঞ্চলে মোতায়েন করা হয় বিজিবি। সংঘাতের জেরে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িক বন্ধ রাখার পাশাপাশি কালশীতে এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সারা দেশে আড়াই শতাধিক পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনের আড়ালে ক্ষমতাচ্যুত গোষ্ঠী ও তাদের দোসররা দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।

গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর মিরপুর-১১, ১২ নম্বর ও কালশী এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সকাল ১০টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হলে যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে ওই স্টেশনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে এমআরটি পুলিশ।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে বেলা ১১টার দিকে কালশী সড়কে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গিয়ে একপর্যায়ে উল্টো আন্দোলনকারীদের তোপের মুখে পড়েন পুলিশ সদস্যরা। চারদিক থেকে ইটপাটকেল ধেয়ে এলে অন্য পুলিশ সদস্যরা সরে যেতে পারলেও এক সদস্য আটকা পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিও ও বর্ণনায় জানা যায়, এক পুলিশ সদস্যকে একা পেয়ে মাটিতে ফেলে বেধড়ক মারধর করেন বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা। এ সময় তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় পুরো মিরপুর এলাকায় থমথমে অবস্থা তৈরি হয়।

শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় গতকাল সকালের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও পরে শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের এসপি সারোয়ার আলম জানান, নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুরে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করা হলেও পুলিশ কঠোর হাতে তা দমন করেছে। তবে কারখানার নিরাপত্তা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে আশুলিয়ায় নতুন করে আরও প্রায় ৬০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে মালিকপক্ষ।

অন্যদিকে, গাজীপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সকালে জেলার অধিকাংশ জায়গায় স্বস্তি থাকলেও সাড়ে ৯টার দিকে নাওজোড় এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বর্জ্য ফেলে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। সব মিলিয়ে ঢাকা, গাজীপুর ও আশুলিয়ায় গত কয়েক দিনে আড়াই শতাধিক পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তির জন্য বড় অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শ্রমিকদের এই লাগাতার বিক্ষোভের পেছনে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করেছে সরকার। গত ২৪ ঘণ্টায় পোশাকশ্রমিকের ‘ছদ্মবেশে’ সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনে মিশে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে নিষিদ্ধঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

সচিবালয়ে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “শ্রমিকদের প্রধান দাবি মেনে নিয়ে ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এরপরও যারা উৎপাদন ব্যাহত করতে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে, তারা পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা এটা কঠোর হস্তে দমন করব।”

সরকারের এই দাবির সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি অনুধাবন করে নির্ধারিত সময়ের (২০২৬) আগেই সরকার সহানুভূতিশীল হয়ে মজুরি কমিশন গঠন করেছে। ফলে মূল আন্দোলনের দাবি এখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কিছু করতে না পারলেও তাদের কাছে থাকা লুটের বিপুল অর্থ দিয়ে নাশকতার চেষ্টা করতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে।”

সব মিলিয়ে পোশাক খাতের এই অস্থিরতা এখন কেবল আর মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার একদিকে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে দরকষাকষির পথ উন্মুক্ত করেছে, অন্যদিকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh