সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম
দেশের নষ্ট রাজনীতি কখনোই সাংবাদিক আতাউস সামাদকে স্পর্শ বা প্রভাবিত করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।
তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিক আতাউস সামাদ কী করবেন, তা উনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতেন। কেউ উনাকে দিয়ে কোনো কিছু করাবে– এমন অবস্থা কারও ছিল না। দেখতে খুব নরম-সরম মানুষ হলেও উনি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ছিলেন। যেটা মনে করতেন, সেটাই করতেন। সেই পথ থেকে তাকে সরানো যেত না।’
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে বরেণ্য সাংবাদিক আতাউস সামাদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে) আয়োজিত স্মরণসভায় এসব কথা বলেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
এসময় রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের এবং মেধাবীদের হাতে ফিরিয়ে আনার জন্য সাংবাদিকদের কাজ করার আহ্বানও জানান তিনি।
আবদুস সালাম বলেন, ‘আজকে আমরা একটা নষ্ট রাজনীতির মধ্যে আছি। এতদিনেও রাজনীতি ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যাচ্ছে না। স্বাধীনতার সময় থেকেই বিচ্যুতি ঘটছে। সেখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করার কথা সাংবাদিকদের। কিন্তু চলার পথে আপনারাও (সাংবাদিকরা) সেই রাজনীতির সংক্রামক ব্যাধিতে জড়িয়ে পড়েছেন, যার কারণে সমাজ ও গণতন্ত্র যতটা বিকশিত হওয়ার কথা ছিল, তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশ আবার একটি গণতান্ত্রিক পথে হাঁটা শুরু করেছে। এখানে অনেক ভুলত্রুটি থাকবে, তবুও ফাইনালি চেষ্টা করতে হবে, যাতে এই গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে পারি এবং সরকারের পরিবর্তন যেন নিয়মতান্ত্রিক পথেই নিশ্চিত হয়।’
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ‘সাংবাদিকতা বা সমাজ গঠনে রাষ্ট্রের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলো সংবাদ ও সাংবাদিকতা। সেখানে আতাউস সামাদের মতো এই ধরনের মানুষ খুব বিরল, কিন্তু থাকাটা খুব জরুরি। যেমনি এখন একজন আছেন ‘আমার দেশ’ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সাহেব।’
তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা মানুষকে যা তৈরি করেছেন, তার মেধাটা সেভাবেই দিয়েছেন যে, তিনি কোন সেক্টরে কাজ করবেন। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ তাআলা প্রকৃতির প্রয়োজনে সমুদ্র, নদী, বাঘ, কেঁচো সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। ঠিক তেমনি মানব সভ্যতার জন্য মানুষের মধ্যেও ভাগ করে দিয়েছেন কে রাজনীতিবিদ হবেন, কে প্রকৌশলী হবেন, কে সাংবাদিক হবেন, কে ডাক্তার হবেন। যখন আমরা সেটা না মেনে অন্য ক্ষেত্রে যাই, তখনই সমাজে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।’
আবদুস সালাম বলেন, ‘প্রকৃতির ওপর হাত দিলে যেমন প্রকৃতি উল্টো আঘাত করে, ঠিক তেমনি ক্ষেত্র পরিবর্তন হলেও তার প্রভাব পড়ে। আজকে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ক্ষতি সম্পর্কে বলব যে, সমাজে এমন কিছু মানুষ থাকা দরকার, যাদের সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে নিজের ক্ষেত্র থেকে সমাজ ও মানুষের জন্য লড়াই করতে হবে।’
রাজনীতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন ও আদর্শ অনুসরণের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘তিনি (জিয়াউর রহমান) অল্প সময়ের রাজনীতিতে একজন মহান সংস্কারক ছিলেন। এই দেশের জন্য যে সংস্কার দরকার, তিনি করে গেছেন। রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের সেই আদর্শ ও নীতি অনুসরণ করতে পারলে আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।’
বিএজে’র সভাপতি এম আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বুরহান উদ্দিন ফয়সালের সঞ্চালনায় স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাৎ, এনটিভির সাবেক বার্তা প্রধান খায়রুল আনোয়ার মুকুল, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও টাইম অব বাংলাদেশের উপদেষ্টা সম্পাদক ইলিয়াস খান, বিশিষ্ট লেখক ও টকশো ব্যক্তিত্ব সাখাওয়াত হোসেন শায়ন্ত, ডিইউজে’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, বিএফইউজে’র সহকারি মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওন, ডেইউজে’র সাবেক নেতা বেলায়েত হোসেন, আমিরুল ইসলাম অমর, বিটিভির সাংবাদিক মোরশেদ আলম প্রিন্স প্রমুখ।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, ‘আতাউস সামাদের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল সংবাদের তথ্যের নির্ভুলতা ও সত্যতা। সাবেক সামরিক শাসক এরশাদের বিসিআইসি ভবন পরিদর্শনের সময় কর্মচারীদের এরশাদবিরোধী স্লোগানের সঠিক খবর বিবিসিতে প্রচার করায় বাংলাদেশে বিবিসির কার্যালয় বন্ধ ও তাকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তিনি ভুল স্বীকার না করে সত্যের পক্ষে অটল থাকেন।’
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান অবজারভারে থাকাকালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কভার করা, শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনামা গোপন চিরকুট মাওলানা ভাসানীর কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ১৯৭০-এর শেষভাগে প্রেসক্লাব থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্লোগান নিয়ে মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আতাউস সামাদ। তিনি বার্তা সংস্থা, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সাপ্তাহিক– সংবাদমাধ্যমের প্রায় সব শাখাতেই কাজ করেছেন। তার নীতিভিত্তিক ব্যক্তিত্বের কারণে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও তাকে গভীরভাবে সম্মান ও সমীহ করতেন।’
সভাপতির বক্তব্যে বিএজে সভাপতি ও ‘আমার দেশ’-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ওনার (আতাউস সামাদ) সঙ্গে পরিচয়। তিনি জুনিয়র সাংবাদিক ও সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আলোচনা করতেন। সেভাবেই সম্পর্ক রক্ষা করতেন। বয়সের ব্যবধানটা ঘুচে যেত ওনার সঙ্গে দেখা হলে। তিনি সেভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মিশে কাজ করতেন এবং করাতেন।’
আতাউস সামাদের ভাতিজা ও মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, ‘আতাউস সামাদ কেবল একজন প্রখ্যাত সাংবাদিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সৎ, সাহসী ও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষ। কাজের প্রতি আতাউস সামাদের আন্তরিকতা ও সততা ছিল অকৃত্রিম। গভীর রাতে ফোন করলেও দেখা যেত, তিনি রিপোর্ট ও পত্রিকা তৈরিতে মগ্ন। জ্যেষ্ঠ ও শিক্ষকদের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা এবং সাহসিকতা আজকের তরুণ সাংবাদিকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।’
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও ‘দ্য ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, ‘নব্বইয়ের দশক-পরবর্তী দলীয় মেরুকরণের যুগে আতাউস সামাদ ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বাধীন পেশাদারিত্বের এক বিরল প্রতীক। তিনি সেসময় বাংলাদেশের সবশেষ স্বাধীন সাংবাদিক ছিলেন। সরকারি প্লট বা আর্থিক সুবিধার মোহে পড়ে তিনি কখনো নিজের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেননি। তথ্যের একুরেসি ও প্রত্যক্ষ সোর্সিং ছিল তার সাংবাদিকতার মূল শক্তি।’
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট খাইরুল আনোয়ার মুকুল বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে এবং পরবর্তীতে আমার দেশ ও এনটিভিতে সম্পাদক হিসেবে আতাউস সামাদকে পাওয়ার অভিজ্ঞতা অনন্য। সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন নিখুঁত পারফেকশনিস্ট। ‘অজ্ঞাত সূত্র জানায়’ কিংবা ‘সংশ্লিষ্ট মহল’ বলে অনুমাননির্ভর রিপোর্ট লেখা তিনি কঠোরভাবে অপছন্দ করতেন। বরং সুনির্দিষ্ট তথ্য, নাম ও দলিলের ভিত্তিতে নির্মোহ ভাষায় সংবাদ পরিবেশনের নির্দেশ দিতেন।’
‘আমার দেশ’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমার দেশকে একটি ব্র্যান্ডে ও জনপ্রিয় পত্রিকায় পরিণত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন আতাউস সামাদ ভাই। তিনি আমৃত্যু আমার দেশের সঙ্গে থেকে পত্রিকাটিকে টিকিয়ে রেখে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আমি আমার সাংবাদিকতার জীবনে সামাদ ভাইয়ের কাছ থেকে অনেক শিখতে পেরেছি, জানতে পেরেছি এবং উপকৃত হয়েছি। তিনি শেষ দিন পর্যন্ত যেভাবে সাংবাদিকতার একুরেসি মেনে চলেছেন, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।’
টাইমস অব বাংলাদেশ-এর উপদেষ্টা সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, ‘তিনি (আতাউস সামাদ) ছিলেন পারফেকশনিস্ট। তিনি ফাঁকি দেওয়াটা ধরে ফেলতেন। রিপোর্টের সূত্রকে স্পষ্ট করে বলতেন। তিনি শিক্ষক ও সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে আমাদের শিখিয়েছেন। তার মতো একজন সাংবাদিক আমাদের প্রয়োজন।’