প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী, ঝুঁকিতে ব্যাংক ও অর্থনীতি: বিশ্বব্যাংক

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ৪:০২ অপরাহ্ণ


বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ (অক্টোবর ২০২৬) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর ও বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতি, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আগামী দিনের সংস্কারের রূপরেখা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.৮ শতাংশ থাকলেও, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৩.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রবৃদ্ধি কমার মূল কারণ হলো বিনিয়োগে ভয়াবহ মন্দা। এ সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ ০.৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০.৭ শতাংশ কমেছে, যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানিও ৪.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

বিনিয়োগ সংকোচনের পাশাপাশি দেশের শিল্প খাত তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ঘাটতির ফলে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে চলছে, কর্মঘণ্টা কমানো হয়েছে কিংবা বাধ্য হয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এর ফলে গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০.৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, যা করোনা মহামারির পর প্রথম।

অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও হুমকির মুখে। যদিও সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বিন্দুমাত্র কমেনি। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৬.৭ শতাংশ বাড়ায় শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমে গেছে এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে দারিদ্র্য সীমার ওপর। এক বছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে এবং গত অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার আনুমানিক ২২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

অর্থনীতির এই স্থবিরতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে দেশের ব্যাংক খাত। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩.২ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে এই হার ৫৮.৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৪৩.২ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হারও ঋণাত্মক হয়ে গেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বারবার ছাড় দেওয়া ও তারল্য সহায়তা প্রদান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সরকারি খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও গভীর সংকটে রয়েছে। রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় না পৌঁছানো এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। প্রথম ১১ মাসেই সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১.৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত করে দিচ্ছে। পাশাপাশি সরকার সামাজিক সুরক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও প্রকৃত দরিদ্ররা এর পুরোপুরি সুফল পাচ্ছে না, ফলে বৈষম্য আরও বাড়ছে।

আগামী দুই বছরও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ থেকে ৩.৯ শতাংশের মধ্যেই সীমিত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট উত্তরণে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কর ফাঁকি রোধ ও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে রাজস্ব ও সুশাসনে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh