নতুন সহস্রাব্দের সংকট: এক নিবিড় সামাজিক পর্যালোচনা

কাজল রশীদ,

  • প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬, ৬:০৬ অপরাহ্ণ

শাহ লাভলী রহমান রচিত ‘নতুন সহস্রাব্দের সংকট’ বইটি বর্তমান সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষাগত ও নৈতিক অবক্ষয়ের একটি গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী দলিল। আধুনিক সমাজ যে চরম সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার প্রতিটি অনুষঙ্গ লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে এই গ্রন্থে তুলে ধরেছেন।

একবিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকে বিশ্বজুড়ে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তার একদিকে যেমন রয়েছে প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন, অন্যদিকে রয়েছে মানবিক মূল্যবোধের ভয়াবহ স্খলন। লেখক শাহ লাভলী রহমান তাঁর ‘নতুন সহস্রাব্দের সংকট’ বইটিতে এই দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। বইটি কেবল বর্তমান সমাজের সংকটগুলোকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে স্থাপন করেনি, বরং এই সংকটগুলো কীভাবে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক বন্ধন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র প্রদান করেছে।

বইটির প্রারম্ভেই লেখক আধুনিক মানুষের ভোগবাদী মানসিকতার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বেঁচে ছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ের মানুষ হয়ে উঠেছে প্রবল আত্মকেন্দ্রিক। লেখক দেখিয়েছেন যে, মানুষ এখন তার মৌলিক চাহিদা পূরণের সীমানা ছাড়িয়ে এমন এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে, যেখানে অপরের ক্ষতি করে হলেও নিজের স্বার্থসিদ্ধিই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই স্বার্থপরতাই রূপ নিয়েছে চরম ভোগবাদে।

পারিবারিক সম্পর্কের অবক্ষয়ের পেছনেও লেখক এই ব্যক্তিস্বার্থপরতাকে দায়ী করেছেন। পিতা-মাতার প্রতি দায়বদ্ধতা হ্রাস, উত্তরাধিকার নিয়ে বিবাদ এবং দাম্পত্য জীবনের অস্থিরতা,সবই এই স্বার্থান্বেষী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। লেখকের মতে, আমরা যখনই আমাদের স্বার্থকে বৃহত্তর মানবিক কল্যাণের চেয়ে বড় করে দেখি, তখনই সমাজ তার ভারসাম্য হারায়। এই ভারসাম্যহীনতা কেবল ব্যক্তিগত জীবনে নয়, বরং পুরো সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতি, সহিংসতা এবং প্রতারণার বীজ বপন করছে।

বইটির একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে বর্তমান রাজনীতি ও নৈতিকতার সংকট। লেখক অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, রাজনীতি একসময় ছিল সমাজ পরিবর্তনের একটি পবিত্র হাতিয়ার, যা ন্যায়, সত্য ও কল্যাণের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো। প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের মতো প্রাচীন দার্শনিকদের মতাদর্শ টেনে লেখক দেখিয়েছেন, রাজনীতি ও নৈতিকতা একে অপরের পরিপূরক হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বর্তমান রাজনীতির চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।

আজকের রাজনীতি মূলত ক্ষমতার দখলের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভের জন্য ভোট কারচুপি, পেশিশক্তির ব্যবহার, দলীয়করণ এবং সরকারি সম্পদ আত্মসাতের মতো ঘটনা এখন অনেকটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। লেখক রাজনীতির এই অবক্ষয়কে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হিসেবে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, যদি রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে জনসেবা না থেকে কেবল ক্ষমতা থাকে, তবে সেই রাষ্ট্র কখনোই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারবে না। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। লেখক রাজনীতির এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আদর্শিক ও নৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন।

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ অত্যন্ত সময়োপযোগী। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার, কিন্তু আজ তা মুনাফা অর্জনের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হয়েছে। বইটিতে দেখা যায়, কীভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করছে।লেখকের মতে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞানার্জনের চেয়ে ডিগ্রি অর্জনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। বাজারের চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শিক্ষাব্যবস্থা নৈতিক মূল্যবোধ বা চারিত্রিক গঠনের দিকে নজর দিচ্ছে না। এর ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কেবল ভালো চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে, যা তাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্যকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। কোচিং বাণিজ্য, প্রাইভেট টিউশন এবং উচ্চ ফি’র কারণে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বাণিজ্যিকীকরণের নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে লেখক মেধাপাচার বা ‘ব্রেইন ড্রেন’-এর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষাকে কেবল পেশাগত দক্ষতা অর্জনের হাতিয়ার না বানিয়ে একে নৈতিক ও মানবিক উৎকর্ষের মাধ্যম করে গড়ে তুলতে হবে।

লেখক যুবসমাজকে একটি জাতির প্রাণশক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা ইন্টারনেটের কল্যাণে গ্লোবাল কানেকশনের আওতায় থাকলেও, তারা বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। এর পেছনে লেখক বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন: সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার।গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে লেখক দেখিয়েছেন যে, বিশ্বজুড়ে যুবসমাজের একটি বড় অংশ মাদকাসক্তি ও অপরাধপ্রবণতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, অস্থিরতা এবং প্রতিযোগিতার চাপের মুখে তারা আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে। তবে বইটি কেবল এই সমস্যাগুলোর বয়ান নয়, বরং যুবসমাজকে কীভাবে সম্ভাবনার পথে আনা যায়, তারও দিকনির্দেশনা দেয়। ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণদের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের এই বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব বলে লেখক মত প্রকাশ করেছেন। যুবসমাজ যদি তাদের তারুণ্য ও উদ্ভাবনী শক্তিকে সঠিক পথে ব্যয় করতে পারে, তবে তারাই হতে পারে আধুনিক সমাজের প্রধান চালিকাশক্তি।

পুরো বইটি জুড়ে লেখকের মূল বার্তা হলো সংকট কেবল সমস্যা নয়, এটি উত্তরণের একটি নতুন সুযোগ। লেখক সমাধানের পথ হিসেবে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলেছেন:
পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোকে নৈতিক শিক্ষার মূল উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শৈশব থেকেই শিশুদের মানবিক মূল্যবোধের পাঠ দিতে হবে।
রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আদর্শিক রাজনীতি ও জনসেবা ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা করা যাবে না।
শিক্ষাকে পণ্য না বানিয়ে একে সেবামূলক এবং জ্ঞানভিত্তিক করতে হবে। দরিদ্র মেধাবীদের জন্য সরকারি সহায়তা ও বৃত্তির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
যুবসমাজকে গঠনমূলক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে ডিজিটাল লিটারেসি বা সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

শাহ লাভলী রহমান রচিত ‘নতুন সহস্রাব্দের সংকট’ বইটি কেবল একটি প্রবন্ধ সংকলন নয়, এটি একটি সচেতন নাগরিকের আর্তনাদ ও দিকনির্দেশনা। তিনি সমাজকে এক নতুন চোখে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সমষ্টির কল্যাণ বড়। বইটির ভাষা সহজ ও সাবলীল, কিন্তু এর গভীরতা অত্যন্ত প্রগাঢ়। বর্তমান সময়ের পাঠক যারা সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে সচেতন তাদের জন্য এই বইটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পাঠ। লেখক আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, যদি আমরা এখনই এই নৈতিক ও সামাজিক সংকটগুলো নিরসনে সচেষ্ট না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। একটি সুন্দর, শান্তিময় ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বইটির প্রতিটি পাতা এক একটি আলোকবর্তিকা হয়ে পাঠকের সামনে উপস্থিত হয়।

কাজল রশীদ: কবি, প্রকাশক এবং সম্পাদক

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh