স্ত্রী-শাশুড়িকে হত্যা করে শিশুকে নিয়ে থানায় গিয়ে ঘাতকের আত্মসমর্পণ

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ৩ আগস্ট ২০২৬, ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীর কলাবাগানে স্ত্রী ও শাশুড়িকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর নিজের ১৪ মাস বয়সী সন্তানকে কোলে নিয়ে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন পিকআপ চালক হৃদয় শিপন।

রোববার সকালে কলাবাগানের কাঁঠালবাগান এলাকার একটি বাসায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতরা হলেন ফারজানা আক্তার রাত্রী (২০) ও তাঁর মা ফিরোজা বেগম (৩৮)।

কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফজলে আশিক জানান, শিপন নিজেই থানায় এসে বলেন, “আমি মার্ডার করছি।” এরপর পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নিয়ে তাঁর দেওয়া ঠিকানায় যায়।

তিনি বলেন, “পরে ওই বাসা থেকে শিপনের স্ত্রী রাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগেই রাত্রীর মা ফিরোজাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।”

পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিকআপ চালক শিপনের সঙ্গে প্রায় পাঁচ বছর আগে রাত্রীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি চলছিল। পারিবারিক কলহের কারণে একসময় তাঁদের বিচ্ছেদ হলেও পরে দুজনের সম্মতিতে আবারও বিয়ে হয়। এরপর তাঁদের একটি সন্তান জন্ম নেয়।

তবে পুনরায় সংসার শুরু করলেও পারিবারিক বিরোধ থামেনি। স্বজনদের দাবি, শিপন প্রায়ই রাত্রীকে মারধর করতেন। এ কারণে রাত্রী বেশির ভাগ সময় বাবার বাসায় থাকতেন।

রাত্রীর মামাতো ভাই রুবেল বলেন, “বিয়ার পর প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হতো। রাত্রিরে মারধর করত শিপন। পরে মামা রাত্রিরে ঢাকায় নিয়া আসে।”

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায় একটি পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে শিপনের সঙ্গে রাত্রীর আবারও কথা-কাটাকাটি হয়। অভিযোগ রয়েছে, শিপন তাঁর বন্ধুদের নিয়ে নেশা করেছিলেন, যা নিয়ে রাত্রী আপত্তি জানান। এর জেরে শিপন অনুষ্ঠান শেষ না করেই ঢাকায় ফিরে আসেন।

রোববার সকালে তিনি শ্বশুরবাড়িতে গেলে একই বিষয় নিয়ে আবারও বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে রাত্রীকে ছুরিকাঘাত করেন। মেয়ের চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে এগিয়ে এলে ফিরোজা বেগমকেও ছুরিকাঘাত করেন।

ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন রাত্রীর আট বছর বয়সী ছোট ভাই ইয়ামিন। হত্যাকাণ্ড দেখে তিনি দৌড়ে ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে নিচে নেমে প্রতিবেশীদের খবর দেন এবং বাবাকে ডেকে আনেন।

রাত্রীর বাবা ফারুক হোসেন তখন তাঁর ফলের দোকানে ছিলেন। খবর পেয়ে বাসায় ফিরে দেখেন মেয়ে নিথর পড়ে আছেন এবং স্ত্রী গুরুতর আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। পরে স্ত্রীকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।

হত্যাকাণ্ডের পর শিপন তাঁদের ১৪ মাস বয়সী ছেলে রায়হানকে সঙ্গে নিয়ে কলাবাগান থানায় যান এবং হত্যার কথা জানান।

ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিপনের স্বজনদের সঙ্গে কথা হলে তাঁর চাচাতো ভাই সোহান ইসলাম বলেন, “পিকআপ চালাইতো, ওইটা হইতেই পারে।”

রাত্রীর স্বজনদের দাবি, শিপন মাদকাসক্ত ছিলেন এবং প্রায়ই স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন।

ঘটনার পর পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের অপরাধস্থল ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। একটি কক্ষে রক্তাক্ত মেঝে, এলোমেলো বিছানা ও কাপড়চোপড় পাওয়া যায়। রান্নাঘরে একটি আধা-তৈরি রুটি পড়ে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, মেয়ের চিৎকার শুনে রান্না ফেলে তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন ফিরোজা বেগম।

রাত্রীর বাবা ফারুক হোসেন বলেন, “বিয়া খাইতে বাড়ি গেছিলাম আমরা, বাড়িতে একটু দ্বন্দ্ব হইছে। পরে জামাই বিয়া না খাইয়া চইলা আইছে। আজকে তো আমার ফ্যামিলি শেষ কইরা দিল। আমার একটা নাতি, একটা ছেলে ছোট। আমার সব শেষ কইরা দিল।”

কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফজলে আশিক বলেন, “দুজনকেই গলাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখা হয়েছে। মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। মামলা হওয়ার পর শিপনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সোমবার আদালতে পাঠানো হবে।”

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh