সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম
ব্যয় সাড়ে ৭ কোটি টাকা; ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চালুর লক্ষ্য
রাজধানীর যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের পর এবার মনোরেল চালুর সম্ভাবনা যাচাই করছে সরকার।
এ লক্ষ্যে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার চুক্তি হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সই হওয়া এ চুক্তির আওতায় প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
তবে এই চুক্তির মধ্য দিয়ে মনোরেল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং ঢাকার বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বয় করে মনোরেল কতটা কার্যকর হতে পারে, তা যাচাই করা হবে। ডিটিসিএর লক্ষ্য, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত একটি মনোরেল রুট চালু করা।
১৪টি রুট পর্যালোচনা, অগ্রাধিকার পাবে দুটি
নগর অঞ্চল পরিবহন কৌশলগত পরিকল্পনায় (ইউআরএসটিপি) মনোরেলের জন্য পাঁচটি সম্ভাব্য করিডোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার। করিডোরগুলো হলো এয়ারপোর্ট–বসুন্ধরা হয়ে পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি, মধ্য বাড্ডা–ভুলতা, রামপুরা–ডেমরা, মোহাম্মদপুর–পোস্তগোলা এবং এয়ারপোর্ট–উত্তরা সেন্টার হয়ে সাভার।
তবে প্রাথমিক এই পাঁচটি করিডোরের মধ্যেই সমীক্ষা সীমাবদ্ধ থাকছে না। বুয়েটের পরামর্শে সম্ভাব্য রুটের সংখ্যা বাড়িয়ে মোট ১৪টি রুট পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিটিসিএর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সমীক্ষার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত দুটি অগ্রাধিকারযোগ্য করিডোর চিহ্নিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রী চাহিদা, অর্থনৈতিক সুবিধা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা বিবেচনায় এসব রুট মূল্যায়ন করা হবে।
সমীক্ষায় সম্ভাব্য রুটের অবস্থান ও দৈর্ঘ্য নির্ধারণের পাশাপাশি স্টেশন ও ডিপো নির্মাণের স্থান, যাত্রীসংখ্যা, অবকাঠামোর কারিগরি উপযোগিতা, নির্মাণ ও পরিচালন ব্যয় এবং পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে। অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে কোন পথে মনোরেল নির্মাণ যুক্তিসংগত হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভিত্তি তৈরি হবে।
মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোই লক্ষ্য
মনোরেল হলো এমন একটি রেলব্যবস্থা, যেখানে ট্রেন বিশেষভাবে নির্মিত একটি একক বিমের ওপর বা সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলে। সাধারণত উড়ালপথে নির্মিত হওয়ায় এটি সড়কের ওপরের জায়গা ব্যবহার করতে পারে। ফলে কিছু এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নতুন রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে এ বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য সরাসরি মেট্রোরেল স্টেশনের আওতায় নেই, সেখানকার যাত্রীদের প্রধান গণপরিবহন নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে মনোরেল ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), বাস ও মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাসাবো, গোড়ান, মাদারটেক কিংবা পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মনোরেল কতটা উপযোগী হতে পারে, তা সমীক্ষায় যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. শামসুল হকের মতে, ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থা কার্যকর করতে বাস, দ্রুতগতির বিশেষ বাস, হালকা রেল ও মেট্রোরেলের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। মনোরেল এ ব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য অংশ হতে পারে। তবে কোন এলাকায় কোন ধরনের পরিবহন বেশি উপযোগী, তা নির্ধারণ করতে হবে যাত্রী চাহিদা ও ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
যানজট কমাতে কতটা কার্যকর হবে
ঢাকার যানজটের অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং গণপরিবহনের খণ্ডিত কাঠামো নতুন পরিবহনব্যবস্থা বিবেচনার অন্যতম কারণ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের একটি প্রকল্প নথিতে ব্যবহৃত হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার যানজটে প্রতিদিন আনুমানিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।
অন্যদিকে, ডিটিসিএর হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় দৈনিক যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ২০১৪ সালের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মোটরসাইকেল, তিন চাকার যান ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন পরিবহনব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। মনোরেল যদি আবাসিক এলাকা থেকে যাত্রীদের দ্রুত মেট্রোরেল স্টেশন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু নতুন রেলপথ নির্মাণ করলেই যানজট কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। স্টেশনে সহজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ফিডার বাস, মেট্রোরেল ও বাসের সঙ্গে সুবিধাজনক সংযোগ এবং সমন্বিত টিকিট ও ভাড়াব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব সুবিধা না থাকলে মনোরেল চালু হলেও ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ব্যবহার কতটা কমবে, তা অনিশ্চিত থাকবে।
নির্মাণব্যয়ের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ
মনোরেল প্রকল্পের যৌক্তিকতা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো এর ব্যয় ও যাত্রী ধারণক্ষমতার সামঞ্জস্য। প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণব্যয়, স্টেশন ও ডিপোর খরচ, জমির প্রাপ্যতা এবং বিদ্যুৎ, জনবল, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় হিসাব করতে হবে।
একই করিডোরে বৈদ্যুতিক বাস, দ্রুতগতির বিশেষ বাস কিংবা অন্য কোনো রেলব্যবস্থা চালু করলে কত ব্যয় হবে এবং কত যাত্রী পরিবহন করা যাবে, তার তুলনাও জরুরি। মনোরেলের সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা কম হলে বা পরিচালন ব্যয় বেশি হলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে।
এ ছাড়া মনোরেলের জন্য বিশেষায়িত ট্রেন, সংকেতব্যবস্থা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, যন্ত্রাংশ এবং দক্ষ জনবল প্রয়োজন। বাংলাদেশের মেট্রোরেল পরিচালনার অভিজ্ঞতা নগর রেলব্যবস্থা পরিচালনায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে মনোরেলের প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা আলাদা হওয়ায় এ ক্ষেত্রে নতুন প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে।
২০২৯ সালের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত
এর আগে চলতি বছরের জুনে সংসদে রেলপথ মন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম জানিয়েছিলেন, ঢাকায় মনোরেল চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ডিটিসিএ এ-সংক্রান্ত প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ নেয়।
বর্তমান সমীক্ষা শেষ হলে সম্ভাব্য করিডোর নির্বাচন এবং প্রকল্পের প্রাথমিক অর্থনৈতিক ও কারিগরি যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা যাবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ, প্রযুক্তি নির্বাচন, বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি এবং অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
তাই ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত একটি রুট চালুর লক্ষ্য থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করবে সমীক্ষার ফলাফল ও পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোর ওপর। প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার চুক্তি সই প্রকল্পের প্রস্তুতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এটি নির্মাণ শুরুর নিশ্চয়তা নয়।
ঢাকার পরিবহন সংকট মোকাবিলায় মনোরেল একটি সম্ভাব্য বিকল্প। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রস্তাবিত পথে পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া, বিকল্প পরিবহনের তুলনায় ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়া এবং মেট্রোরেলসহ পুরো গণপরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার ওপর। ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার সমীক্ষায় তাই শুধু উপযুক্ত রুট চিহ্নিত করাই নয়, ঢাকার পরিবহনব্যবস্থায় মনোরেলের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।