সব
স্বদেশ বিদেশ ডট কম

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ‘ভিডিও ধারণকারী’ হিসেবে আলোচনায় থাকা বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সুরি নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর এক বন্ধুস্থানীয় ছোটভাইয়ের ডাকে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দ্বীপ নামে একজন তাঁকে ফোন করে ডেকে নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম।
বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাঁর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি। তাহসিফের বাসা উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে।
বুধবার দুপুরে ওই ভবনের সামনে সাংবাদিকদের তাহসিফের বাবা বলেন, বিমান বাহিনী থেকে তাঁর ছেলের চাকরি যাওয়ার কারণ হিসেবে ‘শৃঙ্খলাজনিত’ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপর তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং নেত্র নিউজে কাজ করেছিলেন বলে জানান এনায়েতুল করিম।
তিনি বলেন, “সে ছিল অত্যন্ত জেন্টল প্রকৃতির ও সামাজিক। সিনিয়র-জুনিয়র সবার সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিল।”
মঙ্গলবার তাহসিফ দিনভর মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছিলেন বলে জানান তাঁর বাবা। তিনি বলেন, “সারাদিন মায়ের সাথে ছিল, শপিং করেছে। আমার জন্যও কিছু শপিং করেছে। সন্ধ্যার পরে জুনিয়র বন্ধু-ছোটভাই বাসার নিচ থেকে ডাকে; বলেছে, ‘কথা বলবে’।
“ওর মাকে বলে যে, ‘দ্বীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি’। এটা বলে সে নিচে যায়, আর ফেরেনি। এর মধ্যে ওর মা অনেকবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ফেরে নাই।”
রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে তাহসিফ তাঁর মায়ের মোবাইলে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। তবে ওই বার্তায় তাঁকে ব্যস্ত মনে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা।
এনায়েতুল করিম বলেন, “এরপর থেকে আমরা আর তাকে লোকেট করতে পারিনি। গতকাল দুপুরে আমি তুরাগ থানায় গিয়েছিলাম, তখন আমাকে বলা হয়েছিল—‘এরকম কোনো ব্যাড নিউজ নাই’।”
বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানা থেকে ফোন করে মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয় বলে জানান তিনি।
ছেলের বিষয়ে এনায়েতুল করিম বলেন, যেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, সেদিকে তাঁর ছেলে কখনো যেতেন বলে তাঁদের ধারণা নেই।
দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তাহসিফ। তাঁর নিজের একটি মোটরসাইকেল ছিল। তবে মাসখানেক আগে দুর্ঘটনায় পড়ার পর পরিবার তাঁকে মোটরসাইকেল চালাতে নিষেধ করেছিল।
তাহসিফ মঙ্গলবার মোটরসাইকেল নিয়েই বের হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর এক স্বজন। তিনি বলেন, “বাইকটি বাসার গ্যারেজে নেই।”
তাঁকে ডেকে নেওয়া বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই দ্বীপের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কথা হয়েছে। দ্বীপ তাঁদের জানিয়েছেন, তাঁরা রাতে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছেন। পরে তাহসিফকে তাঁর বাসার এলাকাতেই রেখে দ্বীপ ফিরে গিয়েছিলেন।
তাহসিফের পরিবারের ওই স্বজন বলেন, “আমরা দ্বীপের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু তাহসিফের বাইকটি মিসিং।
“পুলিশ আমাদের কাছে বাইকের ডিটেইলস, ছবি চেয়েছে। আমরা দিয়েছি, পুলিশ এটা বলতে পারবে।”
মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাস্থলটি উত্তরখান থানার আওতাধীন। সেখানকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, “তারা এখনো কোনো অভিযোগ পাননি, আর বিষয়টি দেখছে নৌ পুলিশ।”
নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ই তাঁরা খতিয়ে দেখছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজে করে দেশত্যাগের যে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, সেটি তাহসিফ সুরি ধারণ করেছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে।
গত জুলাইয়ে একটি পডকাস্টে তাহসিফকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ওই ভিডিও ধারণ করার কারণে বিমান বাহিনী থেকে তাঁর চাকরি গেছে কি না। জবাবে তিনি বলেছিলেন, “হতে পারে।”
ওই পডকাস্ট অনুষ্ঠানে আরও জানতে চাওয়া হয়, ‘আমার দেশ’ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ভিডিওর বিষয়ে বিমান বাহিনী তদন্ত করতে গিয়ে বাহিনীর ভেতরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায় এবং যারা ‘র’-এর সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাঁদের মধ্যে তাঁর নামও আসে।
জবাবে তাহসিফ বলেন, “আমার মনে হয়, ‘আমার দেশ’ যে প্রতিবেদনটা করেছে, এটা তারা আসলে কোনো প্রোপাগান্ডা সার্ভ করছে।”
গত বছরের ৪ আগস্ট ‘আমার দেশ’-এর প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক প্রতিবাদলিপিতে জানায়, প্রতিবেদনে তাহসিফ সুরিসহ দুই কর্মকর্তাকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
আইএসপিআর জানায়, ‘বাস্তবে’ এ দুই কর্মকর্তাকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিমান বাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালার আওতায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসরে পাঠানো হয়েছে, যার সঙ্গে ওই অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই।