সব
এমজেএইচ জামিল,
রাজধানীর বঙ্গবাজার থেকে নিউমার্কেট সর্বশেষ ওয়ারীতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সর্বত্র আগুন আতঙ্ক। এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিঃস্ব হাজার হাজার ব্যবসায়ী। ক্ষতি হয়েছে কয়েকশ কোটি টাকা। এই সময়ে সিলেটেও বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে বিরাজ করছে আতঙ্ক।
নগরীর পুরনো জীর্ণশীর্ন মার্কেট, সরু গলি, উপগলি ও বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন তৈরি হওয়া ভবনগুলো অগ্নিকাণ্ডের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি নগরীর অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত জলাধার না থাকায় বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলার সামর্থ্য নিয়ে খোদ ফায়ার সার্ভিসও শঙ্কিত। এদিকে আয়তনে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকা সম্প্রসারণ হয়েছে। বাড়ছে নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ। বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ির পাশাপাশি নির্মিত হচ্ছে বিপণি বিতানও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা সৃষ্টি, অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র স্থাপন ও ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে সিলেটে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বেশী হতে পারে। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ সিলেটের মতে- ইউনিটের পাশাপাশি জনবল বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা না গেলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা শামাল দেয়া কঠিন হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সোমবার বেলা ১২টার দিকে নগরীর কদমতলীস্থ ফল মার্কেটের ছাদে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও অল্পের জন্য বড় ধরনের বিপদ থেকে গোটা এলাকা রক্ষা পেয়েছে। এদিকে ১১ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর কুমারপাড়াস্থ বাসায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রতি সপ্তাহে নগরীর কোথাও না কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক বছরে সিলেটের হকার্স মার্কেট, কাজির বাজার ও ফেঞ্চুগঞ্জে ৩টি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মোকাবেলায় বেগ পেতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসকে। হকার্স মার্কেটে আগুন নিয়ন্ত্রণে সরু গলির কারণে অগ্নি নির্বাপণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায় নি। পর্যাপ্ত জলাধার না থাকায়ও আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের। এছাড়া বিভিন্ন বাসা বাড়ি ও ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে গিয়েও সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসকে। অধিকাংশ থেকে ১০/১৫ বছরের পুরনো ভবনগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি নির্বাপক গাড়ি প্রবেশের সুযোগ কম। রাস্তার প্রশস্ততা এতটাই কম যে অনেক সময় মাইক্রোবাস কিংবা প্রাইভেট কারও চলাচলে সমস্যা হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে সারাদেশের ৩৮.৮৭ শতাংশ ভবন রয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে। ঝুঁকিতে থাকা এই সব ভবনে রয়েছে বিভিন্ন আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে- সিলেটে ১৯.৭৬ শতাংশ ভবন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বিভাগের ১৭২টি ভবন পরিদর্শন করে ৩৪টি ভবনকে অগ্নিকাণ্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ।
এদিকে সরেজমিনে সিলেটের হাসান মার্কেট, হকার্স মার্কেট, মহাজন পট্টি, কালিঘাট, ব্রহ্মময়ী বাজার, লাল বাজার ও কাজিরবাজার ঘুরতে গিয়ে দেখা যায়, হাসান মার্কেট ও হকার্স মার্কেট অত্যন্ত ঘিঞ্জি পরিবেশে চলছে ব্যবসা। মার্কেটের ভেতরে সরু গলিতে গায়ে গা ঘেঁষে চলাচল করছে ক্রেতা বিক্রেতাগণ। মার্কেটের প্রবেশ পথও সরু হওয়ার কারণে ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে। গত বছরের ২ মে শেষ রাতে নগরীর হকার্স মার্কেটে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১৭ টি টিম একযোগে কাজ করে। এ সময় সরু গলির কারণে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয় তাদের। পাশাপাশি পানির অপর্যাপ্ততাও ছিলো।
জানা গেছে, গত ৪ জানুয়ারি সিলেট নগরীর পূর্ব কাজিরবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে ৮/১০টি দোকান পুড়ে যায়। এতে প্লাস্টিকের দরজা, জানালা, গুদামজাত পাটের বস্তা, প্লাস্টিকের বস্তাসহ অন্যান্য মালামাল পুড়ে যায়। এতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
গত ১২ মার্চ সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগরস্থ বিসিক শিল্প নগরীতে থাকা বনফুল এন্ড কোম্পানির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এর আগেই প্রায় অর্ধ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এপ্রিলের শুরুর দিকে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পূর্ব বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে গেছে বাজারের ৮টি দোকনঘর। উপজেলার পূর্ব বাজারে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় আড়াই ঘণ্টা চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিকাণ্ডে সুতা, সাইকেল, মুদিসহ ৮টি দোকানের মালামাল টাকা পয়সা আসবাবপত্রসহ সব মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিলেট বিভাগীয় উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, একসাথে একাধিক স্থানে অগ্নিকান্ড কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলে উদ্ধার তৎপরতায় বেশ সময় লাগবে। গত বছর হকার্স মার্কেটে আগুন নেভাতে গিয়ে আশেপাশে পানির কোনো উৎস বা জলাধার না থাকায় ফায়ার ফাইটাররা সমস্যায় পড়েন। পাশাপাশি সিলেট সম্প্রসারিত হওয়ায় গড়ে ওঠছে নতুন নতুন বহুতল ভবন। আর এসকল ভবন নির্মাণে সিটি করপোরেশনের অনুমোদন ও ফায়ার সার্ভিসের অনাপত্তি নিলেও ভবন মালিকরা অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
অগ্নিনির্বাপণে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিলেট বিভাগে ২৯টি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন আছে। এর মধ্যে সিলেট সিটির আওতায় আছে ৩টি। তালতলা, দক্ষিণ সুরমা ও সেনানিবাস (বটেশ^র)। বড় দুর্ঘটনা হলে ৩টি স্টেশনে আমরা ৬ থেকে ৭টি ইউনিট তৈরী করতে পারি। কিন্তু তখন পর্যাপ্ত সময় পাওয়া না গেলে বিশাল ক্ষতির শঙ্কা রয়ে যায়।