সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম
গণপূর্তের ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম ঘুরেফিরে খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১, খুলনা-এ ২০১৪ সাল হতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ বছর (একযুগ) সময় ধরে একই কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে আছেন এবং নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন।
তিনি ২০১৪ সালে স্বৈরাচার সরকারের সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরে চাকরি যোগদান করেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেল ও খুলনা মহানগরীর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহজালাল সুজনের গণপূর্ত বিভাগ-১ এর বাগিয়ে নেওয়া কাজগুলো মাঠ পর্যায়ে সাহায্যকারী হিসেবে সরাসরি তত্ত্বাবধান করতেন এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তথা খুলনা গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীদের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির ছত্রছায়ায় ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নিজের আয়ত্বে রাখতেন।
দক্ষিণবঙ্গ তথা খুলনা বিভাগের মানুষের চিকিৎসার জন্য একমাত্র আস্থা ও ভরসার জায়গা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানে চারটি ব্লকে অবস্থিত ভবনগুলোর ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় যে, ভবনগুলোর ভেতরের অবকাঠামো ও ওয়াশ রুমের জরাজীর্ণ এবং বেহলা দশা এবং বাহিরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার যে দুর্দশা তার জন্য এ ফ্যাসিস্টের সহযোগী ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম অনেকাংশে দায়ী। অথচ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভবনগুলো মেরামত বাবদ প্রতি বছর গণপূর্তের বার্ষিক পরিকল্পনা খাত, সরকারের স্বাস্থ্য খাতের বিশেষ বরাদ্দ ও বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষ অনুদান হতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। বিগত কয়েক বছরের টেন্ডার সিডিউল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় যে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিভিন্ন কাজের নামে একই কাজ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বার বার বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে। গণপূর্তের এই ডিপ্লোমা প্রকৌশলী কিছু কিছু মেরামত কাজ বাস্তবায়ন না হলেও ভুয়া বিল সাবমিট করে বিশাল অংকের টাকা আত্মাসাৎ করেছেন। তিনি ফ্যাসিস্টদের সহযোগিতা করে এবং সম্মিলিতভাবে ঠিকাদারি ব্যবসা করেন বলে জানা যায়। এই ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ২০১৪ সাল হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত মেরামত ও প্রকল্প কাজের অস্বাভাবিক ব্যয় ও ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম একই কর্মস্থলে একযুগ চাকরি করে নামে-বেনামে অঢেল সহায়-সম্পত্তির মালিক হয়েছেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে নিজ জেলা পটুয়াখালী বাউফলে, বাসা/হোল্ডিং নং-২৬৪, গ্রাম/রাস্তা: মরহুম রমিজ উদ্দিন সড়কে দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করেছেন। এছাড়া গ্রামে প্রায় ১৫ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন, বরিশাল শহরে দৃষ্টি নন্দন বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। খুলনা শহরের প্রাণ কেন্দ্র ‘নিরালা আবাসিক এলাকা’ ও ঢাকা শহরে তার রয়েছে একাধিক বিলাস বহুল ফ্ল্যাট। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকেন ভোল পাল্টে সুকৌশল ব্যবহার করে গণপূর্ত ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি প্রকৌশলীর মহলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারর অভিযোগের প্রমাণ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি গণপূর্তের বদলি নিয়ে বিভিন্ন সময়ের সাবেক মন্ত্রী, বর্তমান উপদেষ্টা, সচিব ও আমলাদের নাম বিক্রি করে গণপূর্তের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টি করেন
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামকে গত নভেম্বর ২০২০ সালে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ২৫.৩৬.০০০০.২১১.১৯.২.০১.১৩/১০০ পত্র স্মারকের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বদলি করা হয়। কিন্তু তিনি শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেল ও যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহ্জালাল হোসেন সুজনের সরাসরি হস্তক্ষেপে অবৈধ অর্থ ও ক্ষমতা প্রভাব বিস্তার করে একজন আনডিউ ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে ল্যাং মেরে ৬ জানুয়ারি, ২০২১ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ২৫.৩৬.০০০০.২১১.১৯.২.০১.১৩/০৪ পত্র স্বারকের মাধ্যমে মাত্র ২ মাসের ব্যবধানে বদলি হয়ে পূর্বের কর্মস্থল খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এ ফেরত আসেন। সম্প্রতি ২০২৫ সালে ১০ জুলাই গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ২৫.৩৬.০০০০.২১১.১৯.২.০১.১৩/১০৬ পত্র স্মারকের সাধারণ বদলি প্রজ্ঞাপন করে খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ খুলনা হতে তাকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এ বদলি করা হয়। কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট না হওয়ায় অবৈধ অর্থের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের উচ্চ মহলের সাথে লিয়াজো করে চাপ প্রয়োগ করলে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে হতে পুনঃরায় ২০২৫ সালে ২২ অক্টোবর, ২৫.৩৬.০০০০.২১১.১৯.২.০১.১৩/১৯৪ পত্র স্মারকের মাধ্যমে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ হতে রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ ঢাকায় বদলী করা হয়। এবারও তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে উচ্চ মহলে পুনরায় তদবিরের মাধ্যমে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর হতে ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর ল্যাং মেরে একজন আনডিউ ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ২৫. ৩৬.০০০০.২১৯.১৯.২.০১.১৩/২০৮ পত্র স্মারকের মাধ্যমে ঢাকার রক্ষণাবেক্ষণ গণপূর্ত বিভাগ হতে পূর্বের কর্মস্থল খুলনা-এ বদলি হয়েছেন। সাম্প্রতি এই চার মাসের মধ্যে ২টি বদলি হতে তদবিরের কাজে এই ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের ৩০ লাখ টাকার অধিক বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ করেছেন বলে তার ১৪ ব্যাচের বন্ধু মহল বলে বেড়াচ্ছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ঠ প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (এফএপিএডি) একটি অডিট টিম ‘কোভিড-১৯’ জরুরি প্রতিক্রিয়া এবং মহামারি প্রস্তুতি প্রকল্প (গণপূর্ত অংশ)” মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০ শয্যাবিশিষ্ট ওয়ানস্টপ জরুরি সেবা কেন্দ্র স্থাপন (ইজিপি-৯১৭৩৪০) এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ শয্যা বিশিষ্ট প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউ স্থাপন (ইজিপি-৯২৪৯২৪) এর বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত বিশেষ বরাদ্দের মাঠ পর্যায়ের কাজ পরিদর্শনে যেয়ে টেন্ডার সিডিউলের কয়েকটি আইটেমের কাজ পর্যবেক্ষণ করে ব্যাপক অনিয়ম পেয়েছেন।
কৈলেশ চন্দ্র দাস, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট অফিসার (এফএপিডিএ) তার স্বাক্ষরিত গত ১৮/০৯/২০২৫ তারিখে তিনটি আপত্তির পত্রের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ বাবদ ৪৪,১০,০৫১ টাকা দেখিয়েছেন।
ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম মারফত এ কাজের বিল কোভিড পরবর্তী সময়ে মেজারমেন্ট বুকে অ্যান্ট্রি না করে বিশেষ ফরমেটের মাধ্যমে কাজের পূর্বেই তড়িঘড়ি করে প্রদান করা হয়েছে মর্মে জানা যায়।
এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান SN Builders Pvt. Ltd এর স্বত্বাধিকারীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন কাজের শুরুতে নকশাবহির্ভূত, গোঁজামিল দেওয়া ও অস্বাভাবিক এস্টিমেট হাতে পাওয়ার পরই প্রাক্কলন প্রণোয়নকারী ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামকে অবহিত করি। তিনি এস্টিমেটের বিষয়টি নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করার নির্দেশ দেন এবং আমাদের নকশা অনুযায়ী যতটুকু কাজ তিনি দেখিয়েছেন ততটুকু কাজ সম্পন্ন করেছি। নকশা অনুযায়ী বাকি কাজ করানোর ক্ষেত্র নেই বলে তিনি জানান। এভাবে বেশির ভাগ বরাদ্দ এই ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে লোপাট করা হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণাদি সামগ্রিক ভাবে জানা যায়।
এছাড়া খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর আওতাধীন “৮টি বিভাগীয় শহরের সরকারি মেডিকেল হাসপাতালে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় MBPL I SNBPL (JV) এর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ১৭-তলা ভিত বিশিষ্ট দুইটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং একই সাথে প্রকল্পের ২২টি প্যাকেজের প্রায় ১৩৫ কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে। যার সরাসরি মাঠ পর্যায়ের সুপারভিশনের দায়িত্বে আছেন এই ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে মূল ভবনসহ প্যাকেজসহ অন্যান্য কাজে অগ্রিম বিল ঠিকাদারকে প্রদান করা হয়েছে যার অনেকাংশ কাজ এখনও পর্যন্ত শেষ করা হয়নি। যাহা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত।
এছাড়া নিম্নমানের নির্মান সামগ্রী ও দরজার কাষ্টে বার্মাটিক ধরা থাকলেও চিটাগাংটিক লাগানো হচ্ছে। তার হাতে এ প্রকল্পের সুপারভিশন নিরাপদ নয় বলে গণপূর্তের খুলনায় কাজ করা এক ঠিকাদার জানান। গণপূর্ত সচিব কে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন তদন্ত করে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে প্রথম নির্বাহী প্রকৌশলী গণপূর্ত বিভাগ-১, খুলনা কামরুল হাসানকে ফোন করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায় এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামকে যোগাযোগ করলে সে বলে এই অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। কিন্তু যখন বলা হয় আপনি চাকরি যোগদানের পর থেকে এখনো একই জায়গাতে অবস্থান করছেন এই বিষয়ে সেই কোনো জবাব দিতে পারেনি।