সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

জনগণের অধিকার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত জুলাই শেষ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জনগণের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের সার্থক পরিসমাপ্তি ঘটবে।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীতে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক আলোকচিত্র ও স্মারক প্রদর্শনী পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে মানুষের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। এ সময়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিয়ে অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, কারারুদ্ধ হয়েছেন এবং অসংখ্য মিথ্যা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে সমস্ত নির্যাতন পেরিয়ে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে এসে গণঅভ্যুত্থান গড়ে তুলেছে।
জুলাই আন্দোলনের ঘটনাবলী স্মরণ করে তিনি বলেন, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত ছাত্রীদের ওপর হামলার পর তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের নির্মম শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। একই দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রাণহানি ঘটে এবং ১৮ জুলাই থেকে তা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের পতনের দিনগুলোতেও ইন্টারনেট বন্ধ করে লাশ গায়েব করা এবং আশুলিয়ায় মানুষকে ট্রাকে ফেলে আগুন দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, ৩ আগস্ট সেনাসদস্যরা জনগণের ওপর অস্ত্র প্রয়োগ না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাময়িক শূন্যতা পূরণে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেননি। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সংস্কার ইস্যুতে ঐকমত্য কমিশনে ৩১টি দল একমত হলেও পরবর্তীতে সরকারি দলের নিজস্ব স্বার্থের কারণে সেখানে মতভেদ দেখা দেয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ এবং নির্বাচন কমিশন গঠনের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। এসব সংস্থায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমেই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা আবশ্যক।
রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বৈধতা প্রসঙ্গে তিনি এনসিপির গণপরিষদ ও বিএনপির গণভোটের পূর্ববর্তী দাবির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি আফসোস প্রকাশ করে বলেন, ক্ষমতা ও নির্বাচন কেন্দ্রিক অবস্থান পরিবর্তনের কারণে জনগণের অভিপ্রায়ের সঠিক প্রতিফলন ঘটছে না। অথচ জনগণের ইচ্ছাই হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন।
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও পুরোনো ব্যবস্থার মতো একই ধরনের দুর্নীতি ও দলীয়করণ অব্যাহত রয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, হাজারো মানুষের রক্ত ও ত্যাগের আন্দোলন কি কেবল একটি দলকে সরিয়ে আরেকটি দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য হয়েছিল?
সংসদের ভেতরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে তারা কোনো প্রতিকার বা ন্যায়বিচার পাননি। ফলে জনগণের মৌলিক অধিকার পুনর্দখল ও আদায়ের জন্য আবারো রাজপথে নামার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে জামায়াত আমির জানান, এটি কোনো সরকারের সাফল্য গাঁথা প্রচারের জন্য নয়, বরং ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের যাঁতাকলে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিপীড়িত হয়েছে তা তুলে ধরার আয়োজন। শহীদদের পরিবার ও জাতির মূল প্রত্যাশা অনুধাবন করে বর্তমান রাষ্ট্রচালকদের দায়িত্ব পালনের বার্তা দিতেই এই আয়োজন।
প্রদর্শনীতে ৭ মার্চের ভাষণ থাকলেও ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রদর্শনীটি মূলত আগ্রাসী শাসনের ধারাবাহিকতা ফুটিয়ে তুলতে তৈরি করা হয়েছে। তবে ইতিহাসের প্রতিটি কল্যাণকর অবদানের প্রতি তারা সর্বদা শ্রদ্ধাশীল।
বক্তব্যের শেষে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অধিকার আদায়ের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। জুলাইয়ের আসল আকাঙ্ক্ষা যেদিন বাস্তবায়ন হবে এবং সাধারণ মানুষের সব অধিকার নিশ্চিত হবে, সেদিনই জুলাই সার্থক হবে।