থামছে না শ্রমিকদের বিক্ষোভ, পোশাক শিল্পের পরিস্থিতি কোন দিকে?

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ


ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধিসহ বেশ কয়েকটি যৌক্তিক দাবিতে গত কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় সোমবারও (২ নভেম্বর) দিনভর ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। এ সময় কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এছাড়া বেশ কয়েকটি জায়গায় যানবাহন ভাঙচুর, পুলিশের গাড়িসহ বিভিন্ন পরিবহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এদিনও ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক শ পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। যদিও এখনো পর্যন্ত পোশাকশ্রমিকদের এই বিক্ষোভ বন্ধ করা যায়নি। বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটকের ঘটনাও ঘটেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার সচিবালয়ে পোশাক মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্র ও শ্রমমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। বৈঠক শেষে শ্রমিক নেতাদের কেউ কেউ এমন দাবিও করেছেন, এই আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে বাইরে থেকে।

সোমবার পোশাক কারখানার মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পোশাকশ্রমিকদের এই বিক্ষোভের পেছনে কিছু শিল্পমালিক ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি-প্রতিমন্ত্রীও জড়িত।

এর আগে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে গত রোববার (১ নভেম্বর) মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। রোববার রাতেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা দেন।

বিক্ষোভ থেকে সরে আসতে সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানানোর পরও পরিস্থিতি একটুও স্বাভাবিক হয়নি। বরং রোববারের মতো সোমবারও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে।

গত রোববারের বিক্ষোভের জের ধরে সোমবার সকাল থেকেই ঢাকার মিরপুর এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের কড়া অবস্থান দেখা যায়। মিরপুর-১০, পল্লবী, কাফরুলসহ বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট দলে জড়ো হয়ে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় অনেক পোশাকশ্রমিককে।

সকাল সোয়া ৯টার দিকে শ্রমিকরা মিরপুর-১০ এলাকায় সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। শ্রমিকরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ছোড়ে পুলিশ।

এই বিক্ষোভ চলাকালে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে সেখান থেকে আটক করা হয়। সকাল সোয়া ৯টার দিকে মিরপুর-১১ ও ১২ এলাকায় পোশাকশ্রমিকরা রাস্তায় জড়ো হলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পোশাকশ্রমিকদের এই আন্দোলনের প্রতিবাদে মিরপুরের রাস্তায় মিছিল করতে দেখা যায় ক্ষমতাসীন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মহিদুল ইসলাম এ সময় জানান, রোববার মিরপুরের বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচটি মামলা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সোমবার পর্যন্ত অন্তত ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে।

এদিন ঢাকার বাইরে গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে সকাল থেকে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবিও মোতায়েন করা হয় গাজীপুরে।

এ সময় শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেলে গাজীপুর শিল্প পুলিশের সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, সকাল থেকে বিক্ষোভ চললেও বিকেল নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।

এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার পার্শ্ববর্তী নারায়ণঞ্জেও। সোমবার দুপুরে পোশাকশ্রমিকরা রাস্তায় বেরিয়ে এসে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে শিবু মার্কেট এলাকায় সড়কে অবস্থান নেন। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়। প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধের পর পুলিশ শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল শুরু হয়।

এদিন আশুলিয়ায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

ঢাকার মিরপুর-১১ এলাকায় পাশাপাশি কয়েকটি পোশাক কারাখানা। সকাল তখন সাড়ে নয়টা। প্রতিটি কারখানার মূল ফটকে তালা। কারখানার বাইরে ছুটির নোটিশ টাঙিয়ে লেখা হয়, ‘আজ ২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে অনিবার্য কারণবশত ফ্যাক্টরি ছুটি ঘোষণা করা হলো’।

এমন কয়েকটি কারখানার ফটকে যাঁরা দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, রোববারের সহিংসতার পর সোমবার কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

মিরপুর এলাকায় এসব কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হলেও কয়েকটি কারখানার আশপাশে সকালের দিকে শ্রমিকদের জড়ো হতে দেখা যায়। যদিও পুলিশের টহল ও ক্ষমতাসীন বিএনপি-অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের রাস্তায় প্রতিবাদ ও মিছিলের কারণে পরে তাঁদের অনেককেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে দেখা যায়।

মিরপুর, পল্লবী ও কাফরুল এলাকার অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলেও কল্যাণপুর এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানা চালু অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে অনেকটাই স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

সকাল থেকে মিরপুর এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় পুলিশকে বেশ তৎপর দেখা যায়। এ সময় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মহিদুল ইসলাম এ সময় সাংবাদিকদের জানান, পোশাক কারখানায় যাঁরা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছেন, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি জানান, রোববার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত অন্তত ২৯ জনকে আটক করেছেন তাঁরা।

পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গাজীপুর অঞ্চলেও দেড় শটির মতো কারখানা সোমবার ছুটি দেওয়া হয়।

রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠকের পর সোমবার সকালে সচিবালয়ে পোশাক কারখানা মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ আরও কয়েকজন।

বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেসব শিল্পমালিকের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, যাঁরা নিষিদ্ধ সংগঠনের হয়তো কোনো কোনো সময় কেউ এমপি বা কেউ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, সে সমস্ত শিল্পমালিক এই অস্থিরতার পেছনে কাজ করছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে এবং সেটার প্রমাণও আছে।’

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠনের আলোচনার মধ্যে এমন অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা যাঁরা করছেন, তাঁদের পেছনে যাঁরা ইন্ধন দিচ্ছেন, তাঁরা চিহ্নিত হয়েছেন বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যাঁরা শ্রমিক আন্দোলনের নামে স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির কাজে লিপ্ত, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর দুপুরে আবারও সরকারের এই প্রতিনিধিদল বৈঠক করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে।

বৈঠক শেষে শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্রিফিং করেন শ্রমিক নেতা ও মজুরি বোর্ডের সদস্য বাবুল আখতার। তিনি দাবি করেন, শ্রমিক নামধারী অনেকে বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছেন। তাঁদের ইন্ধনেই শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন।

বাবুল আখতার আহ্বান জানান, ‘শ্রমিক ভাইদের বলছি, সবাই কাজে ফেরেন। কারও প্ররোচনায় পা দেবেন না। বিপদে পড়লে শ্রমিক ফেডারেশনকে পাশে পাবেন না।’

এই বৈঠকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পোশাক কারখানাগুলোতে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় এই আন্দোলন সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সেই সুযোগ নিচ্ছে তৃতীয় পক্ষ। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh