শান্তি  সহমর্মিতা ও বহুসংস্কৃতিবাদের এক দীপ্তিমান প্রতীক ব্রিকলেন জামে মসজিদ

মতিয়ার চৌধুরী-লন্ডন,

  • প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৫২ অপরাহ্ণ

পূর্বলন্ডনে বাঙ্গালী মুসলমানদের ঐতিহ্যের স্মারক, ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ব্রিকলেন জামে মসজিদ, বর্ণাট্য  আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুদিন ব্যাপী  (৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬)  পালন করলো ৫০বছর পূর্তিউৎসব। পাঁচ দশকের পথচলায় এটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং লন্ডনের বহুসংস্কৃতিবাদী সমাজে শান্তি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের অতিথিদের উপস্থিতে এই আয়োজনে ছিল আনন্দর‌্যালী, মিলাদ মাহফিল, ধর্মীয় আলোচনা, পূর্বলন্ডনে বাঙ্গালীদের বসতি স্থাপন, ব্রিটেনের বহুজাজিক সমাজে বাঙালী মুসলমানদের অবদান শীর্ষক  সেমিনার।

লন্ডনের ব্যস্ততম ব্রিক লেন—প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় যেখানে মুখরিত থাকে চারপাশ। সংস্কৃতি, ভাষা, জাতি ও ধর্মের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই পথের ঠিক প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে এমন একটি ভবন, যা কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপত্য নয়। এটি স্মৃতি, সংগ্রাম, আশা এবং মানুষের হৃদয়স্পন্দনে গাথা এক অপার শান্তি ও আস্থার পবিত্র ঠিকানা—ব্রিক লেন জামে মসজিদ। এই বছর ব্রিকলেনের এই ঐতিহাসিক মসজিদটি উদযাপন করছে তার ৫০ বছরের গৌরবময় যাত্রা। পাঁচ দশকের পথচলায় এটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং লন্ডনের বহুসংস্কৃতিবাদী সমাজে শান্তি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এই ভবনটি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।  ১৭৪৩ সালে ফরাসি প্রটেস্ট্যান্ট গির্জা হিসেবে এর যাত্রা শুরু; এরপর এটি রূপান্তরিত হয় ইহুদিদের সিনাগগে, আর আজ এটি মুসলিমদের জামে মসজিদ। এই দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাস প্রমাণ করে—এই ভবনটি নির্দিষ্ট কোনো একক জাতি বা সংস্কৃতির নয়, এটি সবার। এটি সহাবস্থান, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক জীবন্ত প্রতীক।

একটি বিশ্বজনীন উপাসনালয়

ব্রিকলেন জামে মসজিদে বাংলা ভাষা শেখানো হয়, বাঙালি মুসলিমরা এখানে জামাতে নামাজ আদায় করেন এবং এই কমিউনিটির অধিকাংশই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তবে এই মসজিদ কেবল বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে না; এটি একক কোনো রাষ্ট্র বা জাতিগত পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন এক পবিত্র স্থান—যেখানে মানুষ আসে স্রষ্টার ইবাদত করতে, আত্মিক শান্তি খুঁজতে এবং একে অপরের পাশে দাঁড়াতে। বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, সোমালি, আরব, তুর্কি কিংবা ইউরোপীয়—সবাই এখানে একই কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ান। এখানে জাতীয়তা নয়, বরং মানবতাই প্রধান হয়ে ওঠে; ভাষার বাধা পেরিয়ে কথা বলে মানুষের হৃদয়।

প্রজন্মের সেতুবন্ধন

বয়স্কদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের উদ্দীপনাকে একসূত্রে বাঁধতে মসজিদ পরিচালনা পর্ষদ গড়ে তুলেছে একটি সক্রিয় ‘যুব কমিটি’। তারা কেবল মসজিদের প্রাত্যহিক সেবাই নিশ্চিত করে না, বরং মানুষের হৃদয়কে কাছাকাছি আনার সেতু হিসেবে কাজ করছে। বিভিন্ন ভাষা, পেশা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ ঘটিয়ে তারা টাওয়ার হ্যামলেটসে (Tower Hamlets) এক নতুন সামাজিক ঐক্যের শক্তি সঞ্চার করছে—যেখানে বিভাজন নয়, মিলনই মূল চালিকাশক্তি।

শিক্ষা: পরিচয় ছাড়িয়ে আত্মবিশ্বাস গড়ার কারিগর

মসজিদের বাংলা শিক্ষার ক্লাসগুলো শিশুদের কেবল একটি ভাষা শেখায় না, বরং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সামাজিক সহনশীলতা শেখায় এবং তাদের ভেতরের একাকীত্ব দূর করে। এখানকার শেখানো বাংলা কোনো ভৌগোলিক সীমানার পরিচয় নয়—এটি পরিবারের ভাষা, মায়ের ভাষা, অনুভূতির ভাষা। পাশাপাশি, ধর্মীয় শিক্ষা ও হিফজ বিভাগ শিশুদের মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখানকার শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎকে আলোকিত করা।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

মসজিদের দৃষ্টিমনোহর মিনার নির্মাণ, মূল ভবনের সংস্কার এবং আধুনিক কনফারেন্স রুম—সবই স্থানীয় কমিউনিটির ভালোবাসা ও শ্রমের ফসল। ‘ইংলিশ হেরিটেজ’-এর সহযোগিতায় নির্মিত মিনারটি আজ পূর্ব লন্ডনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা জানান দেয়—এই মসজিদ লন্ডনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব এই মসজিদ পরিদর্শন করেছেন। তারা এখানে কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উপস্থিতি দেখেননি, দেখেছেন শান্তি, সহমর্মিতা ও বহুসংস্কৃতিবাদের এক অসামান্য উদাহরণ।

শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা

এলাকায় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্রিক লেন জামে মসজিদ সর্বদা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। যেকোনো সামাজিক সংকট বা দুর্ঘটনার সময় তারা বিভিন্ন সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করে যেন এই পুরো এলাকাটি সবার জন্য নিরাপদ ও ভালোবাসার স্থান হয়ে ওঠে।

জানাজা ও দাফন সেবা: চরম বিপদে মানবতার হাত

মসজিদের পরিচালিত ফিউনারেল (দাফন) সার্ভিস কেবল একটি সেবা নয়—এটি সমবেদনা ও মানবতার এক অনন্য রূপ। “সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে সৎ ও আন্তরিক সেবা প্রদান”—এই নীতি কেবল কোনো লিখিত বাক্য নয়, বরং কমিউনিটির প্রতি মসজিদের গভীর দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। প্রিয়জনকে হারানোর শোকে যখন মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন এই মসজিদ পরম মমতায় তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা থেকে শুরু করে মরদেহের নিজ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া—সবকিছুই পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে সম্পন্ন  করা হয়।

হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক সত্য

ব্রিক লেন জামে মসজিদ আমাদের শিক্ষা দেয়—ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে না, বরং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বিভেদ সৃষ্টি করে। একটি উপাসনালয় কেবল একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রতিনিধিত্ব করে না; এটি মানুষের সার্বজনীন অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে সবাই এক হয়ে দাঁড়ায়, সেখানেই জন্ম নেয় প্রকৃত শান্তি।ব্রিক লেন জামে মসজিদ তাই কেবল ইটের তৈরি কোনো উপাসনালয় নয়—এটি শান্তির বাতিঘর এবং মানবতার এক পরম আশ্রয়স্থল।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh