সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

দেশে বিদ্যমান অন্তত ১০ রাজনৈতিক দলে ‘পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার’ প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
এসব দলের মধ্যে রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা এবং বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি।
রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির মেঘমালা সম্মেলন কক্ষে রোববার (১ নভেম্বর) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক প্রতিবেদনটির বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে। দলীয় প্রধানের নেতৃত্ব দেওয়ার সময়কাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে দলের অস্তিত্ব নেতার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির ওপর নির্ভরশীল। শীর্ষ নেতা পরিবর্তন হলে দল ‘ভেঙে যাবে’ বা ‘রাজনৈতিকভাবে দুর্বল’ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা আছে।
এ ক্ষেত্রে অন্তত ১২টি দলের প্রধানের দশ বছর বা তার বেশি সময় ধরে একই দায়িত্বে থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানের ৪১ ও ৪৫ বছর ধরে নেতৃত্ব প্রদানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির দলীয় প্রধান পরিবর্তন হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে মনোনয়ন বাণিজ্য হয়ে থাকে। আরপিও, ১৯৭২ এ নির্বাচনে দলের প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সংসদীয় বোর্ড কর্তৃক মনোনয়ন চূড়ান্ত করার সময় সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার স্থানীয় পর্যায়ের কমিটির সদস্যদের প্রস্তাবিত প্যানেল বিবেচনার কথা বলা হয়। কিন্তু অধিকাংশ দলে এর ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হয়েছে।
দলগুলো সরাসরি মনোনয়ন বোর্ডের সাক্ষাৎকার ও আলোচনার ভিত্তিতে প্রার্থী মনোনীত করে; এ ক্ষেত্রে দলীয় প্রধানের মতামতকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়।
এছাড়া অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হওয়ার জন্য ‘যোগ্যতা ও অযোগ্যতার’ শর্ত উল্লেখ নেই। ৬টি দলে শর্ত হিসেবে ‘যোগ্যতা’, ‘জনপ্রিয়তা’, ‘সততা’, ‘দলের প্রতি আনুগত্য’ ইত্যাদি বিষয় বলা হলেও তা সুস্পষ্ট নয়।
প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রার্থীর সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি দলীয় প্রধানের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া, বৃহৎ বা প্রভাবশালী দলগুলোতে অর্থ ও পেশীশক্তিকে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলেও দাবি করেছে টিআইবি।
সংবাদ সম্মেলনে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দলগুলো প্রকাশ্যে মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়টি অস্বীকার করলেও এটি যে মাঠপর্যায়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত, তা বিভিন্ন সময়ে দলীয় প্রতিনিধিদের বয়ানেই উঠে এসেছে। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেই এ সব তথ্য পাওয়া গেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলছেন, সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থী কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন, সেখানে নির্বাচন কমিশনে পুরো দল মিলে বছরে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়। দলগুলোর এই আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে পর্দার আড়ালে বা টেবিলের নিচে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং অবৈধ অর্থায়নের পথ সুগম হচ্ছে।
গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে পাওয়া তথ্যের বরাতে টিআইবি বলছে, নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করে ন্যূনতম ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কার্যালয় ও কার্যক্রম পরিচালনা করলে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের বছরে ১৪ থেকে ২৫ কোটি (প্রাক্কলিত) টাকা ব্যয় করতে হয়। অথচ তাদের ঘোষিত আয়ের উৎস (সদস্য চাঁদা) থেকে সর্বোচ্চ আয়ের পরিমাণ মাত্র ২৬ লাখ (প্রাক্কলিত) টাকা।
অন্যদিকে সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত কার্যক্রম বিস্তৃত থাকলে ব্যয় দাঁড়াবে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি (প্রাক্কলিত) টাকা, যেখানে সদস্য-চাঁদা বাবদ আয় দাঁড়াবে ১৪ থেকে ৩৮ কোটি (প্রাক্কলিত) টাকা। আর ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত শাখা বিস্তৃত থাকলে বছরে ব্যয় হয় ১,৫৩২ থেকে ২,১৮৮ কোটি (প্রাক্কলিত) টাকা। অথচ সদস্য চাঁদা বাবদ আয়ের সম্ভাবনা মাত্র ১১৬ কোটি (প্রাক্কলিত) টাকা।
আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো দলের আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালী বিধি নেই। দলগুলোর গঠনতন্ত্রে আয়-ব্যয়, দলীয় সদস্যদের পদভেদে চাঁদার হার, অনুদান গ্রহণের শর্ত, মনোনয়ন ফর্ম ফি, হিসাব সংরক্ষণ, আর্থিক লেনদেন, ক্রয়, নিরীক্ষা, আর্থিক জবাবদিহি ইত্যাদি সম্পর্কিত নির্দেশনা অস্পষ্ট। কেউই বাৎসরিক বাজেট প্রণয়ন করে না। রাজনৈতিক দলগুলোর জমাকৃত বার্ষিক আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন দলের বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ না করাও হয় না।
অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অধিকাংশ দল জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের প্রধান নির্বাচিত করলেও গোপন ব্যালট ভোটের পরিবর্তে কণ্ঠ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন হয়। দলীয় প্রধান পদের নির্বাচনে একাধিক ব্যক্তির মনোনয়ন গ্রহণের চর্চা নেই। মাত্র দুটি দলে (সিপিবি ও এবি পার্টি) একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী লক্ষ্য করা যায়। একটি দল (সিপিবি) ছাড়া অন্য কোনো দলের গঠনতন্ত্রে এক ব্যক্তি কতবার বা কত মেয়াদে দলীয় প্রধান হতে পারবেন এ বিষয়ে উল্লেখ নেই।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে নির্বাহী পরিচালক ছাড়াও সংস্থার উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনটি পরিচালনা করেন আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওসার আহমেদ, কাজী আমিনুল হাসান ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন।
টিআইবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অনুযায়ী, এই গবেষণার আওতায় ৪২টি রাজনৈতিক দলের (৩৭টি নিবন্ধিত ও ৫টি অনিবন্ধিত) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ৩২টি দল তথ্য দিয়েছে। এই গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্যের সময়সীমা ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। তবে ক্ষেত্রবিশেষে চলতি বছরের অগাস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য-উপাত্তও ব্যবহার করা হয়েছে।