আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন দেখাতে জাতিসংঘে নতুন মানচিত্রের অনুমোদন

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩:২৫ অপরাহ্ণ


আফ্রিকার আকারকে আরও সঠিকভাবে তুলে ধরে—এমন এক মানচিত্র দিয়ে প্রচলিত বিশ্ব মানচিত্রকে প্রতিস্থাপনের পক্ষে ভোট দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।

টোগোর আনা এ প্রস্তাবে সমর্থন দেয় আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) সদস্যরা। ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাবটি পাস হয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ ১৬৪টি দেশের ভোটে। একমাত্র দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

জাতিসংঘের এ ভোট বাধ্যতামূলক নয়। তবে এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত মানচিত্রে পরিবর্তন আসবে।

বিবিসি লিখেছে, ১৬ শতক থেকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে আসা মারকেটর মানচিত্রটি সমালোচনার মুখে পড়ে। কারণ এতে আফ্রিকাকে প্রায় গ্রিনল্যান্ডের সমান আকারের দেখানো হয়, যদিও আফ্রিকার আকার গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে ১৪ গুণ বড়। সমালোচকদের ভাষ্য, এর ফলে বিষুবরেখার কাছাকাছি দেশগুলোর উন্নয়নগত প্রয়োজন এবং সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখা হয়।

মারকেটর মানচিত্রটি ১৫৬৯ সালে তৈরি করেছিলেন ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর। এর উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের বিশ্বজুড়ে চলাচলে পথনির্দেশ দেওয়া।

মানচিত্রটির ত্রুটির কারণ হলো, ত্রিমাত্রিক পৃথিবীর পৃষ্ঠকে দ্বিমাত্রিক মানচিত্রে পুরোপুরি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা অসম্ভব।

যখনই বিশ্বের একটি মানচিত্র আঁকা হয়, তখন কিছু না কিছু বিষয়ে আপস করতে হয়।

মারকেটর মানচিত্রে পৃথিবীর বক্রতা দেখাতে গিয়ে বিষুবরেখার কাছাকাছি দেশগুলোকে প্রকৃত আকারের চেয়ে ছোট এবং মেরুর কাছাকাছি দেশগুলোকে বড় দেখানো হয়।

এটি সংশোধনের প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ সমান-আয়তনের একটি মানচিত্র তৈরি করেন, যেটিকে তারা ‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন’ নামে বর্ণনা করেন।

বিবিসি লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারিতেই আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৪টি সদস্য রাষ্ট্র নতুন মানচিত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে।

ভোটগ্রহণের ঠিক আগে টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসেই বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “ন্যায়সঙ্গত মানচিত্র দিয়েই ন্যায়সঙ্গত বিশ্বের সূচনা হয়।”

এর আগে জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “মানচিত্র কখনোই নিরপেক্ষ হয় না; এটি মানুষের চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে দেয় এবং বিশ্বে কোনো জাতির অবস্থান কীভাবে দেখা হবে তা নির্ধারণ করে।”

ক্যাম্পেইন সংস্থা ‘আফ্রিকা নো ফিল্টার’-এর কর্মকর্তা লে রাতো মোগোআতলে বিবিসিকে বলেন, “বিশ্ব মানচিত্রে আফ্রিকাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা কেবল ভৌগোলিক কোনও ভুল নয়, এটি মূলত একটি দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়।”

তিনি বলেন, আফ্রিকা সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দীর্ঘস্থায়ী অপতথ্য ও বিভ্রান্তির ইতিহাস বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ।

কেনীয় ভূগোলবিদ কিওকো মুয়েন্দো বলেন, মারকেটর প্রজেকশনের কারণে এতদিন আফ্রিকা মহাদেশের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, জনসংখ্যা এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে পরোক্ষভাবে খাটো করে দেখা হয়েছে।

তিনি বলেন, মানচিত্র কেবল পর্যটকদের নির্দেশিকা নয়, এটি কোনো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরি করে।

প্রস্তাবের সমর্থক ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোট বলেন, তার মন্ত্রণালয় আর পুরোনো মারকেটর মানচিত্র ব্যবহার করবে না।

“মানচিত্র বদলালেই পৃথিবী বদলে যায় না। তবে একটি বিকৃত রূপ সংশোধন করাও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বড় পদক্ষেপ।”

অন্যদিকে প্রস্তাবটির তীব্র সমালোচনা করে জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ বলেন, এই প্রস্তাব সাধারণ পরিষদের মূল উদ্দেশ্যকেই উপহাস করেছে।

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক শান্তি, সমৃদ্ধি বা সুসম্পর্কের মতো প্রকৃত সমস্যাগুলোতে নজর না দিয়ে এই সংস্থা ১৬ শতকের মানচিত্র প্রকল্প এবং ঐতিহাসিক ক্ষতিপূরণ ও ‘বোধগত ন্যায়বিচার’ প্রচারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক করছে।”

গত মার্চ মাসে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবে আন্তঃআটলান্টিক দাস বাণিজ্যকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে ঘোষণা করা হলে তখনও সমালোচনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh