সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে গত ২৯ অগাস্ট ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দেওয়ায় অটোরিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিবির দাবি, গ্রেপ্তার খোকন ও রাজীব মাতব্বরই ওই ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। ঘটনার সময় রাজীব মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন এবং খোকন পেছনে বসে রনজিলার ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেন।
অথচ একই ঘটনায় গত ৩০ অগাস্ট তৎকালীন র্যাব-২ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। রাকিব হোসেন, পনি গাজী ও সেড্রিক জুলিয়ান নামে ওই তিনজনকেই রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তখন র্যাবের দাবি ছিল, রাকিব ওই মোটরসাইকেলের মালিক এবং বাকি দুজন তার সঙ্গে ছিলেন।
তবে ওই আসামিরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। এমনকি র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেল ও ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহার করা মোটরসাইকেল এক কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়।
এখন ডিবি বলছে, ওই ছিনতাইয়ে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তাররা জড়িত ছিলেন না। বরং তাদের হাতে গ্রেপ্তার দুইজন ও র্যাবের হাতে গ্রেপ্তারকৃতরা ভিন্ন দুটি গ্রুপ। এমনকি র্যাব যে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছিল, সেটিও ওই ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হয়নি।
র্যাব বিলুপ্ত হয়ে বর্তমানে এসআরবি নাম ধারণ করা বাহিনীটি এখন স্বীকার করছে, ডিবি যাদের ধরেছে তারাই প্রকৃত আসামি। তবে এ বিষয়ে আরও তদন্ত হবে।
রনজিলা পারভীন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। গত ২৯ অগাস্ট চোখের ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে স্বামী আবদুল মতিনের সঙ্গে ভোরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেইট সংলগ্ন পাকা রাস্তায় অটোরিকশা করে যাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তার হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয়।
ছিনতাইকারীর টানে রনজিলা চলন্ত রিকশা থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। পরে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী আবদুল মতিন ৩০ অগাস্ট শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।
ঘটনার ১৮ দিন পর ডিবি এর সঙ্গে জড়িত দাবি করে নতুন দুইজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানাল। ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনার পর সিসিটিভি ভিডিও পর্যালোচনা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছিনতাইকারীদের শনাক্তের চেষ্টা শুরু হয়।
“পরে ঢাকা ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে খোকন ও রাজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে খোকনকে মিরপুরের মনিপুর পশ্চিমপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার গ্রামের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার গজারিয়া এলাকায়।”
ডিবির ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসে রনজিলার ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। খোকনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর থানার বড়বাগ এলাকা থেকে রনজিলার ছিনতাই হওয়া ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ওই ব্যাগে রনজিলার ব্যবহৃত পোশাক, বাসের টিকিটের অংশ, চশমার বাক্স ও কিছু ওষুধ ছিল। পরে মিরপুর-১ এলাকা থেকে রনজিলার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়।
এরপর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে রাজীব মাতব্বরকে বিরুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির দাবি, ঘটনার সময় রাজীবই মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন।
রাজীবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। তার কাছ থেকে ৬২২টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে ডিবি।
ডিবি প্রধানের ভাষ্য, “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ ৮টি মামলা রয়েছে। খোকনের বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি মামলা আছে।
এদিকে একই ঘটনায় র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা তিনজনের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, “র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। র্যাব যে ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করেছিল, তাদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা ছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, তারা রনজিলা হত্যার ঘটনায় জড়িত নন। সিসিটিভি ভিডিও এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে খোকন ও রাজীবই এই ছিনতাইয়ে জড়িত ছিল বলে শনাক্ত করা হয়েছে।”
ডিবির দাবি, সিসিটিভি ভিডিওতে ঘটনার সময় মোটরসাইকেলে দুজনকে দেখা গেছে। রাজীব মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন এবং খোকন পেছনে ছিলেন। ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি রাজীবের নিজের। এটি ভাড়া করা হয়নি। মোটরসাইকেলের পাশাপাশি খোকনের পরনের শার্ট, হাতে থাকা ঘড়ি ও মাথার ক্যাপও উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের বিষয়ে ডিবি প্রধান বলেন, “র্যাব তখন ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল। তবে সিসিটিভি ভিডিওর সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখার পর পার্থক্য পাওয়া যায়। ভিডিওতে যে মোটরসাইকেল দেখা গেছে, সেটির রং এবং র্যাব যে মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছিল তার রং ভিন্ন।”
র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে খোকন ও রাজীবের যোগাযোগ আছে কি না, প্রশ্নে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, “তদন্তে তাদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া দুজন পশ্চিম মনিপুর এলাকায় থাকেন। আর র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা তেজতুরীপাড়া এলাকার। এরা দুটি ভিন্ন গ্রুপ।”
সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না যাওয়ায় আগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের এই মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে তথ্য দেন শফিকুল ইসলাম। তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা থাকলে সেসব মামলায় আইনি প্রক্রিয়া চলবে বলেও জানান তিনি।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, রনজিলার স্বামী ঘটনার সময় ছিনতাইকারীকে এক ঝলক দেখেছিলেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তার মনে থাকা সেই চেহারার বর্ণনা তদন্তকারীদের জানান এবং মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা খোকনকে তিনি শনাক্ত করেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, “রনজিলার ব্যাগ, মোবাইল ফোন, পরনের পোশাক, ওষুধ ও টিকিটের অংশসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত ভিডিওর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে আপনারাও বিষয়টি বুঝতে পারবেন।”
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘রনজিলার ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে যে মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটির মালিক রাজীব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব বলেছেন, মোটরসাইকেলটি তার নিজের এবং বিভিন্ন সময়ে ছিনতাই করে পাওয়া টাকা দিয়ে তিনি সেটি কিনেছেন।’’
“এ ধরনের সাধারণ অপরাধীর কাছে ২৫০ সিসির বাইক, এটা ভাবা যায় না। তারা যদি এই বাইক দিয়ে ছিনতাই করে টান দিয়ে পালায়, তাদের তাৎক্ষণিক ধরবে এমন সাধ্য কার আছে? মোটরসাইকেলটি কীভাবে কেনা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে ছিনতাইয়ের অর্থের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা তদন্তে আরও যাচাই করা হচ্ছে।”
সার্বিক বিষয়ে এসআরবি-২ এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড স্কোয়াড্রন লিডার নিফাজ রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা আগেই বলেছি, এই তিনজনকে (পনি, রাকিব ও সেড্রিক) সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ধরা হয়েছে। যা কিছু করা হয়েছে, আইনের মধ্যে থেকেই করা হয়েছে। এগুলো তদন্তেরই প্রক্রিয়া।
“ডিবি থেকেও বলা হয়েছে, তারা যাদের গ্রেপ্তার করেছে তাদের বিষয়ে আমাদের গ্রেপ্তার করা আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এই ধরনের ঘটনায় তদন্ত প্রক্রিয়াটাই এমন। আমরা তাদের সন্দেহভাজন হিসেবে ধরেছি, রিমান্ডে নিয়েছি এবং তারা এখন জেলে আছে। এসব না করলে ডিবি প্রয়োজনীয় তথ্য পেত না। আমার মনে হয়, ডিবি যাদের ধরেছে, তারাই প্রকৃত আসামি। তবে এ বিষয়ে আরও তদন্ত হবে। এরপরই বিস্তারিত জানা যাবে।”
র্যাব ও ডিবির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই দাবি করে তিনি বলেন, “বাহিনী হিসেবে কারও সঙ্গে আমাদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমরা আমাদের কাজ করেছি, তারা তাদের কাজ করেছে। আমরা কেউই চাই না, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি পাক। আমাদের এ ধরনের কোনো ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য ছিল না।”
অপরাধ না করেও রিমান্ড ও কারাগারে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার তিনজনের স্বজনরা।
র্যাবের দাবি অনুযায়ী, মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিব হোসেন ওরফে রাকিব বেপারির স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “এখন তো প্রমাণ হয়েই গেল প্রকৃত আসামি কে। আমরা চাই, অপরাধ না করেও যারা গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গেল, রিমান্ড খাটল, এটার কী হবে? এই হেনস্তার প্রতিকার কী?”
একই প্রতিক্রিয়া দিয়ে পনি গাজীর বড় ভাই রনি গাজী বলেন, “ঘটনায় জড়িত না হয়েও আমার ভাইসহ যাদের গ্রেপ্তার করা হল এবং আমাদের হেনস্তা করল র্যাব। আমরা র্যাবের সেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব।”