দেলোয়ারের শখের সবজি বাগান: লন্ডনের মাটিতে বাংলাদেশের সবুজের ছোঁয়া

মো: জাহেদী ক্যারল,

  • প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬, ২:৩৩ অপরাহ্ণ

লন্ডনের ইলফোর্ডে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনুপ্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত

লন্ডনের ইলফোর্ড এলাকায় বিশাল জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে এক মনোমুগ্ধকর সবজি বাগান। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও মাটির প্রতি ভালোবাসা, শিকড়ের টান এবং দেশীয় কৃষির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এই বাগান গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখ দেলোয়ার ও তাঁর শ্বশুর, সিলেট এইডেট স্কুলের সাবেক শিক্ষক ফজলুল হক। তাঁদের দুজনের নিরলস পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও কৃষিপ্রেমে লন্ডনের মাটিতে যেন এক টুকরো বাংলাদেশের আবহ তৈরি হয়েছে।

বাগানটিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সারি সারি সবুজ গাছপালা। কোথাও লাউয়ের মাচা, কোথাও কুমড়ার লতা, কাচা মরিচ, নাগা মরিচ আবার কোথাও ঝুলছে টাটকা টমেটো। পাশাপাশি রয়েছে শিম, বরবটি, মিষ্টি কুমড়া, ব্রকলি, বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজিসহ বাংলাদেশের পরিচিত ও প্রিয় নানা জাতের তরিতরকারি। সবুজের সমারোহে পুরো জায়গাটি যেন হয়ে উঠেছে এক টুকরো গ্রামবাংলা।

দেলোয়ার ও ফজলুল হকের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে মূলত দেশীয় সবজির প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের হাতে চাষ করার আনন্দ। প্রবাসে বসবাস করলেও তাঁরা ভুলে যাননি বাংলাদেশের গ্রামের মাটি, কৃষকের ঘাম আর নিজেদের শৈশবের সেই পরিচিত সবুজ পরিবেশ। তাই অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে তাঁরা শুরু করেন শখের সবজি চাষ। ধীরে ধীরে সেই শখই রূপ নেয় বড় পরিসরের একটি সুন্দর সবজি বাগানে।

শুধু বাগান তৈরি করেই তাঁরা থেমে থাকেননি। নিয়মিত গাছের পরিচর্যা, পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, মাচা তৈরি করা এবং সময়মতো সবজি সংগ্রহ—সবকিছুতেই রয়েছে তাঁদের শ্রম ও আন্তরিকতার ছাপ। দীর্ঘদিনের যত্ন ও পরিশ্রমের ফলে এবার বাগানে হয়েছে আশাতীত ফলন। গাছগুলোতে ঝুলছে প্রচুর লাউ, কুমড়া, বরবটি, শিম ও অন্যান্য সবজি। টাটকা সবজির ভারে অনেক গাছ যেন নুয়ে পড়েছে।

এই বাগানের সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো—এর উৎপাদিত সবজি শুধু নিজেদের পরিবারের জন্যই নয়, আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের মাঝেও ভাগ করে দেন দেলোয়ার ও ফজলুল হক। নিজের হাতে উৎপাদিত টাটকা সবজি প্রিয়জনদের হাতে তুলে দিতে পারাটাকেই তাঁরা সবচেয়ে বড় আনন্দ ও তৃপ্তি হিসেবে মনে করেন। বাজার থেকে কেনা সবজির চেয়ে নিজের বাগানের সবজির স্বাদ ও আনন্দ যে একেবারেই আলাদা, তা তাঁদের কথাবার্তা ও কাজের মধ্যেই ফুটে ওঠে।

প্রবাস জীবনে অনেকেই কর্মব্যস্ততার কারণে প্রকৃতি ও মাটির কাছ থেকে দূরে সরে যান। কিন্তু দেলোয়ার ও ফজলুল হকের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, ইচ্ছা ও ভালোবাসা থাকলে লন্ডনের মতো ব্যস্ত নগরীতেও কৃষির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা সম্ভব। তাঁদের বাগান শুধু একটি সবজি ক্ষেত নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ জীবনের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক।

বাগানটি দেখতে আসা আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনেরাও এর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন। অনেকের কাছেই লন্ডনের মাটিতে বাংলাদেশের লাউ, কুমড়া, শিম, বরবটি ও অন্যান্য দেশীয় সবজি দেখে মনে পড়ে যায় গ্রামের বাড়ির কথা। সবুজ গাছপালা, টাটকা সবজির ঘ্রাণ এবং মাটির সঙ্গে মানুষের এই সম্পর্ক প্রবাসের জীবনে এনে দেয় এক অন্যরকম প্রশান্তি।

দেলোয়ারের কাছে এটি নিছক শখের বাগান হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক ভালোবাসা, স্মৃতি ও আত্মতৃপ্তি। আর তাঁর শ্বশুর ফজলুল হকের অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রম এই উদ্যোগকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই বাগান আজ তাঁদের পরিবারের আনন্দের পাশাপাশি আশপাশের মানুষের কাছেও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে লন্ডনের মাটিতে দেশীয় সবজির এমন চাষ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এটি একদিকে যেমন প্রবাসে বাংলাদেশের কৃষি ও সংস্কৃতির স্মৃতিকে ধরে রাখছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের কাছেও মাটি, প্রকৃতি ও কৃষির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

দেলোয়ার ও ফজলুল হকের এই শখের বাগান তাই শুধু সবজি উৎপাদনের জায়গা নয়—এটি দেশের প্রতি ভালোবাসা, মাটির প্রতি টান, পরিশ্রমের সৌন্দর্য এবং আপনজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক সুন্দর গল্প।

লন্ডনের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝে তাঁদের এই সবুজ উদ্যোগ যেন বলে দেয়—মানুষ যত দূরেই থাকুক, শিকড়ের টান কখনো হারিয়ে যায় না। বাংলাদেশের মাটির ভালোবাসা লন্ডনের মাটিতেও সবুজ হয়ে ফুটে উঠতে পারে।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh