সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

বিগত কয়েক দশকের মধ্যে এবারের এল নিনিয়ো সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিধ্বংসী রূপ নিতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। জলবায়ুজনিত এ বিরূপ পরিস্থিতির প্রভাব আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা গত দেড় শ বছরের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনিয়ো’ হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।
সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরে উৎপত্তি হলেও বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গ ও দূরবর্তী আবহাওয়ার আন্তঃযোগাযোগের (টেলিকানেকশন) কারণে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম ও অন্যান্য গবেষকদের মতে, এল নিনিয়োর মূল প্রভাব পড়বে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনের ওপর। দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বা ‘হিট স্ট্রেস’ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার কারণে দেখা দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদি খরা ও শুষ্কতা। তবে এল নিনিয়োর বছর মানেই যে শুধু খরা হবে তা নয়, বরং তীব্র ঘূর্ণিঝড় বা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সমরেন্দ্র কর্মকার স্মরণ করিয়ে দিয়ে জানান, দেশের ইতিহাসের বড় তিনটি বন্যা ১৯৮৭, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে সংঘটিত হয়েছিল এল নিনিয়োর প্রভাবেই। কারণ স্থানীয়ভাবে বৃষ্টি কম হলেও উজানে বা নদীর ক্যাচমেন্ট এলাকায় অতিবৃষ্টি হলে দেশের ভেতরে ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনা দিয়ে বিপুল পানি নেমে এসে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
এই চরম আবহাওয়ার কারণে কৃষিখাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। হাইড্রো-ক্লাইমেট অ্যান্ড ওশান সেন্টারের গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনিয়োর বছরগুলোতে দেশের উপকূলে গড় তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে এবং বৃষ্টিপাত কমে যায়। এতে কৃষিতে সেচের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে সেচে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ওপর।
ডিজেল ও বিদ্যুতের দাম বেশি থাকায় কৃষকের উৎপাদন খরচ এক লাফে বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া বৈশ্বিক বাজারে বড় উৎপাদনকারী দেশগুলোর ফসলহানি ঘটলে আমদানিনির্ভর পণ্যের সংকট ও উচ্চমূল্যের ধাক্কা সরাসরি বাংলাদেশের ওপর এসে পড়বে।
জনস্বাস্থ্যের দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল হতে পারে; অতিরিক্ত গরমে পানিবাহিত রোগ এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এমন বহুমুখী দুর্যোগ মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, বৃষ্টি ও বন্যার নির্ভুল মৌসুমি পূর্বাভাসের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে মার্চ-এপ্রিলের সম্ভাব্য খরা সম্পর্কে কৃষকদের আগেই সচেতন করা যায়।
পাশাপাশি কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় আগাম পরিকল্পনা, সেচকাজে জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে সৌরচালিত পাম্পের ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও জোর দিয়ে বলেন, এল নিনিয়োর সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে শুধু একটি সূচকের ওপর নির্ভর না করে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি এবং মৌসুমি বায়ুর গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখে জাতীয় পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে।