মামুন খালেদ ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে ৩ মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক

স্বদেশ বিদেশ ডট কম

  • প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদ, তার স্ত্রী নিগার সুলতানা ও শ্যালক শেখ আমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মঙ্গলবার সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে কমিশন সচিব সাইদুর রহমান খান এ তথ্য জানান।

দুদকের অনুসন্ধানে মামুন খালেদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১ কোটি ৯৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫ টাকা, তার স্ত্রী নিগার সুলতানার বিরুদ্ধে ৫৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৯ টাকা এবং শ্যালক শেখ আমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তিনজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারায় আলাদা মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

দুদকের নথি অনুযায়ী, মামুন খালেদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শেয়ার ব্যবসা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করে নিজের পাশাপাশি স্ত্রী, শ্যালক, শাশুড়ি ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হয়।

দুদকের পরিচালক এস এম এম আখতার হামিদ ভূঞার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল অনুসন্ধান করে। দলের অন্য দুই সদস্য হলেন—সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান ও পিয়াস পাল।

মামুন খালেদের সম্পদ

দুদকের অনুসন্ধানে মামুন খালেদের নামে ৩ কোটি ৩২ লাখ ৮ হাজার ৬৯০ টাকার স্থাবর এবং ১ কোটি ২১ লাখ ৭৮ হাজার ১৪৭ টাকার অস্থাবর সম্পদ মিলেছে।

স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৮৬ হাজার ৮৩৭ টাকা। তার পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ৭৬ লাখ ৯৩ হাজার ৮২১ টাকা। সম্পদ ও ব্যয় মিলিয়ে দুদক তার মোট অর্জনের পরিমাণ হিসাব করেছে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৮০ হাজার ৬৫৮ টাকা।

এর বিপরীতে তার গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫৬৩ টাকা।

এ হিসাবের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়ার কথা বলেছে দুদক।

স্ত্রীর মাছ চাষের আয় গ্রহণ করেনি দুদক

মামুন খালেদের স্ত্রী নিগার সুলতানার নামে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার স্থাবর এবং ৯৯ লাখ ৯৭ হাজার ৭৫১ টাকার অস্থাবর সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক। সব মিলিয়ে তার নামে সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫১ টাকা।

তার গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯১১ টাকা। আর পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ৯৬৯ টাকা। ব্যয় বাদ দিয়ে তার সম্পদের স্থিতি দাঁড়ায় ৪৯ লাখ ৭২ হাজার ৯৪২ টাকা।

এর বিপরীতে তার নামে ১ কোটি ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫১ টাকার সম্পদ পাওয়া যায়। ফলে ৫৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৯ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে দুদক মনে করছে।

সংস্থাটির নথিতে বলা হয়েছে, নিগার সুলতানা আয়কর নথিতে মাছ চাষ থেকে ৪০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩০ টাকা আয় দেখিয়েছিলেন।

তবে দুদকের বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক আবুল কাসেমের রেকর্ড যাচাই ও পরিদর্শন প্রতিবেদনে এ আয়কে ‘ভিত্তিহীন’ বলা হয়েছে। এ কারণে ওই আয় গ্রহণ করেনি অনুসন্ধান দল।

এছাড়া ২০২৩-২৪ করবর্ষে দেখানো ১৭ লাখ ৮২ হাজার ৩৮২ টাকারও বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি বলে দুদকের নথিতে বলা হয়েছে।

শ্যালকের সম্পদ সাড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি

মামুন খালেদের শ্যালক শেখ আমিনুর রহমানের নামে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৮০ লাখ ২৫ হাজার ৬২৩ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য রয়েছে দুদকের নথিতে।

তার পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ২ কোটি ৪২ লাখ ৪ হাজার ৬১৬ টাকা। গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ হিসাব করা হয়েছে ৫ কোটি ৭৭ লাখ ৩৭ হাজার ৪৭৮ টাকা।

অনুসন্ধনে তার নামে ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়ার কথা বলেছে দুদক।

নথিতে বলা হয়েছে, আমিনুর রহমান আয়কর নথিতে মাছ চাষ থেকে ৬ কোটি ৮ লাখ ১৪ হাজার ৮৮৪ টাকা আয় দেখিয়েছিলেন।

দুদকের রেকর্ড যাচাই ও পরিদর্শন প্রতিবেদনে ওই আয়কে ‘ভিত্তিহীন’ বলা হয়েছে। ফলে সেই আয় গ্রহণ করেনি অনুসন্ধান দল।

তার দেখানো ১ কোটি ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯০ টাকার পূর্ববর্তী সঞ্চয়ের পক্ষেও কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি।

তিনটি মামলাতেই দুদকের সহকারী পরিচালক পিয়াস পালকে এজাহারকারী হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।

গত ২৫ মার্চ রাতে সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। এরপর কয়েক দফা তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।

ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার অভিযোগসহ এক-এগারোর সময় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মামুন খালেদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনার সময় তিনি কুমিল্লায় কর্নেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সিগন্যালস কোরের কর্মকর্তা হিসেবে শেখ মামুন খালেদ ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ডিজিএফআইতে পরিচালক (এফএসআইবি) হিসেবে যোগ দেন।

পরে ২০০৮ সালের জুনে তিনি ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারির স্থলাভিষিক্ত হয়ে পরিচালকের (কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর-সিআইবি) দায়িত্ব পালন করেন।

পরে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবরের উত্তরসূরি হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালে মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে ডিজিএফআইতে ফিরে আসেন।

প্রায় দেড় বছর এই দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার পর তার স্থলাভিষিক্ত হন মেজর জেনারেল আকবর হোসেন।

সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় শেখ মামুন খালেদ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) উপাচার্য ছিলেন। পরে অবসরে যাওয়ার আগে তিন তারকা জেনারেল হিসেবে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) দায়িত্ব পালন করেন।

চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের মে মাসে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে স্ত্রীসহ শেখ মামুন খালেদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল আদালত। তখন দুদক তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও সম্পদ সংক্রান্ত বিষয়ে অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছিল।

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

Developed by: Web Design & IT Company in Bangladesh