সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

রাজধানী ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৩২টি বাস রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে দুটি রুটে এ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে ৩২টি রুটের ফ্র্যাঞ্চাইজি নির্ধারণ এবং ছয় মাসের মধ্যে পুরো ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বাস রুট পুনর্বিন্যাস, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা, নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা, ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু এবং বাসের মান উন্নয়নসহ গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে আলোচনা হয়।
সভায় উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, ঢাকায় অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে ৯৮টি সচল রয়েছে। এসব রুটে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বিভিন্ন কোম্পানির বাস চলাচল করছে। ছোট ছোট রুট এবং একাধিক রুটের মধ্যে অসামঞ্জস্যের কারণে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতা, যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান সচল রুটগুলো সমন্বয় করে ৩২টি রুটে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত রুটগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি রুটে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালিত হবে। ব্যক্তিমালিকানায় বিচ্ছিন্নভাবে বাস চালানোর পরিবর্তে অনুমোদিত কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাসের ফিটনেস, চালকদের আচরণ, চলাচলের শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
সরকারের প্রত্যাশা, কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা চালু হলে যাত্রী ওঠানোর জন্য বাসগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ, বাসের মান নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত করা সহজ হবে।
যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ নির্মাণ ও সংস্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজের বিবরণসহ স্টপেজের তালিকা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে পাঠানো হবে। তিন মাসের মধ্যে স্টপেজগুলোর নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন স্টপেজগুলোতে যাত্রী ছাউনি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে যাত্রীদের রাস্তার মাঝখানে বাসে ওঠানামার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি সড়কে যান চলাচল আরও সুশৃঙ্খল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাস চলাচল পর্যবেক্ষণে প্রতিটি বাসে জিপিএস ট্র্যাকার স্থাপন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি কাউন্টারভিত্তিক টিকিটের সঙ্গে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বাসের অবস্থান পর্যবেক্ষণ, চলাচলের তথ্য সংরক্ষণ এবং টিকিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও জীর্ণ বাসের কারণে দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে বলে সভায় আলোচনা হয়। এসব বাসের যান্ত্রিক মেরামত এবং ডেন্টিং-পেইন্টিংয়ের জন্য মালিকদের দুই মাস সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামত না করা বাস চলাচল করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। এর মাধ্যমে সড়কে চলাচলকারী বাসের নিরাপত্তা ও বাহ্যিক মান উন্নয়নের পাশাপাশি যাত্রীদের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হবে।
বিভিন্ন মামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জব্দ করা প্রায় ৩৬ হাজার যানবাহন দীর্ঘদিন ধরে ডাম্পিং স্টেশনে পড়ে থাকার বিষয়টিও সভায় উঠে আসে। এসব যানবাহন পড়ে থাকায় জায়গার সংকট তৈরি হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে বলে আলোচনা হয়।
যানবাহনগুলো দ্রুত নিলাম বা অন্য আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে ডাম্পিং স্টেশনের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা যানবাহনের ব্যবস্থাপনা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন রুটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর আটটি রুটে এসব বাস চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), বিআরটিসি ও বাস মালিক সমিতির সঙ্গে সমন্বয় করে উপযুক্ত রুট চূড়ান্ত করা হবে। বৈদ্যুতিক বাস চালু হলে জ্বালানিনির্ভরতার পাশাপাশি নগরীর বায়ুদূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ছয় মাসের সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে। ২০২৭ সালের ১৫ এপ্রিলের মধ্যে সিদ্ধান্তগুলোর দৃশ্যমান ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে পরিকল্পনাগুলোর সফলতা নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রুট পুনর্বিন্যাস, কোম্পানি গঠন, বাসের মান নিয়ন্ত্রণ, স্টপেজ নির্মাণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার ওপর। দীর্ঘদিনের যানজট, যাত্রী দুর্ভোগ ও বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমাতে ঘোষিত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে নগরবাসীর।