জ্বালানি ও পে-স্কেলে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ঝুঁকিতে: বাংলাদেশ ব্যাংক

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৮ অপরাহ্ণ

চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কারণে মূল্যস্ফীতির লক্ষমাত্রা অর্জন ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করে এই পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়।

বৈঠকের কার্যবিবরণী নিয়ে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি (হেডলাইন ইনফ্লেশন) নিম্নমুখী ধারায় থাকলেও তা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনও উপরে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি তাদের পর্যালোচনায় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেছে, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এখনও বেশ অস্থিতিশীল।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে মনে করছে, এই পদক্ষেপগুলো মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সরকার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। নতুন দামে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপও বেড়েছে। দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামের কারণে সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল বলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

এবারের মূল্যবৃদ্ধির আগে এপ্রিল ও জুনেও দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এরপর জুলাই ও আগস্টে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতেও দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। ফলে সেপ্টেম্বরের ২০ টাকার বৃদ্ধি এ বছরের তৃতীয় দফা বড় ধরনের মূল্য সমন্বয়।

এদিকে ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো।

নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বেড়েছে।

তবে নতুন বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ম গ্রেড ও তার ওপরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ পাবেন। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ হার যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ হবে। ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণ হারে নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে।

এমন এক সময়ে এ দুটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন সাধারণ মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৮ শতাংশের উপরে।

পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে অগাস্টে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। তার আগে জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির এই হার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার অনেকটা বেশি।

নীতি সুদহারে আপাতত পরিবর্তন নয়

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ এসব প্রভাবক দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুদ্রানীতি কমিটি।

বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি এবং ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) বা মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব কতটুকু পড়ে, তা আগে মূল্যায়ন করতে চায় তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পরই বর্তমান নীতি সুদহারে (পলিসি রেট) পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ, আপাতত নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক বছর ধরে নীতি সুদহার বাড়িয়ে আসার পর চলতি বছরের জুলাইয়ে তা কমানোর পথে যায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ৩০ জুলাইয়ের মুদ্রানীতি কমিটির সভায় নীতি বা রেপো সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়। নতুন হার ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।

এর আগে ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ধারাবাহিকভাবে বাড়াতে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠার পরও কঠোর মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে নীতি সুদহার বাড়ানো অব্যাহত ছিল। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তা ১০ শতাংশে ওঠে এবং প্রায় দুই বছর ওই পর্যায়ে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে এই সভায় মুদ্রানীতি কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারপারসন ফেরদৌসী নাহার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ।

এছাড়া মুদ্রানীতি কমিটির সদস্য সচিব ও মুদ্রানীতি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম সরকারও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh