আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি : মূল্যস্ফীতির চাপে ঋণের ফাঁদে দেশের ৪৭ শতাংশ পরিবার

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭:২৯ অপরাহ্ণ

নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পেরে প্রতি মাসেই ঘাটতি বাজেটে চলতে বাধ্য হচ্ছে পরিবারগুলো। পরিস্থিতির চাপে পড়ে জাতীয় পর্যায়ে বর্তমানে প্রায় ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহরের তুলনায় গ্রামীণ জনপদের মানুষ এই ঋণের বোঝায় সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল’ পরিচালিত ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক এক বিশেষ জরিপে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই সংকটজনক চিত্র উঠে এসেছে। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ প্রণয়নে সহায়তার লক্ষ্যে এই জরিপটি পরিচালিত হয়।

জরিপের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে বর্তমানে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা, যার বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩১১ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি পরিবারকেই এখন ঘাটতি বাজেটে চলতে হচ্ছে। অথচ ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে জাতীয় পর্যায়ে গড় পারিবারিক মাসিক আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং গড় ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে পরিবারগুলোর সেই সামান্য উদ্বৃত্ত সঞ্চয় এখন বড় অঙ্কের ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক বছরে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ করতে বাধ্য হয়েছে। একই সময়ে শহরাঞ্চলের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ পরিবার ধারদেনার দ্বারস্থ হয়েছে। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের এই চাপ সবচেয়ে বেশি সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে, যেখানে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় খরচ ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। যার প্রায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই চলে যায় খাদ্যবহির্ভূত নাগরিক নানা প্রয়োজনে।

এই জরিপের ফলাফল দেশের দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি উল্লেখ করেন, জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার কারণে মানুষের খরচ বাড়েনি; বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যই সাধারণ মানুষকে ঋণের ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে। টানা ৫৬ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছানোয় এবং কাজের সুযোগ সীমিত থাকায় সেখানে ঋণের হার সবচেয়ে বেশি।

বিবিএসের এই তথ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক দারিদ্র্য পূর্বাভাসেরও মিল পাওয়া গেছে। গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির চাপ, তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা এবং শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সূত্র: ডেইলি স্টার

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh