ঘাস চাষ শিখতে বিদেশে যাবেন ৩২ কর্মকর্তা!

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০২০, ১০:১২ পূর্বাহ্ণ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ ব্যবস্থাপনা তো বটেই, ভবন নির্মাণ শেখার জন্যও প্রকল্পের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের তথ্য ক’দিন আগেই ছিল ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। নানা আলোচনা-সমালোচনায় ‘মিড ডে মিল’ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি নতুন করে সাজাতে বলা হয়েছে। ভবন নির্মাণের প্রকল্পটি অবশ্য বহাল রয়েছে। তবে এবারে অনুসন্ধানে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যেখানে ‘উন্নত জাতের ঘাস’ উৎপাদন শিখতে ৩২ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরে যেতে হবে। মোট প্রকল্পের তিন শতাংশের কিছু বেশি হলেও টাকার অঙ্কে এসব কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের খরচটা নেহায়েত কম নয়— মাথাপিছু ১০ লাখ টাকা হিসেবে তিন কোটি ২০ লাখ টাকা!

মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা তো বটেই, পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও বলছেন, এই সফরের প্রয়োজন রয়েছে। তবে তাদের এমন অভিমতের সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। তারা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের অধীন এই প্রকল্পের শিরোনাম ‘প্রাণিপুষ্টির উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাসের চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর’। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১০১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটি আগামী মঙ্গলবারের (২৪ নভেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে সাভারে কেন্দ্রীয় গোপ্রজনন ও দুগ্ধ খামারে স্থায়ী জার্মপ্লাজম নার্সারি স্থাপন। এছাড়া খামারি পর্যায়ে ৮ হাজার ৯৭০টি উচ্চ উৎপাদনশীল উন্নত জাতের স্থায়ী বা অস্থায়ী ঘাসের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হবে। উন্নত জাতের এই ঘাস উৎপাদন বিষয়ে অভিজ্ঞতা নিতেই কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের সংস্থান রাখা হয়েছে প্রকল্পে।

একনেকে উত্থাপনের জন্য তৈরি প্রকল্পের সার-সংক্ষেপ পর্যালোনা করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে এ ধরনের একটি প্রকল্প ছোট আকারে বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্প এলাকাগুলোতে কৃষকদের মধ্যে ঘাস চাষে ব্যাপক সাড়াও পাওয়া যায়। সেই প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বর্তমান প্রকল্পটি প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটি সম্প্রসারণধর্মী হওয়ায় এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। যদিও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ২৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেই সে প্রকল্পে সম্ভাব্যতা যাচাই আবশ্যক। তবে এই প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন থেকে এ প্রসঙ্গে কিছু বলা হয়নি।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর গত ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভায় বলা হয়, ঘাস চাষ যেন প্রচলিত খাদ্যশস্য চাষে ব্যাঘাত না ঘটায়, সে বিষয়ে লক্ষ রেখেই কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। এছাড়া ধানসহ অন্যান্য প্রচলিত খাদ্যশস্যের তুলনায় ঘাস চাষ লাভজনক কি না, তার হিসাব ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) যুক্ত করতে হবে। তবে বিদেশ সফর নিয়ে পিইসি সভায় তেমন কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে, প্রকল্পটি প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও বিদেশ সফরের প্রস্তাবনায় যে ৩২ জনের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে এই অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সংখ্যা হবে খুবই কম। অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবদুল জব্বার শিকদার বলেন, প্রকল্পে যে ৩২ কর্মকর্তার বিদেশ সফরের কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পাঁচ জন কর্মকর্তা থাকতে পারেন। পরিকল্পনা কমিশন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা থাকবেন বাকিদের মধ্যে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) জাকির হোসেন আকন্দ বলেন, এসব ঘাস সাধারণ ঘাস হয়। অনেক বেশি পুষ্টিসম্পন্ন ঘাস উৎপাদন করা হবে। এই ঘাস অল্প পরিমাণে খেলেও বেশি পুষ্টি পাবে গাবাদি পশু। তাছাড়া বিদেশ সফরের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা সাইলেজ প্রযুক্তি যেমন এ দেশে এখনো শুরুই হয়নি। এই প্রযুক্তিতে মূলত ইউরোপের দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে মাঠে ঘাস চাষ করা হয়। শীতকালে তো শুধুই বরফ পড়ে। ফলে তারা এসব ঘাস একটি বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি সাইলেজে রেখে দেয়। এতে ঘাসের পাতার সবুজ রঙ চলে গেলেও পুষ্টি ও স্বাদ সবই স্বাভাবিক থাকে। অর্থাৎ আপৎকালীন তারা গবাদি পশুকে এসব ঘাস খাওয়ায়। ফলে পশুর খাদ্য সংকট হয় না। এসব দিক বিবেচনা করেই প্রকল্পে বিদেশ সফরের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

উন্নত জাতের ঘাস দেশে উৎপাদন বিষয়ে অভিজ্ঞতা নিতে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবদুল জব্বার শিকদারও। তিনি বলেন, বিদেশ সফরের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা কিছু টেকনিক্যাল বিষয় আছে। উন্নত প্রযুক্তি ও উন্নত ঘাস চাষ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্যই কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের প্রয়োজন আছে।

অধিদফতরের মহাপরিচালক ও কমিশনের সদস্যের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, একটি প্রকল্পে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা শুধু বিদেশ ভ্রমণে ব্যয় করাটা কিন্তু কম নয়। এ ধরণের ব্যয় প্রশ্ন সাপেক্ষ। ঘাস উৎপাদন এমন কিছু নয় এটি দলবেঁধে বিদেশে গিয়ে শিখে আসতে হবে। এটা অবশ্যই রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, খামারি পর্যায়ে উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয় করার মাধ্যমে গবাদি প্রাণির পুষ্টির উন্নয়ন ঘটানো হবে এর মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় খামার পর্যায়ে প্রাণিপুষ্টি উন্নয়ন প্রযুক্তি প্রদর্শন ও দুর্যোগকালীন গো-খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সাইলেজ প্রযুক্তি গ্রহণে উদ্ধুদ্ধ করা হবে। খামারিদের প্রাণিপুষ্টি সংক্রান্ত আধুনিক পদ্ধতি ও কৌশল বিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদও উন্নয়ন করা হবে।

এই প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁচা ঘাস সংরক্ষণের জন্য ১৭ হাজার ৯৪০টি খামারে লাগসই প্রযুক্তি (সাইলেজসহ) হস্তান্তর করা হবে। অধিক প্রোটিনসমৃদ্ধ ঘাসের বীজ বিতরণ, ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স খাদ্য এবং কৃমিনাশক বিতরণ, কমিউনিটি এক্সটেনশন এজেন্ট নির্বাচন, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার মতো কার্যক্রমও রয়েছে প্রকল্পের আওতায়। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর।

প্রকল্পের আওতায় চার বছরে অডিও-ভিডিও ও চলচ্চিত্র নির্মাণে ২০ লাখ টাকা, দেশে খামারিদের প্রশিক্ষণে ২৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা, কমিউনিটি এক্সটেনশন এজেন্টদের প্রশিক্ষণে ৩২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা, দেশে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ১৯ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, খামারি প্রশিক্ষণ ও টট ম্যানুয়াল হালনাগাদ ও প্রিন্ট খাতে ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে।

  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

এই সম্পর্কিত আরও খবর...