কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রগানের গীতি-আলেখ্য পরিবেশিত

পীতম সেনগুপ্ত,

  • প্রকাশিত: ২ নভেম্বর ২০২৬, ৫:৫৯ অপরাহ্ণ

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইউরোপ ভ্রমণের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশিত হয়েছে বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে’। কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাধীনতা ট্রাস্ট ইউকে ও গীতবীণার যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট সেন্টারের প্রেক্ষাগৃহে এ গীতি-আলেখ্য অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আয়োজকদের পক্ষে স্বাগত বক্তব্য দেন গীতবীণার প্রধান উপদেষ্টা বাতিরুল হক সরদার। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালেস্টার ওয়েনস। এরপর স্বাধীনতা ট্রাস্টের সদস্য ভ্যালেন্টাইন হার্ডিং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে পাঠ করেন।

গীতবীণার নিবেদনে পরিবেশিত গীতি-আলেখ্যটির মূল ভাবনা, গবেষণা ও ধারাবর্ণনায় ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক, লেখক ও প্রাবন্ধিক পীতম সেনগুপ্ত। সংগীত পরিবেশন করেন রুমি হক, মিতালী বনোয়ারি ও সুনীতা চৌধুরী। নির্ধারিত চারটি রবীন্দ্রসংগীতভিত্তিক মূল রাগাংশ পরিবেশন করেন বুধাদিত্য ভট্টাচার্য। তবলা সংগত করেন সন্দীপ চক্রবর্তী এবং সংগীত পরিচালনায় ছিলেন ড. শ্যামল চৌধুরী।

গীতি-আলেখ্য শেষে স্বাধীনতা ট্রাস্টের পরিচালক ড. আনসার আহমেদ উল্লাহ উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে গীতবীণার পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ট্রাস্টের চেয়ারপারসন জামিল আহমেদ, সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক ড. শ্যামল চৌধুরী এবং পীতম সেনগুপ্তকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের ১৯২৬ সালের ইউরোপ সফর ও গানের নতুন অধ্যায়

গীতি-আলেখ্যে তুলে ধরা হয় ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইউরোপ সফরের নানা ঘটনা, সে সময়ের বিতর্ক এবং সফরকালে রচিত তাঁর গানগুলোর পেছনের প্রেক্ষাপট।

১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথের ইউরোপ সফরকে ঘিরে দেশে-বিদেশে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ইতালিতে ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিতো মুসোলিনির আতিথেয়তা গ্রহণ এবং সেখানে কয়েকটি বক্তৃতা দেওয়ার পর ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বুদ্ধিজীবী মহলে কবির মানবতাবাদী ভাবমূর্তি নিয়ে সমালোচনা দেখা দেয়। ইতালির রাজনীতি ও ভাষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় সফরের প্রথম পর্যায়ে তিনি নানা সমালোচনার মুখোমুখি হন। এসব ঘটনার অভিঘাত তাঁর মনেও অস্থিরতা তৈরি করেছিল।

তবে সেই সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সৃজনশীল অর্জন ছিল তাঁর গান। ১৯২৬ সালের ১২ মে শান্তিনিকেতন থেকে সপরিবারে নবমবারের মতো বিদেশ সফরে যাত্রা করেন কবি। সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে ইতালি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন তিনি।

সফরের শুরুতে এপ্রিলের শেষ দিনে ‘এ পারে মুখর হল কেকা ওই’ গানটি লেখার পর প্রায় চার মাস তাঁর হাতে নতুন কোনো গান রচিত হয়নি। পরে সেপ্টেম্বর মাসে ইউরোপ সফরের মাঝামাঝি সময়ে আবার গানের স্রোত ফিরে আসে। ৮ সেপ্টেম্বর কোপেনহেগেন থেকে হামবুর্গের উদ্দেশে ট্রেনে যাত্রাকালে বাল্টিক সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় তিনি রচনা করেন ‘যায় চলে ওই-একলা রাতে’ এবং ‘সে কোন্ পাগল যায়, যায় পথে তোর’ গান। সুর ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায় পথসঙ্গী রানী মহলানবিশকে পাশের কামরা থেকে ডেকে এনে সুরটি শিখিয়ে দিয়েছিলেন কবি।

‘বাঁধন-ছেঁড়ার মহোৎসবে / গান যে ওরে গাইতে হবে’—এমন মুক্তির আহ্বান যেন ওই সময়ের গানগুলোতে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর হামবুর্গের আটলান্টিক হোটেলে বসে তিনি লেখেন ‘তোর পরানে কোন্ পরশমণির খেলা’ গানটি।

এরপর জার্মানির বিভিন্ন শহরে অবস্থানকালে একের পর এক গান রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। মিউনিখে রচিত হয় ‘ছুটির বাঁশি বাজল যে ঐ নীল গগনে’, ‘আকাশ কোন্ রূপে মন চিনতে পারে’, ‘তোর ভিতরে জাগিয়া কে যে’ এবং ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়’। এসব গানে মুক্তি, আত্মঅনুসন্ধান ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।

১৮ সেপ্টেম্বর মিউনিখ থেকে ন্যুর্নবার্গে যাওয়ার পর কবি রচনা করেন ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’। মিশ্র কেদারা রাগে বাঁধা এ গানে ব্যক্তিগত মুক্তির পাশাপাশি সর্বজনীন মুক্তির ভাবনাও প্রকাশিত হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর ন্যুর্নবার্গ ছাড়ার আগে রচিত হয় বিদায়বেদনার গান। পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর স্টুটগার্টে অবস্থানকালে নিরোদবাসিনী দেবীর প্রয়াণতিথি উপলক্ষে উপাসনায় বসেন কবি। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ও রানী মহলানবিশকে সঙ্গে নিয়ে উপাসনার পর দিনশেষে তিনি রচনা করেন ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই, প্রহর হল শেষ’ গানটি।

গীতি-আলেখ্যে পীতম সেনগুপ্ত রবীন্দ্রনাথের ওই সফরের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে গানগুলোর রচনাকাল, সুর, রাগ ও অন্তর্নিহিত ভাবনার যোগসূত্র তুলে ধরেন। তাঁর উপস্থাপনায় উঠে আসে, ইউরোপ সফরের রাজনৈতিক ও মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ কীভাবে সংগীতের আশ্রয়ে নিজের অন্তর্জগতের মুক্তি ও প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh