সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার বিচারের অপেক্ষায় স্বজনদের এক যুগ কেটে গেছে। রায় ঘোষণার প্রায় নয় বছর পার হলেও তা এখনো কার্যকর না হওয়ায় ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতদের স্বজনরা।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড (সংযোগ সড়ক) থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম, নজরুলের সহযোগী তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলমকে অপহরণ করা হয়।
তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন আরও একটি মরদেহ পাওয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সারাদেশের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরে তদন্ত শেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ ৩৫ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ২৫ জন ছিলেন র্যাব সদস্য। সাত খুনের মামলা হওয়ার পর তাদের সবাইকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন।
পরবর্তীতে আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের অগাস্টে হাই কোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ‘লিভ টু আপিল’ পর্যায়ে রয়েছে।আসামিদের পক্ষে আপিল করা হয় কিন্তু গত নয় বছর ধরেই শুনানির অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আবুল কালাম আজাদ জাকির।তিনি বলেন, “আপিল বিভাগেও মামলাটি নিষ্পপ্তি হয়ে গেছে। কিন্তু পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে ‘লিভ টু আপিল’ প্রসিডিংসে আটকে আছে বিষয়টি। এই কার্যক্রমে যদিও সময় লাগে, কিন্তু এক্ষেত্রে বেশি লাগছে। আমরা অ্যাটর্নি জেনারেল স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।”
গাড়িচালক জাহাঙ্গীর খুন হওয়ার এক মাস পর জন্ম নেয় তার একমাত্র সন্তান রোজা আক্তার জান্নাত। এখন বাবাহারা জীবনের বাস্তবতা নিয়ে বড় হচ্ছে। সে মাদ্রাসায় পড়ে। তার মা শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন।নুপুর বলেন, “আমার মেয়ে জন্মের পর থেকেই বাবাকে দেখেনি। অন্যদের বাবাকে দেখে সে কষ্ট পায়, কান্নাকাটি করে। যারা আমার স্বামীকে হত্যা করে এতিম করেছে, তাদের শাস্তি এখনো হয়নি। আমরা কবে বিচার দেখব, তাও জানি না। খালি দিন গুনছি আমরা।”
অন্যদিকে নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটি রায় কার্যকরের দীর্ঘসূত্রতায় হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সারাদেশ তোলপাড় করে তোলা মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি সরকার এ বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হবে।
তিনি বলেন, “সবকিছু চাক্ষুষ প্রমাণিত, এখানে তো কোনো লুকোচুরি নাই। ঘটনার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও বলছিলেন, তারা সরকারে আসলে বিচারটি করবেন। এখন আমরা সেই আশায় আছি।”
নিহত তাজুল ইসলামের বৃদ্ধ বাবা আবুল খায়ের বলেন, “জীবদ্দশায় এই মামলার বিচার দেখে যেতে পারব কি-না, সেইটাও সন্দেহ।”